17-Mon-Dec-2018 07:39am

Position  1
notNot Done

৫০ বছর পরও মার্টিন লুথার কিং

Zakir Hossain

2018-04-5 08:36:06

দ্য পলিটিক্স ডেস্ক: পঞ্চাশ বছর কেটে গেছে। ১৯৬৮ সালের ৪ এপ্রিল। পঞ্চাশ বছর আগের ওই দিনের সন্ধ্যা ৬টায় আততায়ীর ছোড়া গুলি খুঁজে নিয়েছিল মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের করোটিকে। অহিংস নাগরিক আন্দোলনের নেতার জীবনাবসান হয় এক সহিংস ঘটনার মধ্য দিয়ে। এর ঠিক পাঁচ দিন আগেই ২৯ মার্চ কৃষ্ণাঙ্গ পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বেতন-ভাতার দাবিতে সংহতি জানাতে মেমফিস যান তিনি। সেই যাত্রায়ও হামলার ঝুঁকি ছিল। তিনি অবহিতও ছিলেন বিষয়টি নিয়ে। কিন্তু তা গ্রাহ্য করেননি তিনি। সেই সময় তিনি বলেছিলেন, কারও ভয়ে ভীত নন তিনি। তাঁর দৃষ্টি উঁচুতে পর্বতচূড়ার দিকে, যেখানে স্বপ্নের বাস। অন্যায় ও হতাশার পৃথিবীতে পা রেখে তিনি মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। আশাবাদী করে তুলেছিলেন।

আমেরিকার মানুষ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে লুথার কিংয়ের ৫০তম হত্যাদিবস পালন করছে, যখন হতাশা আবার তার রূপ প্রকাশ করতে শুরু করেছে। ভূতের উল্টো পায়ে ভর করে আমেরিকার মানুষ ফিরে যাচ্ছে বর্ণবাদী অতীতের আবর্তে। আর এই উল্টোযাত্রায় শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের চালিত করছেন স্বয়ং প্রেসিডেন্টই। ফলে মৃত্যুর ৫০ বছর পরও লুথার কিং আমেরিকার মানুষের কাছে এখন আরও বেশি করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন। ১৯৬৮ সালের ৪ এপ্রিল অস্ত্রোপচার কক্ষে জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে যখন পরাজিত হন কিং, ঠিক তখনই ওয়াশিংটন ডিসিসহ আমেরিকার অন্তত ৫০টি শহরে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। ওই দাঙ্গার পেছনে ছিল শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের প্রতি কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের অবিশ্বাস, যা শ্বেতাঙ্গদের দ্বারা দীর্ঘ নিপীড়নের মাধ্যমে একটু একটু করে জন্ম নিয়েছিল। আর এখন এই বছর লুথার কিংকে স্মরণ করতে বিরাট জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করেছে আমেরিকা। কী সরকার, কী বিভিন্ন সংগঠন কিংকে স্মরণ করা হচ্ছে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েই। এই ক্ষেত্রে বর্তমান আমেরিকার বিভাজনের বাস্তবতাও অনেক বেশি ক্রিয়াশীল বলে ধারণা করা যায়। কারণ আত্মগরীমায় নিতান্ত অন্ধ না হলে শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ নির্বিশেষে সবাই এক বৈচিত্র্যপূর্ণ যৌথ সমাজের কথাই বলে। তাদের চোখে, অভিবাসনের এই দেশে কেউই আগন্তুক নয়। থাকার কিংবা বাঁচার সম-অধিকার রয়েছে সাদা-কালো-হলদে সব মানুষেরই। এই সত্যটিইতো সারা জীবন বলে গেছেন লুথার কিং।

মার্টিন লুথার কিংয়ের স্মরণে শোভাযাত্রা হাজারো মানুষ অংশ নেয়। টেনেসি, যুক্তরাষ্ট্র, ৪ এপ্রিল। ছবি: রয়টার্সএই বছর ৫০তম হত্যাবার্ষিকী হিসেবেই শুধু নয় মার্টিন লুথার কিং প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন অনেক কারণেই। এর প্রধান ও মুখ্য কারণ হিসেবে বলা যায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা। সারা বিশ্বে ক্রমবর্ধমান কট্টর ও উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থানের ঢেউ আমেরিকায় প্রবেশ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত ধরে। তিনিই নিয়ে আসেন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ শব্দবন্ধটি। এ যেন পূর্বসূরি বারাক ওবামার ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’-এর এক সুচিন্তিত প্রতিক্রিয়া। এই প্রতিক্রিয়া শুধু বিপরীত মতাদর্শী ডেমোক্র্যাট ওবামার বিরুদ্ধেই ছিল না। এটি একই সঙ্গে হয়ে উঠেছিল মার্কিন মানসেরও বিপরীত, যার প্রমাণ আমেরিকা দেখেছে শার্লোৎসভিলের দাঙ্গায়। ওই দাঙ্গা অনেক কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই দাঙ্গাই ট্রাম্প প্রশাসনের গতিপথটি চিহ্নিত করেছিল। এর আগে অনেকের সামনেই অভিবাসনবিরোধী ট্রাম্পের একটি আমেরিকাপ্রেমী মূর্তি উপস্থিত ছিল। অনেক বিশ্লেষক শুরু থেকেই ট্রাম্পকে বর্ণবাদী ও কট্টর জাতীয়তাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করলেও একটি বড় অংশ অতটা সায় দেননি। কিন্তু শার্লোৎসভিলে এবং আমেরিকার জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাঁর আচরণ এই ধারণায় চিড় ধরায়। এরই পথ অনুসরণ করে সামনে আসে আফ্রিকা সম্পর্কে তাঁর বিস্ফোরক মন্তব্য। এসব মন্তব্য শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী ধারণা বা নয়া নাৎসিবাদী তৎপরতাকে প্রকারান্তরে পৃষ্ঠপোষকতা করছে। গত বছরই আমেরিকার অর্ধশতাধিক শহরে এই নয়া নাৎসিবাদীরা প্রকাশ্যে মিছিল করেছে। তাদের গায়ে সাঁটা ছিল স্বস্তিকা চিহ্ন। তাদের বক্তব্য পরিষ্কার, আমেরিকায় তারা কোনো অশ্বেতাঙ্গ ব্যক্তিকে দেখতে চায় না।

এই শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের উত্থান শুধু যে আমেরিকায় হয়েছে এমন নয়। এদের উত্থান হয়েছে পুরো ইউরোপেই। কী জার্মানি, কী ফ্রান্স সবখানেই কান পাতলে এদের কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। এটা সত্য যে, এই উত্থানের পেছনে রয়েছে বিশ্বব্যাপী বিরাজমান শরণার্থী বাস্তবতা। সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে চলা যুদ্ধ লাখ লাখ মানুষকে উদ্বাস্তু করেছে। তারা ছুটেছে আশ্রয়ের খোঁজে। ইউরোপের দিকে ছুটে গেছে মানুষের স্রোত। সাগর সাঁতরে মানুষ পাড়ি দিয়েছে সেখানে। ঠিক একই সময়ে ইউরোপ আমেরিকা পার করেছে অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জ। ফলে সেখানকার নাগরিকদের একটি অংশ নিজেদের যেকোনো সমস্যার জন্য এই শরণার্থীদেরই দোষারোপ করতে শুরু করেছেন। এটা স্বাভাবিকও।

এখানেই প্রশ্ন আসে রাষ্ট্রের ভূমিকার। জার্মানিতে অ্যাঙ্গেলা মের্কেল যে কাজটি করেছেন দারুণভাবে। কট্টরবাদের উত্থানকে তিনি মোকাবিলা করছেন এখনো। কিন্তু আমেরিকায় এসে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। সেখানে মসনদে বসলেন এমন একজন যিনি নিজেই আমেরিকাকে বিশ্ব-বিচ্ছিন্ন করে কট্টরবাদের চাষে নামলেন। মুখে বললেন পুরোনো ঐতিহ্য ও শক্তিমত্তা ফিরিয়ে আনার কথা। কিন্তু কাজে টানলেন বিভাজনের রেখা। তাঁর এই নীতি বলার অপেক্ষা রাখে না, সারা বিশ্বেই বড় প্রভাব ফেলেছে। ঠিক এই প্রাসঙ্গিকতাতেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র। তাঁর সেই স্বপ্ন ও আশার কথা আরও জোর দিয়ে বলবার সময় এখনই, যেখানে কোনো বিভাজন থাকবে না, থাকবে না কোনো বৈষম্য। মানুষও এটা জানে। আর তাই এবার তাঁর হত্যাদিবসটি পালন করছে মানুষ ‘অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার’ লড়াইয়ের স্লোগানকে সঙ্গী করে।