19-Wed-Dec-2018 08:50pm

Position  1
notNot Done

ইতিহাসের সাক্ষী মার্টিন লুথার কিং

Zakir Hossain

2018-04-5 08:50:57

দ্য পলিটিক্স ডেস্ক: ৫০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং এক অসামান্য ভাষণ দিয়েছিলেন ওয়াশিংটনে আড়াই লক্ষ আমেরিকানের এক সমাবেশে। 'আই হ্যাভ এ ড্রিম' নামে লিংকন মেমোরিয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে দেয়া সেই বিখ্যাত ভাষণ বিশ্বের সর্বকালের সেরা বাগ্মিতার দৃষ্টান্তগুলোর অন্যতম হয়ে আছে। সেই সমাবেশে প্রধান বক্তা ছিলেন দশ জন, তার মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন জন লুইস – মার্টিন লুথার কিংএর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সেদিন ১৯৬৩ সালের ২৩ শে অগাস্ট। আলাবামা রাজ্যের নাগরিক অধিকার আন্দোলনকারী জন লুইস সেদিন ওয়াশিংটন শহরের কেন্দ্রস্থলে, এক বিশাল মিছিলের পুরোভাগে।

"আমরা ক্যাপিটল হিলে পৌঁছলাম, এগিয়ে গেলাম কনস্টিটিউশন এভিনিউ ধরে। সেখান থেকে ইউনিয়ন স্টেশনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, লক্ষ মানুষ হেঁটে চলেছে। সেই মিছিলে আমাদের নেতৃত্ব দেবার কথা। কিন্তু দেখলাম, মানুষ তার আগেই মিছিল শুরু করে দিয়েছে। আমার মনে হলো আসলে মানুষই এগিয়ে চলেছে, আমাদেরকেই তাদের সাথে যোগ দিতে হবে। আক্ষরিক অর্থেই এটা ছিল এক জনসমুদ্র এবং তারা যেন লিংকন মেমোরিয়ালের দিকে আমাদেরকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল।"

martin luther king

সেদিন সাদা-কালো সকল ধর্মবর্ণের আমেরিকানই দেশের বিভিন্ন অংশ থেকে এসে ওয়াশিংটনে সমবেত হয়েছিল, তাদের দাবি ছিল বর্ণবৈষম্যের অবসান। জন লুইসের বয়েস তখন মাত্র ২৩। তিনিও ছিলেন ওই সমাবেশের একজন বক্তা।

"সেদিন ভীষণ গরম পড়েছিল। আমি আমার ডানদিকে তাকিয়ে দেখলাম, মানুষ আর মানুষ - হাজার হাজার। আমার বাঁ দিকে দেখলাম আরো মানুষ। তাদের অনেকেই খুবই তরুণ। অনেকেই বক্তাদের দেখার জন্য গাছের ডালে চড়ে বসেছে। সামনের দিকে তাকালাম, সেদিকেও হাজার হাজার লোক। অনেকে লেকের জলে নেমেছে একটু ঠান্ডা হবার জন্যে। সবাই অপেক্ষা করছে, কখন অনুষ্ঠান শুরু হবে।"

জন লুইসের নিজের শৈশবও কেটেছে বর্ণবৈষম্যের মধ্যে। আলাবামায় বড় হয়ে ওঠা জন লুইসের এখনো মনে আছে একবার এক লাইব্রেরি থেকে তিনি বই ধার নিতে পারেন নি - কারণ শ্বেতাঙ্গ লাইব্রেরিয়ান বলেছিলেন, কালো চামড়ার লোকদের বই দেয়া যাবে না। তিনি পরে ছাত্রদের অহিংস আন্দোলনের সমন্বয়কারী হয়েছিলেন। এটি ছিল একটি নাগরিক অধিকার সংগঠন – যাদের কাজ ছিল তরুণদের শেখানো কিভাবে অহিংস আন্দোলন কিভাবে করতে হয়।

"আমি জানতাম, যাদের সাথে আমি কাজ করছি তাদের সবার পক্ষ থেকে আমাকে কথা বলতে হবে। কথা বলতে হবে – যারা মার খেয়েছে, গ্রেফতার হয়েছে, জেল খেটেছে, যারা নিজের মুখে নিজেদের কথা বলতে পারে নি, যারা এই সংগ্রামে প্রাণ দিয়েছে - তাদের হয়ে।

জন লুইস তার বক্তৃতায় প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি যে সিভিল রাইটস বিল প্রস্তাব করেছিলেন তার সমালোচনা করলেন। তিনি প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানালেন আরো সাহসী হতে।

martin luther king

"আমাকে পরিচয় দেয়া হয়েছিল একজন তরুণ নেতা হিসেবে। লোকে যে আমাদেরকে অপেক্ষা করতে বলছে, ধৈর্য দেখাতে বলছে – আমি তার বিরুদ্ধে বলেছিলাম। আমি বলেছিলাম – আমরা আর অপেক্ষা করতে পারছি না। আমরা ধৈর্য হারিয়েছি, আমরা আমাদের স্বাধীনতা চাই এবং তা চাই এক্ষুণি। জনতা উল্লাস প্রকাশ করলো, শুধু তরুণরাই নয়, বয়স্করাও, সাদা, কালো - সবাই।"

ওয়াশিংটনের দিকে ওই পদযাত্রার আগে ঘন ঘন সহিংস ঘটনা ঘটছিল। আলাবামায় বিক্ষোভরত স্কুলছাত্রদের ওপর পুলিশ কুকুর আর লাঠি নিয়ে আক্রমণ চালিয়েছিল। একটি বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেবার সময় আলাবামার পুলিশের পিটুনিতে জন লুইসের মাথা ফেটে গিয়েছিল। সেই দাগ এখনো তার মাথায় রয়ে গেছে। কিন্তু তিনি কখনো পাল্টা আক্রমণ করেন নি।

"তখন আমরা এমন একটা পর্যায়ে চলে এসেছি যে আমরা এই মার খাওয়াটা মেনে নিয়েছি, এমনকি মৃত্যুর সম্ভাবনাও মেনে নিয়েছি। সেদিন আমাকে যখন পিটিয়ে রক্তাক্ত করে ফেলা হলো – আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমার মনে হয়েছিল আমি মারা যাচ্ছি, এটাই আমার শেষ অহিংস আন্দোলন।"

মার খেতে খেতে প্রায় মৃত্যুর কাছাকাছি চলে গিয়েও কিভাবে তিনি পাল্টা আঘাত না করে থাকতে পেরেছিলেন? জন লুইস বলছিলেন, "ড. কিং মাঝে মাঝে বলতেন, মানসিকভাবে মৃত্যুর চাইতে শারীরিকভাবে মরে যাওয়াটা অনেক ভালো।"

lincoln memorial
ওয়াশিংটনের লিংকন মেমোরিয়াল

মার্টিন লুথার কিং ছিলেন একজন বাপ্টিস্ট ধর্মযাজক, নাগরিক অধিকার আন্দোলনের প্রধান নেতা। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধের মধ্যে দিয়েই পরিবর্তন আসতে পারে। ড. কিং সেদিনের তরুণ জন লুইসকে তার নিজের কাছাকাছি রেখেছিলেন, তার ধৈর্যহীনতাকে নমনীয় করেছিলেন।

সেদিন ওয়াশিংটনে তার ভাষণে মার্টিন লুথার কিং প্রায় ঐশী বাণীর মতো ভাষায় বর্ণনা করেছিলেন তার কল্পনার আমেরিকাকে। বলেছিলেন, কিভাবে বর্ণবৈষম্য গোটা জাতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, শুধু কালো আমেরিকানদের জীবনকে নয়। তার পর তিনি তুলে ধরেছিলেন ভবিষ্যতের আমেরিকা নিয়ে তার আশাবাদকে, যেখানে সব আমেরিকান হবে সমান – সত্যিকারের স্বপ্নের আমেরিকা।

"ড. কিংএর ওই ভাষণে আমি অভিভুত হয়েছিলাম, গভীরভাবে আপ্লুত হয়েছিলাম, অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। তিনি জানতেন যে এভাবে অনুপ্রাণিত করাটা একজন ধর্মযাজকের ভুমিকার চাইতে আলাদা কিছু নয়। তিনি তার একটি স্বপ্নকে আমেরিকার জনগণের কাছে, এবং সারা বিশ্বের মানুষের কাছে তুলে ধরেছিলেন। লিংকন মেমোরিয়ালের সিঁড়িকে তিনি যেন একটি গীর্জার বেদীতে পরিণত করেছিলেন।"

‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ নামে খ্যাত হওয়া মার্টিন লুথার কিং-এর ওই ভাষণ সারা আমেরিকা জুড়ে টেলিভিশনে প্রচার হয়েছিল। তাৎক্ষণিকভাবেই এটা স্বীকৃতি পেয়েছিল এক ঐতিহাসিক ভাষণ হিসেবে।

মার্টিন লুথার কিং মেমোরিয়াল

"প্রেসিডেন্ট কেনেডি আমাদের সবাইকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রথম দিকে প্রেসিডেন্ট কেনেডি ওয়াশিংটনে এরকম এরকম একটি সমাবেশ করার বিরোধী ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, এর ফলে সহিংসতা এবং বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। কিন্তু পরে যখন তিনি দেখলেন যে ওই সমাবেশ হবেই, তখন তিনি তার নিজের মতো করেই তাতে সমর্থন দিয়েছিলেন। সমাবেশ শেষ হবার পর, তিনি ওভাল অফিসের দরজায় দাঁড়িয়ে আমাদের সবাইকে স্বাগত জানালেন। সবার সাথে হাত মেলালেন। বার বার বলছিলেন, তোমরা ভালো কাজ করেছো। যখন তিনি ড. কিংএর সামনে এলেন, তিনি বললেন, আপনিই স্বপ্ন দেখেছেন।"

আমেরিকার সিভিল রাইটস আন্দোলনের ক্ষেত্রে এটা ছিল উচ্চতম মুহুর্তগুলোর একটি। ড. কিং-এর স্বপ্নের আমেরিকার সেই রূপকল্প সেদেশেই শুধু নয় - তার বাইরেও মানুষের মনে দাগ কেটেছিল। মনে হয়েছিল, বিজয় যেন দোরগোড়ায় এসে গেছে।

"তখন সবার মধ্যেই একটা বিরাট আশাবাদের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু মাত্র ১৮ দিন পরই বামিংহামে আমাদের গীর্জায় বোমা পড়লো। চারটি ছোট মেয়ে মারা গেল। কয়েক সপ্তাহ পরই প্রেসিডেন্ট কেনেডি, যিনি আমাদের আশা দিয়েছিলেন, তিনি নিহত হলেন। ১৯৬৩ সালটা আমেরিকার জন্য ছিল একটা খারাপ বছর।"

obama
সেই ভাষণের ৫০তম বার্ষিকীতে প্রেসিডেন্ট ওবামা

পরের পাঁচটি বছর ধরে মাটির লুথার কিং তার অহিংসার নীতিতে অবিচল ছিলেন। ১৯৬৮ সালে তিনি নিজেই নিহত হলেন, মাত্র ৩৯ বছর বয়েসে।

জন লুইসের কাছে – ড. কিং শুধু একজন স্বপ্নদ্রষ্টাই ছিলেন না, ছিলেন একজন বন্ধুও।

"ড. কিংএর রসবোধ ছিল দারুণ। গল্প বলতেন, নিজের রসিকতায় নিজেও খুব হাসতেন, অন্যদেরও হাসাতেন। আমি একেক সময় ভাবি, তিনি না থাকলে আমি কি হতাম, কি করতাম। আমি প্রতিদিনই তার কথা ভাবি। তিনি ছিলেন আমার একজন বন্ধু, আমার হিরো, আমার অনুপ্রেরণা, আমার নেতা, আমার বড় ভাই।"

জন লুইসের বয়েস এখন ৭০এর কোঠায় । তিনি এখন একজন সিনিয়র কংগ্রেস সদস্য। ওয়াশিংটনের সেই সমাবেশে যারা বক্তৃতা দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে একমাত্র তিনিই জীবিত আছেন। আমেরিকান রাজনীতির সব মহলের লোকেদের কাছেই তিনি একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। তিনি বলছিলেন, আজকের আমেরিকায় মার্টিন লুথার কিংএর বিখ্যাত উক্তিগুলোর অনুরণন এখনো হচ্ছে।

"তিনি যা বলেছিলেন, যা করেছিলেন, তার জন্য আমি তৃপ্ত। কারণ তার সেই ভাষণ ছিল এমন কিছু, যা সকল আমেরিকানই তার নিজের করে নিয়েছে। সারা আমেরিকা জুড়ে আপনি দেখবেন, তরুণরা বা ছোট্ট শিশুরাও বলে, 'আমার একটি স্বপ্ন আছে।'