17-Mon-Dec-2018 07:42am

Position  1
notNot Done

ক্রমন্বয়ে গহীনে পতন

ghani al-maruf

2018-04-17 14:05:15

আশরাফ আলভী: রাজ্য হল এমন এক রুপবতী তরুণী যাকে চুম্বন করতে হলে সুতীক্ষ্ণ তরবারির প্রয়োজন হয়। বাদশাহ হুমায়নের বিদ্রোহী ভ্রাতা কামরান মির্জার বিখ্যাত এই ঐতিহাসিক উক্তিটিতে একটা বিষয় স্পষ্ট যে রাজ্যে দখল কিংবা ক্ষমতা পুনরুদ্ধার বা টিকে থাকার জন্য বিপ্লব ও পেশী শক্তির কোন বিকল্প নেই। কারণ রাষ্ট্র ক্ষমতায় যে বা যারাই থাকুকনা কেনো তারা যেমন সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে চায় ঠিক তেমন বিদ্রোহী গোষ্ঠিকেও ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নিখুঁত কুটকৌশল, সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে পেশী শক্তি প্রয়োগ করে ক্ষমতাসীনদের পরাস্থ করতে হয়। এখন হয়তো ঢাল তলোয়ারের যুগ নেই। 

কালের বিবর্তনে এসেছে বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় মারনাস্ত্র ও বুলেট ভিত্তিক অত্যাধুনিক সব রাজনৈতিক কুটকৌশল কিন্তু ক্ষমতার ব্যকরণিক দিকটা একই রকম রয়ে গেছে। আর এ সুত্রে বার বার পিছিয়ে যাচ্ছে জাতীয়তাবাদী দল বি.এন.পি। যদিও জনপ্রিয়তার দিক থেকে দলটি কোন অংশে কম নয় এবং যে কোন সময় বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থান ঘটানোর জন্য রয়েছে যথেষ্ট অভ্যন্তরিন কর্মী এবং সমর্থক শক্তি। অথচ বিএনপি’র নীতি নির্ধারক মহল থেকে আরম্ভ করে প্রভাবশালী নেতারা এ বিষয়টি দৃষ্টিগোচর না করে দ্বৈব ঘটনার মাধ্যমে সরকার পতনের জন্য আধঘুমো রেডিমেট স্বপ্নে বিভোর হয়ে শুধু নিজেদের রাজনৈতিক দুরদর্শিতার এবং দুর্বলচিত্তের পরিচয়ই দিচ্ছেন না বরং বি.এন.পিকে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার বিষয়টি তরনান্বিত করছে। কেউ কেউ আবার সুসজ্জিত ও পরিপাটি হয়ে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, প্রেস মিডিয়া এবং ক্ষুদ্র জটলা করে শরীরের সমস্ত শক্তি জিহ্বায় এনে বিপ্লবিকভাবে সরকার পতনের বুলি আউরাচ্ছে। কিন্তু বিপ্লব বলতে আসলে তারা কি বোঝাচ্ছে কিংবা বিপ্লবের সংজ্ঞা তাদের কাছে কি সে ব্যাপার অনেকটাই ধোয়াশা কারণ বিপ্লব তিন বেলা উচ্চারিত মখরোচক কোনো আটপৌরে শব্দ না। বিপ্লব একটি নতুন ও পরিবর্তনের আহ্বান যা প্রথমে মানুষের মনে এসে ক্রমশ স্নায়ুতে ছড়িয়ে পরে বৃহৎ স্নায়ু স্রোত ও জাগরণের মাধ্যমে পুরাতন ধারা ও অপশক্তির পতন ঘটিয়ে সম্ভাবনাময় নতুন দিগন্তের সৃষ্টি করে। 

সুতরাং বি.এন.পির নেতাদের উচ্চারিত বিপ্লবের সাথে প্রকৃত বিপ্লবের যে বিস্তর তফাৎ রয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সুতরাং তাদের দীর্ঘদিনের এই ক্রমাগত বিলাপমিশ্রিত আন্দোলনগুলি দিন দিন শুধু তাদের অভ্যন্তরিন দুর্বলতা প্রকাশ করছে তাইনা এমনকি সরকার দলীয় মিডিয়ামুখী নেতা মন্ত্রিদের বিদ্রুপের জন্য সস্তা উপকরণ যোগানো ছাড়া আর কোনো ফলই দিচ্ছে না। কিন্তু বিপ্লবিক আন্দোলন করার সব যোগ্যতা ও সামর্থ্যই বিএনপির আছে। তাহলে স্বাভাবিক প্রশ্ন আসতে পারে গন্ডগোলটা কোথায়? গন্ডোগোলটা আসলে গোড়ায়। অর্থাৎ নিজের উত্তেজনাকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে বিএনপির সমগ্র জাতীয়তাবাদি শক্তিকে এক সুতোতে গাথার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন নেতার বি.এন.পিতে বড়ই অভাব। কারণ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার মাধ্যমে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও ভৌগোলিক মানচিত্রের স্বপ্নবুনে আপামর জনসাধারণের মাঝে যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল তার মৃত্যু পরবর্তী সময়ে বিএনপি যে কারণেই হোক কিছুটা হলেও বিচ্যুত হয়েছে এবং বেগম জিয়া চেতন বা অবচেতনেই হোক দলে মাত্রাতিরিক্ত অভিজাততন্ত্রের বিকাশ ঘটিয়েছে। ফলে দলের আদর্শিক রাজনীতিবিদদের হাত থেকে রাজনীতি ফসকে অভিজাতদের হাতে চলে গিয়েছে। ফলে দলের আদর্শিক নেতারা এক রকম বাধ্য হয়ে মানে অভিমানে কোনঠাসা হয়ে আছে অনেকে নিভৃতে চলে গেছে।

 আর এতে দলের অভ্যন্তরে একরকম আদর্শিক নেতৃত্ব শূন্যতা দেখা দিয়েছে। যা দলের অভ্যন্তরিন সাংগঠনিক শক্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। ফলে মির্জা ফখরুলের মতো মাত্রাতিরিক্ত ভদ্র, সুদর্শন ও রোমান্টিক চেহারার নেতার কাছে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য সরকারের অনুমতির অপেক্ষাসহ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সমঝোতার আহ্বান করা ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা নেই। সমঝোতা হয় আসলে সমানে সমানে সেয়ানে সেয়ানে। যেখানে পেশী শক্তির ভয় এবং তীব্র আন্দোলনের দাপটে সরকার দলের সংলাপের আহ্বান করার কথা সেখানে বি.এন.পি উল্টো সরকারকে সংলাপ সমঝোতার আহ্বান করে যাচ্ছে এবং কুটকৌশল হিসেবে বিশ্ব মোড়লদের কাছে নালিশ সালিশ দয়া ভিক্ষার বিষয়টি যে তাদের অভ্যন্তরিন দেউলিয়াত্ব ও দুর্বলতা প্রকাশ করছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর এতে যে বি.এন.পির খুব একটা লাভ হচ্ছে না তা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক চিত্র থেকেই বোঝা যায়। কারণ সবাই সব সময় সবলের পক্ষেই থাকে এবং দয়া করুনা নিয়ে খুব একটা বেশি এগোনো যায় না। তাই নিজেদের অজ্ঞতার দিকে না তাকিয়ে ক্ষমতার জন্য সরকারের উপর দোষ চাপানো রাজনৈতিক অঙ্গনে পুরোটাই বৃথা আর্তনাত ছাড়া আর কিছুই না। কারণ মানুষের সত্তাগত প্রবৃত্তি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির আলোকে সরকার একশ বছর থাকার পরিকল্পনা করতে পারে। এটা তাদের দোষের কিছু না। বি.এন.পির উচিত পারলে তাদের এক মিনিটে ক্ষমতাচ্যুত করা। অথচ তারা এ বিষয়টি খেয়াল না করে ক্ষমতায় যাওয়ার পর ক্ষমতা ভোগ দখলের এক ধরণের কাল্পনিক ভাগ বাটোয়ারার চিন্তায় বুদ হয়ে আছে। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য পূর্ব পথ পাড়ি দেওয়ার সূত্রটি তারা বেমালুম ভুলে গেছে। সুতরাং তারা যা করছে তা তাদের স্ব-স্ব আঙ্গিকের নেতাদের এবং দলের উপর মহলের নীতিনির্ধারকদের দায় সারা দৃষ্টি আকর্ষণ ছাড়া আর কিছুই না। আর এতে একটা জিনিস প্রমাণিত হয় তারা রাজনৈতিক খোজা অথবা তাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদি আদর্শের অভাব আছে। তানা হলে সরকার শাসিত বিচার বিভাগের রায়ে বেগম জিয়াকে কারাগারে আবদ্ধ হতে হতো না। বেগম জিয়ার রায়ের বেশ কয়েকদিন আগ থেকেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে আরম্ভ করে বিএনপির রাজনৈতিক উঠানের আনাচে কানাচে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার ঝড় উঠেছিলো। বিশেষ করে প্রবাসীসহ মহিলা দলের প্রমীলা নেত্রীরা রোদ চশমা পড়ে হাতে প্লেকাড নিয়ে বিভিন্ন হুমকি ধামকি দিয়ে সরকার এবং তার অঙ্গপ্রতিষ্ঠানকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে আসছিল। 

কেউ কেউ আবার আমার নেত্রী আমার মা বন্দি হতে দেবোনা বলে আমরণ অনশনের আগাম আভাস দিচ্ছিল। কিন্তু রায়ের পর তারাই আবার দু’ফোটা চোখের জল ফেলে ক্ষমা করে দিয়ো মা বলে দ্বৈব ঘটনার মাধ্যমে সরকার পতনের সান্তনা নিয়ে নির্লজ্জের মতো অভিশাপ দিতে দিতে কোমায় চলে গিয়েছে। এক্ষেত্রে এগিয়ে প্রবাসীসহ প্রমীলা নারী নেত্রীরা। তাদের এই চাপাবাজিতার তৈল প্রকৃয়াটি তারেক রহমান এবং বেগম জিয়াসহ নীতিনির্ধারকরা যে খুব একটা অপছন্দ করেন সেরকম মনে হয়না। তা না হলে এইসব তৈল শিল্পীদের মুখ বারবার দেখতে হতোনা। বি.এন.পি পন্থি কিছু কিছু বুদ্ধিজীবি অবশ্য বি.এন.পিকে জনগণের কাছে ফিরে গিয়ে জনগণকে সাথে নিয়ে আন্দোলন করার পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু ঘন্টাটা বাধবে কে? এবং জনগন কেনইবা বি.এন.পির ডাকে সারা দিবে। কারণ বি.এন.পি এ যাবতকাল পর্যন্ত নিজেদের ক্ষমতায় যাওয়ার ফন্দিফিকির ছাড়া জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোন সুস্পষ্ট ধারনাই দিতে পারেনি। বলতে পারেনি ক্ষমতায় গেলে তারা কি করবে এবং সেখানে জনগণের স্বার্থ কতটুকু। ফলে বি.এন.পির হাসফাস জনগণের মনে খুব একটা দাগ কাটতে পারছেনা। অবশ্য পারার কথাও না। কারণ সমগ্র জাতীয়তাবাদি শক্তিকে এক সুতোয় বেধে জনগণের মাঝে স্বপ্নময় জাগরণ তৈরি করার মতো নেতার দলে বড়ই অভাব। বাকি যারা দলে নেতৃত্ব দিচ্ছে তারা বেশিরভাগই অভিজাত বুর্জোয়া আর এদের সাথে তৃণমূল নেতা কর্মীদের এক মনো:আন্ত যোগাযোগের ঘাটতি আছে। কারণ অভিজাতরা রাজনীতি করে একান্তই ব্যক্তি স্বার্থে। তাই তারা রাজনীতিটাকে নিজ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করার জন্য দলের ভেতর বিভিন্ন গোষ্ঠী রাজনীতির সৃষ্টি করে দলের শরীরে ক্ষতিকর মেদের মতো ঝুলে আছে যা দলের সুশৃংখল শক্তি বৃদ্ধিতে বিরাট বাধা। 

আর এতে সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে উঠতি তরুন ছাত্র নেতারা। কারণ অভিজাতরা দলের ভিতরে নিজের বলয় সৃষ্টি করে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখার জন্য উঠতি তরুণ ছাত্র নেতাদের মুক্ত চিন্তার জায়গায় মার্জিন টেনে দিচ্ছে। ফলে তাদের এই বনসাইকরণ ফর্মুলায় পরে হাজার হাজার উঠতি তরুণ কর্মীর মাঝে রাজনৈতিক দুরদর্শিতার অভাব দেখা দিচ্ছে। ফলে তারা যে যার গোষ্ঠি বা গ্রুপের স্বার্থ রক্ষার জন্য একে অপরের প্রতি হিংসাত্মক স্ফুলিঙ্গ নিক্ষেপ করে এক ধরণের আত্মহননের খেলায় মেতে উঠেছে ঠিকই কিন্তু সমগ্র জাতীয়তাবাদি দলের প্রতি তাদের দায়িত্বের কথা মটেও অনুভব করছেনা। এমনকি দেশের প্রতি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যর দিকটাও ক্রমে ক্রমে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সাম্প্রতিককালে জাতীয়তাবাদি আদর্শ বিলুপ্তিসহ ভারতের স্বার্থ সুরক্ষায় দেশের সবকিছু দাদাদের ধুতির কোচরায় তুলে দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের ভৌগলিক মানচিত্রের সংকট তৈরি করার বিষয়টি তাদের চেতনায় বিন্দুমাত্রাও নাড়া দিচ্ছে না, জ¦লে উঠছেনা মোদির সদ্য উচ্চারিত আমার সোনার বাংলা এবং বাংলাদেশ এবং কলকাতার পার্থক্য খুব না পাওয়ার মতো আগ্রাসী আগাম আভাসে। অথচ বি.এন.পি জাতীয়তাবাদের আলোকে তরুন অভ্যুত্থান ঘটাতে পারে। সুতরাং বি.এন.পি যদি নিজেদের ভেতর শ্রেণী বিপ্লব ঘটিয়ে জনগনের নাগরিক স্বার্থ সুনিশ্চিত করে দেশ প্রেমের আবহে জনগণের মাঝে স্বপ্নঘোর তৈরি করতে পারে তাহলেই সরকার পতনের সহায়ক অভ্যুত্থান তৈরি হতে পারে সেখানে সরকারের শক্তিশালী স্বৈরতন্ত্র কোনই কাজে আসবেনা। কারণ পৃথিবীতে যতগুলো বিপ্লব বা অভ্যুত্থান ঘটেছে সবগুলোই নির্যাতিত শোষিত শ্রেণীকে নিয়ে শক্তিশালী শোষকদের বিরুদ্ধে। আর এখানে মজার ব্যাপার হলো শোষক যতই শক্তিশালী হোক না কেনো বিপ্লব বা অভ্যুত্থান ঠেকানোর ক্ষমতা তাদের থাকেনা। ছিলোনা কোন কালে।