19-Wed-Dec-2018 02:29pm

Position  1
notNot Done

সাদাকালো ছবির গল্প

Mubin Khan

2018-05-3 08:17:26

মুবিন খান: অসম্ভব মায়াবতী এক কিশোরীর নাম দিপালী। অসম্ভব স্বপ্নবতীও। ওর সবকিছুতেই ‘অসম্ভব’ শব্দটি খুব অদ্ভুতভাবেই যায়! এই যেমন ভালোবাসা। অসম্ভব ভালোবাসতে পারার ক্ষমতাও নিজের ভেতরে ধারণ করত দিপালী।
দিপালী আমার পাঁচটা বোনের মাঝের বোনটা। সেজ আপা। আমি অবশ্য আপা ডাকতাম না। তুই সম্বোধনে নাম ধরেই ডাকতাম। সবাইকে যেমন ডাকতাম। সবার চেয়ে ছোট হয়েও। আমার থেকে ওই অতটা বড় হওয়া সত্ত্বেও। আম্মা বলতেন, আমাকে কোলে রাখতে রাখতে দিপালীর কোমরের কাছটায় ঘা হয়ে গিয়েছিল। আজকে আমি দিপালীর গল্প বলব।
সবটা তো আর বলা যাবে না। সবটা আপনারা পড়তে চাইবেনও না। অন্যর অত সাতকাহন কে পড়তে চায়। তাই আজ শুধু ছবির গল্পটা বলি।
এক ‘সাদাকালো’ ছবির গল্প।
পরিবারের সকলের ছোট এই আমি’টাকে কোন এক অদ্ভুত কারণে দিপালী তার ভালোবাসার সবটুকু ক্ষমতা ব্যবহার করে অসম্ভব ভালোবাসত। আমার নাওয়া খাওয়া ঘুম সকলই ওর দায়। যেখানেই যেত আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেত। কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াত পাড়াময়। তখন পাড়ার সবাই সবাইকে চিনত, জানত। কে কার ছেলেমেয়ে, কার ভাই, কার বোন কিংবা চাচা মামা খালা সেটা আশপাশের বাড়ির সকলেই জানত।
হ্যাঁ, আমি ঢাকা শহরের কথাই বলছি।
দিপালীর খুব কম বয়সেই বিয়ে হয়ে গেল। খুবই অনাড়ম্বর বিয়ে। বিয়ে ব্যাপারটা যে কি আমি তার কিছুই জানি না। অন্য বোনদের উচ্ছ্বাস আমাকে বোঝাল বিয়ে একটা আনন্দিত হওয়ার মত ব্যাপার। আমি আনন্দিত হয়ে উঠলাম। উদ্বেলও হলাম হয়ত।
বিয়ের রাতটা দিপালী আমাদের বাড়িতেই থাকল। পরদিন চলে গেল শ্বশুর বাড়ি। দিপালী খুব কি কেঁদেছিল সেদিন? কিংবা আদৌ কি কেঁদেছিল? হয়ত কেঁদেছিল। কিংবা কাঁদে নি। আমার মনে নেই। আমিও কি কেঁদেছিলাম? মনে নেই সেটাও। যেটা মনে আছে, কদিন পরে আম্মা আবিষ্কার করলেন খাটের নিচে লুকিয়ে লুকিয়ে আমি কাঁদছি। হাতে দিপালীর জামা। জামাটা আমার চোখের জলে অনেকটা ভিজে গিয়েছিল।
আম্মা আমাকে জাপটে ধরে বলেছিলেন, ‘হায় হায়! আমার ছেলেটা তো মরে যাবে!’
তারপর তক্ষুণি আজাদকে দিয়ে আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন দিপালীর কাছে।
আমি যখন দিপালী বাড়িতে পৌঁছলাম দিপালী তখন মসলা পিষছিল। আমি ওকে দেখতে পেয়েই চিৎকার করে উঠেছিলাম,
-‘দিপালী!’
আনাড়ী ভঙ্গিতে শাড়ি পরা দিপালী স্থানকালপাত্র ভুলে ছুটে এসেছিল। এসে আমাকে জাপটে ধরেছিল। আম্মার মতই। চুমোয় চুমোয় আমার মুখটা লালা দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছিল। হারানো সন্তান ফিরে পেয়ে মা যেভাবে দেয়, সেভাবেই।
তারপর দিপালীর বাড়িটাই আমারও ঠিকানা হয়ে গেল। অল্পদিনেই পুরো এলাকায় আমারও দৌরাত্ম চলতে লাগল।
সেদিন ওপাড়ায় নাটক হবে। বাৎসরিক মঞ্চনাটক। পেশাদারদের নয়। স্থানীয় আয়োজন। সরকার বাড়ির স্কুল মাঠে মঞ্চ তৈরি হচ্ছে। চারদিকে একটা উৎসবের আমেজ। জিয়াভাই আমাকে নতুন টি শার্ট আর হাফপ্যান্টের সেট কিনে দিয়েছেন। সন্ধ্যার পর সেটা পরে ধুলায় খেলছি। ধুলা মাখছি।
কতক্ষণ পর জিয়া ভাই এসে আমাকে ধরে নিয়ে গেলেন। বাসায়। সেখানে তখন আশপাশের সকল নারীরা। সবাই সেজেগুজে আছেন। সেজেছে দিপালীও। বড় ঝলমলে সাজ। জিয়াভাই তাড়া দিচ্ছিলেন স্কুল মাঠে যেতে। দিপালী যাবে না। নাটকের ছবি তুলতে আসা ফটোগ্রাফারকেও আটকে রেখেছে। আমাকে নিয়ে ছবি তুলবে।
ধুলামলিন ঘর্মাক্ত আমি যেতেই ডান হাতে আমার বাঁ হাতের কব্জি চেপে ধরল। ছবি তোলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আর ছাড়ে নি। যদি ছবি না তুলে আবার দৌড়ে পালাই!
এটা সেই ছবিটাই।
আমি পালাই নি। আমার পালানো হয় না। দিপালী পালিয়েছে। মরে গেছে। ২০১২ সালে। আগুন লেগেছিল। বাসাতেই। আমরা দুপুরে খবর পেয়ে সন্ধ্যার ফ্লাইটেই উঠেছিলাম। আমরা দু ভাই। তখনও বেঁচে দিপালী। ধুঁকছিল যন্ত্রণায়। কি কষ্ট! কি কষ্ট! যখন বাংলাদেশে নামলাম। নেই। মরে গেছে। নাকি তার আগেই। মনে নেই।
থাক না সে গল্প। অন্যর সাতকাহন কেই বা পড়তে চায়। সাদাকালো ছবির গল্পটা তো বলা হল।
অসম্ভব মায়াবতী এক জননীর নাম দিপালী। অসম্ভব স্বপ্নবতীও। ওর সবকিছুতেই ‘অসম্ভব’ শব্দটি খুব অদ্ভুতভাবেই যায়! এই যেমন ভালোবাসা...
২৮.৪.১৮
লেখক: প্রবাসী সাংবাদিক