27-Mon-May-2019 08:38am

Position  1
notNot Done

মানবাধিকার প্রতিবেদন-২০০৯

zakir

2018-01-15 21:41:34

দ্য পলিটিক্স রিপোর্ট:  ১ জানুয়ারি (২০১০) শুক্রবার বিকেলে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ২০০৯ সালে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ প্রকাশ করে আইন ও সালিস কেন্দ্র (আসক)। প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০০৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ২০০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। পরের দুই মাসে ঘটেছে আরও ২৯টি। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ১৭৫। ২০০৯ সালে যে ২২৯টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটে, তার মধ্যে নিরাপত্তা হেফাজতে নিহত ৪৭ বিডিআর জওয়ানের মৃত্যুর ঘটনাও রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর তথ্য অধিকার আইন পাস হলেও আইনটির আশানুরূপ বাস্তবায়ন ঘটেনি। গত বছর সমাবেশে ৬৩ বার ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। যৌন হয়রানি রোধে হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনা বাস্তবায়নেরও দাবি জানানো হয়। একইভাবে সালিসের নামে দোররা মারা, প্রহার করা, বেত্রাঘাত বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানানো হয়। প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে ৪৩৯ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৩৯টি। ২০০৯ সালে ফতোয়ার ঘটনা ঘটেছে ৩৫টি এবং ২৭৭ জন নারী পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৮৯ জন, তাঁদের মধ্যে হত্যার ঘটনা ঘটেছে ১৮৯টি। এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে ৬৩ জন নারীর ওপর। সাতটি ঘটনায় ধর্ষণকারী ছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এ পর্যন্ত ২৮০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এতে সাড়ে তিন হাজার মানুষ আহত ও ৩৬ জন নিহত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দাবি জানান হয়। এ অনুষ্ঠানে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি আমিরুল কবীর চৌধুরী বলেন, ক্রসফায়ার কোনো সভ্য সমাজ সমর্থন করতে পারে না। তিনি প্রতিটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে উচ্চপর্যায়ের ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন।
অনুষ্ঠানে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দুর্নীতি ও দলীয়করণ সমূলে উৎপাটন করে দেশে সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি ওঠে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে কার্যকর করার কথাও বলা হয়।
‘মানবাধিকার বাংলাদেশ ২০০৯: সারসংক্ষেপ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে গত ফেব্রুয়ারি মাসে পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট; বিদ্রোহের পর সরকারি হেফাজতে আটক জওয়ানদের মৃত্যু, যুদ্ধাপরাধের বিচার, রাজনৈতিক সহিংসতা ও ছাত্র সংঘাত, পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, নারীর অধিকার, শ্রমিকের অধিকার, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের রায়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন পাস নিয়ে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদন, আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্বে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।  প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘দেশের সর্বোচ্চ আদালত সরকারকে দু-দুটো রুল জারি করার পরও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থেমে থাকেনি। বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলেও বিভিন্ন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ক্রসফায়ারের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। তখন বিরোধী দলে থেকে আওয়ামী লীগ এসব বক্তব্যের নিন্দা করলেও এখন একই ধরনের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি শোনা যায়।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি আমিরুল কবীর চৌধুরী বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কোনো সংস্থা কর্তৃক যেন কোনোভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন না হয়, সে জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেন, দারিদ্র্য দূরীকরণের পাশাপাশি মানবাধিকার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সভা-সেমিনার আয়োজন, সাময়িকী, পুস্তিকা প্রকাশ ও প্রচারের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো যেতে পারে।
এক প্রশ্নের জবাবে আসকের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেন, ক্রসফায়ার বন্ধ করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে, নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরকারকে তার নির্বাচনী ইশতেহারের অঙ্গীকার অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কোনো অগণতান্ত্রিক ও বর্বর উপায়ে দেশ চলবে না।
বিডিআর হত্যাকাণ্ড: গত ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ, হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, লাশ গুমের বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা করা হয় প্রতিবেদনে। বলা হয়, ‘নির্যাতন, লাশ পুড়িয়ে ফেলা, গণকবরে পুঁতে ফেলা—এসব আমাদের একাত্তরের দুঃসহ দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়।’
প্রতিবেদনে বিদ্রোহের দুই দিনের হত্যাকাণ্ডের নিন্দার পাশাপাশি জবানবন্দি আদায়ের নামে বিডিআর জওয়ানদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগও আনা হয়। বলা হয়, বিডিআর সদর দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী নিরাপত্তা হেফাজতে আটক অবস্থায় এ পর্যন্ত ৪৭ জন বিডিআর জওয়ান মারা গেছেন। তাঁদের মধ্যে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ১০ জন, আত্মহত্যায় পাঁচ, লিভার সিরোসিসে চার, কিডনি রোগে তিন, উচ্চরক্তচাপে দুই ও ক্যানসারে দুজনের মৃত্যুর কথা বলা হলেও আসকের নিজস্ব তদন্ত ও বিভিন্ন পত্রিকার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তাঁদের সবাই নির্যাতনের কারণে মারা গেছেন।
বিডিআর সদর দপ্তরে সেনা কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি আটক বিডিআর সদস্যদের মানবাধিকার নিশ্চিত করারও দাবি জানানো হয় প্রতিবেদনে।
যুদ্ধাপরাধের বিচার: যুদ্ধাপরাধের বিচারে দীর্ঘসূত্রতা দেখে জনগণের মধ্যে বিচার শুরু নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়। বলা হয়, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে বিচারকাজ পরিচালনার জন্য সরকার পুরোনো হাইকোর্ট ভবনে তদন্ত সংস্থার দপ্তর ও বিচার আদালত স্থাপনের পাশাপাশি আইনজীবী নিয়োগের ঘোষণা দেয়। বিচারপ্রক্রিয়া আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করতে জাতিসংঘের কাছে কৌশলগত সহায়তা চায় সরকার এবং জাতিসংঘ এ সহায়তা দিতে সম্মতও হয়। তবে বাস্তবিক অর্থে কবে বিচার শুরু হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। এ বিষয়ে সরকারের দীর্ঘসূত্রতা দেখে জনগণের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগছে— আদৌ বিচার শুরু হবে তো?
এক প্রশ্নের জবাবে সুলতানা কামাল বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি। দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত তারা। এদের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক। নির্বাচনের আগে তারা আন্তরিকভাবে ক্রসফায়ার, দলীয়করণের বিরুদ্ধে কথা বলেছিল; টেন্ডার-চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু এসব ঘটনা এখনো ঘটছে।’
আসকের কর্মকর্তা মোর্শেদ আলম সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন।