19-Wed-Dec-2018 02:29pm

Position  1
notNot Done

মানবাধিকার প্রতিবেদন-২০১৫

zakir

2018-01-14 19:47:40

দ্য পলিটিক্স রিপোর্ট: ২০১৫ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ হিসেবে অভিহিত করেছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। ২ জানুয়ারি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০১৫ : আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পর্যালোচনা’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসক। আসকের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল এ সময় বলেন, ‘আমাদের পর্যালোচনা বলছে, মানবাধিকার পরিস্থিতির দৃশ্যমান অবনতি না ঘটলেও উন্নতি ঘটছে না। এর মূল কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতি। ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশায় জনগণের মনে দোদুল্যমানতা দেখা দিয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে সুলতানা কামাল বলেন, ২০১৫ সালের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিত ছিল উদ্বেগজনক। ৫ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে বিএনপির মহাসমাবেশে সরকারের বাধা ও তৎপরবর্তী বিএনপি-জামায়াত জোটের লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি দেশকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। একটানা দুই মাসেরও অধিক সময়জুড়ে এ অবরোধ কর্মসূচি চলে। দেশজুড়ে এ সময় যানবাহনে ব্যাপক পেট্রলবোমা নিপেক্ষ, অগ্নিসংযোগ ও নাশকতাসহ নানাবিধ রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় হতাহতের শিকার হন দেশের সাধারণ মানুষ। একই সাথে রাজনৈতিক সহিংসতা দমনের নামে শুরু হয় রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনী কর্তৃক অপহরণ, গুম, গুপ্তহত্যা, ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, যা বছরজুড়ে অব্যাহত ছিল। এ ছাড়া বিগত বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালেও বিনা বিচারে আটক, গণগ্রেফতার এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ২০১৫ সালে মানবসৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটে সাগরপথে মানবপাচার এবং থাই-মালয়েশীয় সীমান্তের গভীর জঙ্গলে অভিবাসনপ্রত্যাশী বাংলাদেশী শ্রমিকের গণকবর আবিষ্কার ও কঙ্কাল উদ্ধারের ক্ষেত্রে।
২০১৫ সালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ, মতাসীন দলের সাথে বিরোধী দল এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলসহ মোট ৮১২টি রাজনৈতিক সঙ্ঘাতের ঘটনা ঘটে। এসব রাজনৈতিক সঙ্ঘাতে মোট ১৫১ জন নিহত ও ৫৮০২ জন আহত হন। নিহতদের মধ্যে ৯০ জন ছিলেন সাধারণ মানুষ। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে ৬৬৪টি সংঘাতের ঘটনায় ১৪৭ জন নিহত হয়েছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালে আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী কর্তৃক ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, গুলিবিনিময় ও এনকাউন্টারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা গত বছরের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৫ সালে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, গুলিবিনিময় এবং হেফাজতে মোট ১৯২ জন নিহত হন। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১২৮। ২০১৫ সালে গ্রেফতারের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে শারীরিক নির্যাতনে মারা যান ৬ জন, গ্রেফতারকালীন সময়ে মারা যান ৫ জন এবং গ্রেফতারের পর আত্মহত্যা করেন ৩ জন। এ বছর কারা হেফাজতে মোট মারা যান ৬৮ জন, যার মধ্যে হাজতি ছিল ৪২ জন এবং কয়েদি ছিল ২৬ জন। অন্য দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে আটককৃতদের পায়ে গুলি এবং এর ফলে স্থায়ী পঙ্গুত্ববরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে বছরের বিভিন্ন সময়ে। ভিকটিম এবং তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য কর্তৃক গুলি করার অভিযোগ পাওয়া গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপ এ বিষয়টি বরাবরের মতোই অস্বীকার করেছে। তবে কয়েকটি ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে তিগ্রস্ত পরিবার আইনি পদপে গ্রহণ করেছে।
গুম-গুপ্তহত্যা
আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর এখন পর্যন্ত অনেকেরই খোঁজ পাওয়া যায়নি। আবার কোনো কোনোেে ত্র গুম হওয়ার পর লাশ উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে। ২০১৫ সালে এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছেন মোট ৫৫ জন। এর মধ্যে পরবর্তী সময় ৮ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে, ৭ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, পরিবারের কাছে ফেরত এসেছেন ৫ জন এবং বাকিদের এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজ মেলেনি। বেশির ভাগ ঘটনায় অপহৃত, নিখোঁজ বা নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী, বিশেষত র্যাব ও ডিবির বিরুদ্ধে এসব ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুললেও সাধারণত এেে ত্র সরকারের তরফ থেকে কোনো প্রেসনোট প্রদান বা কোনো ধরনের দায়দায়িত্ব স্বীকারসহ গুম বা গুপ্তহত্যা রোধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা কিংবা তদন্তকার্যক্রম পরিলতি হয়নি।
গণপিটুনি
আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছিল ১২৩ জন। ২০১৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৫ জনে। এ বছর মানবপাচারের এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। সাগরপথে নৌকা, জাহাজ বা ট্রলারে করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর এখন পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন অভিবাসনপ্রত্যাশী অসংখ্য মানুষ। ইউএনএইচসিআরের এপ্রিল মাসের প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালের প্রথম তিন মাসেই অন্তত ২৫ হাজার মানুষ পাচারের শিকার হয়। এর মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন মারা গেছেন।
ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন
সুলতানা কামাল বলেন, বিগত বছরগুলোর মতো ২০১৫ সালেও দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষের ওপর ব্যাপক হামলা-নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির ও প্রতিমা ভাঙচুর, বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা এবং তাদের বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা অব্যাহত ছিল। ২০১৫ সালে সারা দেশে বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ১০৪টি বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং মন্দির উপাসনালয় ও প্রতিমা ভাঙচুরের ২১৩টি ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া আক্রমণের শিকার হয়েছেন খ্রিষ্টান, বাহাই, শিয়া ও আহমদিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন। এসব ঘটনারেে ত্র আইনশৃঙ্খলা রাকারী কর্তৃপরে যথেষ্ট দায়িত্বশীল পদপে ল করা যায়নি।
সীমান্ত হত্যা ও নির্যাতন
সুলতানা কামাল বলেন, বিগত বছরগুলোর মতো ২০১৫ সালেও ভারতের সীমান্তরী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এেে ত্র ভারত সরকারের প্রতিশ্রুতি কোনো কাজে আসেনি। বাংলাদেশ সরকারের প থেকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হলেও এ ধরনের ঘটনা নিরসনের জন্য গৃহীত সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে পারেনি। বহুল আলোচিত ফেলানী হত্যা মামলায় বিএসএফের আদালত কর্তৃক পুনর্বিবেচিত রায়ে ন্যায়বিচার পায়নি তার পরিবার। যদিও মানবাধিকার সংগঠনের সহযোগিতায় এ বছরের ১৪ আগস্ট ফেলানীর বাবা ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেছেন। ২০১৫ সালে সীমান্তে হত্যা ও নির্যাতনসহ মোট ২০৯টি ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে হত্যার শিকার হন ৩২ জন, শারীরিক নির্যাতনে নিহত হন ১৪ জন এবং আহত হন ৭৩ জন। এ ছাড়া সীমান্ত থেকে অপহরণের শিকার হয়েছেন ৫৯ জন বাংলাদেশী নাগরিক।
সাংবাদিক নির্যাতন
সুলতানা কামাল বলেন, ২০১৫ সালে বিভিন্ন সময়ে খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা হত্যা, নির্যাতন, মামলা ও গ্রেফতারসহ বিভিন্ন হয়রানির শিকার হন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য সংরণ ইউনিটের তথ্যানুযায়ী ২০১৫ সালে তিনজন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৮ জন সাংবাদিক। এ ছাড়া মোট ২৪৪ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এ বছর সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল ফরিদপুরের সাংবাদিক প্রবীর শিকদারকে গ্রেফতার ও রিমান্ডে নেয়ার বিষয়টি। অভিযোগ ওঠে যে প্রভাবশালী ব্যক্তির স্বার্থবিরুদ্ধ অবস্থান নেয়ার কারণে তাকে আটক করা হয় ও রিমান্ডে নেয়া হয়। যদিও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংগঠন ও নাগরিক সমাজের অব্যাহত প্রতিবাদের মুখে তাকে জামিনে মুক্তি দেয়া হয়।
সুলতানা কামাল বলেন, ২০১৫ সালে কমের্েত্র ২৮২টি দুর্ঘটনায় মোট ৩৭৩ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডে নিহত হয়েছেন ১০ জন শ্রমিক। ২০১৫ সালের ১লা জানুয়ারি ঢাকার মিরপুরে প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১৪ জন শ্রমিক নিহত হন। এ ছাড়া বাগেরহাটের মংলায় সিমেন্ট ফ্যাক্টরির নির্মাণাধীন ভবনধসের ঘটনায় ৬ জন নিহত ও প্রায় ১০০ জন আহত হওয়ার ঘটনা ছিল উল্লেখযোগ্য।