19-Wed-Dec-2018 08:49pm

Position  1
notNot Done

দেশে দেশে ভয়ংকর জঙ্গি সংগঠন

zakir

2018-01-16 11:45:22

দ্য পলিটিক্স ডেস্ক:  জঙ্গি সংগঠন বিশ্বে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত এবং সমালোচিত। দেশে দেশে নিরাপত্তা এবং শান্তি নষ্ট করছে এ সংগঠনগুলো। বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করছে। নষ্ট করছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। আবার এ সংগঠনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশ। এই সংগঠনগুলো বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধাবস্থা বিদ্যমান রেখেছে। প্রশ্ন আছে- কেনই বা এই সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তারা কোন উদ্দেশ্যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, কোন কোন দেশ তাদের সহযোগিতা করছে বা কোথা থেকে সংগঠনগুলো অর্থ পাচ্ছে এ সব বিষয়ে জানার চেষ্টা করা হয়েছে এ প্রতিবেদনে।

জঙ্গি শব্দের অর্থ এবং বিশ্লেষণ

বাংলা একাডেমির অভিধানে ইংরেজি Militant (মিলিটান্‌ট্‌) শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ দেওয়া হয়েছে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত; শক্তি বা জোরালো চাপপ্রয়োগে নিয়োজিত বা এর সমর্থক; যুদ্ধংদেহী; জঙ্গি; রণমুখো। বাংলা একাডেমির বাংলা অভিধানে জঙ্গি শব্দটিকে বিশেষণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, এর বিশেষ্যপদ জঙ্গ, জংগ (উচ্চারণ- জঙ্‌গো)। জঙ্গ শব্দের অর্থে বলা হয়েছে ১. যুদ্ধ; লড়াই। ২. তুমুল কলহ; প্রচণ্ড ঝগড়া।

আর উইকিপিডিয়ায় মিলিটান্‌ট্‌ শব্দের প্রয়োগে বলা হয়েছে- যে ব্যক্তি আগ্রাসী কাজে এবং শারীরিকভাবে যুদ্ধে নিয়োজিত/একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী, যিনি বিপ্লবী, সন্ত্রাসী অথবা গেরিলা। (Militant is usually used to describe a person engaged in aggressive verbal or physical combat/e.g. an activist, revolutionary, terrorist or insurgent). মোটা দাগে বলা যায় যিনি যুদ্ধ করেন, তিনি বিপ্লবী, বিচ্ছিন্নতাবাদী বা সন্ত্রাসী কিন্তু সরকারি বাহিনী অর্থাৎ সামরিক বাহিনী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নন-তিনিই জঙ্গি। মিডিয়াভেদে এই যুদ্ধবাজদের চিহ্নিত করতে শব্দ প্রয়োগের ভিন্নতা দেখা যায়। এপি, ওয়াশিংটন পোস্ট, রয়টার্স, ফক্স নিউজসহ পশ্চিমা মিডিয়াগুলো যে ‘হামাস’কে জঙ্গি (Militant) বলে, সেই হামাসের একজন সদস্যকে মধ্যপ্রাচ্যের মিডিয়া আল জাজিরা বলে যোদ্ধা (Fighter)। পার্লামেন্ট নির্বাচনে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হামাসকে পশ্চিমা মিডিয়া বলে থাকে জঙ্গি গ্রুপ।     

বিশ্বে ১৫৬টি জঙ্গি সংগঠন

জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের ১৬টি দেশ বা সংস্থা ১৫৬টি সংগঠনকে জঙ্গি সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এই ১৬টি দেশ বা সংস্থা হলো অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, মিশর, ইরান, ভারত, কাজাখস্তান, সৌদি আরব, চীন, রাশিয়া, তিউনেসিয়া, তুরস্ক, ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘ। এর মধ্যে যুক্তরাজ্য সর্বাধিক ৬৮টি সংগঠনকে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করে। আর জাতিসংঘ কাতাব হিজবুল্লাহ, ইসলামিক স্টেট অব ইরাক, বোকো হারাম, আল-কায়েদা, আল নুসরা ফ্রন্টকে তাদের জঙ্গি তালিকায় রেখেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২৯টি এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের তালিকায় ৬০টি সংগঠনকে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।  এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)। যার পূর্ব নাম ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া (আইএসআইএস)। এটি উত্তর ইরাক ও পূর্ব সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে সেখানে খিলাফত বা ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

 কোন উদ্দেশ্যে জঙ্গি সংগঠনের সৃষ্টি

জঙ্গি সংগঠনগুলোর একক বা নির্দিষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নেই। অঞ্চলভেদে সংগঠনগুলোর লক্ষ্যও ভিন্ন। তবে তারা অধিকাংশই ইসলাম ধর্মের আবরণে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। তারা বিভিন্ন দেশ থেকে অর্থের জোগান পেয়ে থাকে। যেমন আল-কায়েদার লক্ষ্য ছিল দেশে-বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বা স্থাপনা। তাদের হাতে মুসলমান হতাহতের খবর পাওয়া যায় না। কিন্তু আইএসের লক্ষ্য মুসলমান সুন্নিরা। ইরাক এবং সিরিয়ার একটা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে শত শত মুসলমানকে হত্যা করে তারা সেখানে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আবার নাইজেরিয়ার বোকো হারামের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য মুখ্য নয়, হামলা চালিয়ে মানুষ হত্যা করে লুটপাট চালায় তারা।    

অধিকাংশ শক্তিশালী জঙ্গি সংগঠনের প্রতিষ্ঠার মূলে যুক্তরাষ্ট্র বা তার বন্ধু দেশের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ইন্ধনের অভিযোগ রয়েছে। আল-কায়েদা যুক্তরাষ্ট্রের সৃষ্টি বলে সম্প্রতি স্বীকার করেছেন প্রাক্তন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। গত জুনে ফক্স টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আফগানিস্তানে তৎকালীন সোভিয়েত বাহিনীকে পরাস্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র আল-কায়েদা বাহিনী সৃষ্টি করে। ১৯৮০ থেকে ১৯৯৪ সালের এই সময়ের মধ্যে আফগানিস্তানে একটি সশস্ত্র বাহিনী তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৫৩ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছিল। তালেবানকেও একইভাবে একই উদ্দেশ্যে তৈরি করা বলে অভিযোগ আছে। পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের মাদ্রাসা থেকে স্বল্পশিক্ষিত তরুণদের সংগ্রহ করে তাদের মগজ ধোলাই করে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করা হয়।  

 জঙ্গিদের অর্থায়ন

লিবিয়ায় কর্নেল গাদ্দাফি সরকারের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহী গ্রুপ যুদ্ধ করে, তাদের অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করে ন্যাটোর কয়েকটি দেশ। সিরিয়ার আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সরকারবিরোধীদের অর্থ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আবার ইউরোপীয় পার্লামেন্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি সংগঠন নামে-বেনামে সারা বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে চরমপন্থি ইসলামি ভাবাদর্শ বিস্তারের লক্ষ্যে অর্থায়ন করে। বিশেষ করে সিরিয়া, মালি, আফগানিস্তান, পাকিস্তানের মতো দেশে। অর্থ দেওয়ার প্রাথমিক উদ্দেশ্য ইসলামের ভিন্ন মতামতগুলো বিকশিত হতে না দেওয়া এবং নিজস্ব মতাদর্শের প্রাধান্য নিশ্চিত করা। ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি দাতাগোষ্ঠীগুলো নব্বইয়ের দশক থেকে উন্নয়নশীল দেশে সন্ত্রাসীদের অর্থায়ন করছে। সৌদি দাতাগোষ্ঠীর সন্ত্রাসী অর্থায়ন নিয়ে প্রতিবেদন ফাঁস করেছে ইউকিলিকসও। উইকিলিকসের ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, সৌদি আরব থেকে প্রতিবছর কমপক্ষে ১০০ মিলিয়ন ইউএস ডলার সারা বিশ্বের ‘দেওবন্দী’ ও ‘আহলে হাদিসপন্থি’ চরমপন্থীদের দেওয়া হয়। সৌদি আরব থেকে সুন্নি মতাবলম্বী চরমপন্থিদের জন্য অর্থায়ন হয়। এর বিপরীতে শিয়া মতাবলম্বীদের জন্য অর্থায়ন করে ইরান। আবার সৌদি আরবের যেসব সংগঠন জঙ্গিদের অর্থায়ন করে তারা আবার যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশ থেকে অর্থ পেয়ে থাকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওই প্রতিবেদনে কুয়েতের ধর্মপ্রচারক শেখ হাজ্জাজ বিন হাজামির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কুয়েতের এই ধর্মপ্রচারক অর্থ সংগ্রহ করার জন্য তার টুইটার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেন। তিনি চরমপন্থিদের অর্থায়নের জন্য দাতাদের উৎসাহিত করেন। কোথায়, কীভাবে অর্থ জমা দিতে হবে তারও পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

 আইএস

বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএস। যার পূর্বে নাম ছিল আইএসআইএস। ২০১৩ সালে ইরাকের আল-কায়েদার প্রধান আবু বকর আল-বাগদাদী সংগঠনটি গঠন করেন। বিভিন্ন মুসলিম দেশ থেকে ইরাকে মার্কিন এবং তাদের মিত্রবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে আসেন তরুণরা। পরে সিরিয়াতে আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী বাহিনী গড়ে উঠলে তারা সৌদি মদদে সেই দলে যোগ দেন। সিরিয়ার আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পাশাপাশি তারা নতুন সালাফী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আইএস নামে সংগঠিত হয়ে সিরিয়া এবং ইরাকে হত্যা, ধ্বংস শুরু করেছে। আল-কায়েদার লক্ষ্য ছিল পৃথিবীব্যাপী মার্কিন নাগরিক এবং সম্পদ। তাদের হাতে মুসলমানদের হত্যার তেমন অভিযোগ পাওয়া যায় না। কিন্তু আইএসের লক্ষ্য ইরাক-সিরিয়ার বিশাল ভূখণ্ড একত্র করে সেখানে খিলাফত প্রতিষ্ঠা। এ জন্য তারা শত শত সুন্নি মুসলমানদের হত্যা করছে। আইএসের উৎপত্তি মূলত  আল-কায়েদা থেকে। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর সেখানে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিতে থাকে ওসামা বিন লাদেনের আল-কায়েদা। আইএস অনুসরণ করে ওহাবিবাদের প্রতিষ্ঠাটা মুহাম্মাদ বিন আবদুল ওহাবকে। তাদের ধর্মীয় আকিদায় বাইরে যে কেউ তাদের দৃষ্টিতে মুশরিক। আর মুশরিকদের হত্যা এবং তাদের জান-মাল ছিনিয়ে নেওয়া জায়েজ মনে করে তারা।   ইরানের প্রেস টিভির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্যাট্রিক ড্যানিয়েল ওয়েলচ বলেন, এই আইএসকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সাহায্য দিয়ে মাঠে নামানো হয়েছে। প্রতিবেশী জর্ডানে আইএসের সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আইএসের প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে ওয়েলচ বলেন, মার্কিন সরকার দুই পক্ষের হয়েই খেলছে। যা তারা সব সময় করে থাকে। মানবাধিকার সংস্থা সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস (এসওএইচআর) সম্প্রতি জানায়, আইএসের সিরিয়ায় ৫০ হাজারের বেশি সদস্য রয়েছে। আরো ভয়ংকর তথ্য হলো এর মধ্যে ২০ হাজার সদস্য সিরিয়ার বাইরের নাগরিক। আবার আইএস জানিয়েছে, ইরাকে তাদের সদস্য সংখ্যা ৩০ হাজার।  মানবাধিকার সংস্থাটির পরিচালক রামি আবদুল রহমান বলেন, গত জুলাইয়ে জঙ্গি সংগঠনটি সর্বোচ্চ ছয় হাজার সদস্য সংগ্রহ করে। এদের অধিকাংশই সিরিয়া এবং তুরস্কের নাগরিক। এর বাইরে চেচনিয়া, চীন, ইউরোপ ও অন্যান্য আরব দেশ থেকে এক হাজার সদস্য এসেছে। আল-কায়েদা সমর্থিত নুসরা ফ্রন্ট থেকে দুই শতাধিক জঙ্গি এ সংগঠনে যোগ দিয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী জঙ্গি সংগঠন আইএস। ২০১৪ সালের মধ্যভাগে ইরাকি গোয়েন্দা সংস্থা জানায়, আইএস জঙ্গিদের হাতে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের সম্পদ রয়েছে। একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত জঙ্গি সংস্থাটির বাজেটের পাঁচ ভাগ অর্থ এসেছে আশপাশের দেশগুলোয় অবস্থিত বিভিন্ন ধনী ব্যক্তির ব্যক্তিগত সহায়তা থেকে। বাকি সব অর্থ জোগানো হয়েছে ইরাকের অভ্যন্তরে অপহরণ, লুটতরাজ, চাঁদাবাজি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলার মাধ্যমে। মসুল দখল করার পর আইএসের সদস্যরা ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সাবসিডিয়ারি থেকে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার লুট করে। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের ইরাক বিষয়ের ওপর গবেষক মাইকেল নাইটসের হিসাব অনুসারে, আইএসের দৈনিক আয় ২০ লাখ থেকে ৪০ লাখ ডলার। তারা ইরাক ও সিরিয়ার বেশ কিছু তেলের খনি দখল করে নিয়েছে। এ তেলের খনিগুলো থেকে তারা সীমান্তবর্তী এলাকায় তেল রপ্তানি করে। নাইটসের হিসাবে, তারা দৈনিক ৩০ থেকে ৪০ হাজার ব্যারেল তেল উত্তোলন করে। উত্তোলিত তেল সিরিয়ায় নিয়ে যায়। এখানে শোধন করার পর ট্রাকে করে তুরস্ক, এমনকি ইরানের মধ্য দিয়ে অন্য দেশে রপ্তানি করে। গত জুন মাসে ইরাকের পশ্চিমাঞ্চল ও সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে একটি ইসলামিক রাষ্ট্র ঘোষণাকরেছে আইএস। এরপর ইরাকের পূর্বাঞ্চলে আইএস সদস্যরা একটি আদিবাসী গোষ্ঠীর প্রায় ৭০০ সদস্যকে শিরশ্ছেদ করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রায় একই সময়ে তারা ইরাকের একটি গ্রামে সংখ্যালঘু ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের ৮০ লোককে হত্যা করে। তবে কিছুদিন হলো মার্কিন সামরিক বাহিনী আইএসের ঘাঁটি ও সদস্যদের ওপর বিমান হামলা চালিয়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে সরিয়ে দিচ্ছে।

আল-কায়েদা 

আশির দশকে আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নকে বিতাড়িত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মদদে প্রতিষ্ঠার করা হয় আল-কায়েদা। আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কলকাঠি নেড়েছিল সিআইএ। অভিযোগ আছে- সিআইএ তখন আল-কায়েদাকে জোগান দিয়েছিল অস্ত্র ও অর্থ। অনেক দিন ধরেই আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদা পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে শক্ত শিকড় গাড়ে। আল-কায়েদা প্রথম অপারেশন চালায় ১৯৮৮ সালে।   আল-কায়েদা শব্দটির চেয়ে বিশ্বের মানুষের কাছে ওসামা বিন লাদেন নামটি অধিক পরিচিত। ওসামা বিন লাদেনের কাঁধে ভর করেই আল-কায়েদার এত পরিচিতি। সৌদি কোটিপতি লাদেন পরিবারের অন্যতম সদস্য ওসামা বিন লাদেন। ‍যিনি পেশায় ছিলেন প্রকৌশলী। ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর সংগঠনটির নেতা নির্বাচিত হন আইমান আল জাওয়াহিরি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংগঠনটি সক্রিয় ছিল। ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর সংগঠনটি অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন বাহিনী বিশেষ অভিযান চালায়। সেই অভিযানে ওসামা বিন লাদেন নিহত হন। এরপর আল-কায়েদা পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান থেকে সরে ইয়েমেনে সক্রিয় হচ্ছে। তবে শুধু ইয়েমেন নয়, অন্যান্য দেশের জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গেও তাদের যোগসূত্র বাড়ছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র  টুইন টাওয়ারে চুরি করা বিমান দিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে উচ্চ ভবন দুটি ভেঙে গলে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। এতে বিভিন্ন দেশের তিন সহস্রাধিক নাগরিক নিহত হয়। এ হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র আল-কায়েদাকে দায়ী করে। এরপর মার্কিন বাহিনী পৃথিবীব্যাপী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে ধরতে ২০০১ সালে ন্যাটোর নেতৃত্বে আফগানিস্তানে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। আল-কায়েদার বিরুদ্ধে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামরিক এবং বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো অভিযোগ রয়েছে। টুইন টাওয়ারে হামলা ছাড়াও ১৯৯৮ সালে মার্কিন দূতাবাসে হামলা এবং ২০০২ সালে ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে বোমা হামলা তার মধ্যে অন্যতম। এ সব হামলায় হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়। বিশ্বের বহু জঙ্গি সংগঠন আছে, যেগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আল-কায়েদা প্রভাবিত। সেগুলো হলো ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট, ইসলামিক মুভমেন্ট অব উজবেকিস্তান, তালেবান, কাওকাসাস ইমেরাত, ফাতাহ আল ইসলাম, লস্কর-ই-তায়েবা, জাইশ-ই-মোহাম্মদ, জেমাহ ইসলামিয়াহ, আবু সায়াফ, রাজহা সাল আইমান মুভমেন্ট, ইসলামিক জিহাদ ইউনিয়ন, মুভমেন্ট ফর ওনিনেস অ্যান্ড জিহাদ ইন ওয়েস্ট আফ্রিকা, মরোক্কান ইসলামিক কমব্যাটমেন্ট গ্রুপ এবং আল-কায়েদা কুরদিস ব্যাটালিয়ন।

 তালেবান

তালেবান শব্দের অর্থ ছাত্র। ১৯৯০ দশকের গোড়ার দিকে পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলে প্রথম তালেবান সংগঠনের প্রকাশ ঘটে। মোল্লা মোহাম্মদ ওমর তালেবানের নেতা। তিনি মূলত ছোট ছোট কিছু জঙ্গি সংগঠনের কমান্ডার, মাদ্রাসারশিক্ষকদের নেতৃত্বে তালেবান সৃষ্টি করেন। তালেবান সদস্যদের অধিকাংশই পাকিস্তানের ধর্মীয় স্কুলে শিক্ষিত আফগান উদ্বাস্তু। তারা জাতিসত্তায় আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে এবং পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের পশতুন। এ ছাড়া অফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের কিছু মুসলিম দেশ থেকে স্বেচ্ছাসেবী তরুণরাও এসে তালেবানে নাম লেখায়। ১৯৯৪ সালে হেমন্তে আফগানিস্তানে পশতুন আন্দোলনের মাধ্যমে তালেবান প্রকাশ্যে আসে। ১৯৯৬ সালে তালেবান আফগানিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং পাকিস্তান সেই তালেবান সরকারকে সমর্থন দেয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে এই আন্দোলনের নেতারা ক্ষমতাসীন ছিলেন। ২০০১ সালে নর্দান অ্যালায়েন্স এবং ন্যাটো দেশগুলোর পরিচালিত যৌথ অভিযানের মাধ্যমে সে দেশে তালেবান শাসনের অবসান ঘটানো হয়। সে সময় তালেবান নেতারা অনেকেই বন্দি হন, বাকিরা পালিয়ে যান। এ জঙ্গি সংগঠনটির মিত্র সংগঠন আল-কায়েদা, হিজ্‌ব-ই-ইসলামি গুলবুদ্দিন, ওয়াজিরিস্তানের ইসলামি আমিরাত, উজবেকিস্তানের ইসলামি আন্দোলন।
এখনো তালেবান এবং সমর্থকেরা পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তের উপজাতীয় অঞ্চলে ক্ষমতাসীন আফগান সরকার, ন্যাটো সেনাবাহিনী এবং ন্যাটো পরিচালিত ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাসিস্টেন্স ফোর্সের (আইএসএএফ) বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে তালেবানরা আফগান রাজধানী কাবুলে ক্ষমতাসীন ছিল। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে মাত্র তিনটি দেশ তাদের স্বীকৃত দেয়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য আফগানিস্তান জাতিসংঘের স্বীকৃতি হারিয়েছিল এবং ইরান, ভারত, তুরস্ক, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্য এশিয়ার অধিকাংশ দেশ তালেবান শাসনের বিরোধিতা করে এবং তালেবানবিরোধী আফগান নর্দান অ্যালায়েন্সকে সাহায্য করে। পাকিস্তানি তালেবানের প্রধান নেতা বায়তুল্লাহ মেহসুদ। তার নিয়ন্ত্রিত দলের নাম তেহরিক তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। টিটিপি পাকিস্তানে বহু আত্মঘাতী হামলাসহ অন্যান্য হামলা চালানোর জন্য দায়ী করা হয়ে থাকে। 

 বোকো হারাম

হাউসা ভাষার শব্দ বোকো। আর হারাম এসেছে আরবি থেকে। বোকো শব্দের অর্থ পশ্চিমা শিক্ষা। বোকো হারাম মানে পশ্চিমা শিক্ষা পাপ। ২০০১ সালে মোহাম্মদ ইউসুফ জঙ্গি সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন দেশটির বোরনো প্রদেশের রাজধানী মাইদুগুরির পার্শ্ববর্তী দাম্বোয়ার শহরে বোকো হারাম প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখানে সংগঠনটির শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে।  বোকো হারাম আল-কায়েদার মতো পশ্চিমা শিক্ষা-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। তাদের প্রধান যুদ্ধপদ্ধতি আত্মঘাতী বোমা হামলা। ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ জঙ্গিরা ৩ থেকে ১০ হাজার মানুষ হত্যা করেছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসাব অনুযায়ী, নাইজেরিয়ার বোরনো রাজ্যে গত ৬ মাসে শতাধিক হামলায় কমপক্ষে ২ হাজার ৫৩ জন বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করেছে বোকো হারাম। বোকো হারামের অত্যাচারে চলতি আগস্ট মাস পর্যন্ত সাড়ে ৬ লাখ মানুষ তাদের বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। বোকো হারাম এখন পুরো আফ্রিকার আতঙ্ক হয়ে উঠেছে।

 বোকো হারামের উদ্দেশ্য শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠিত করা। মুখপাত্র আবু কাকা বলেন, ‘যখন দেখব সবকিছু আল্লাহর নির্দেশনা মোতাবেক করা হচ্ছে, তখনই আমাদের অস্ত্র একপাশে সরিয়ে রাখব। কিন্তু আমরা তা ত্যাগ করব না।’ সোমালিয়ায় বোকো হারামের সদস্যরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। কেউ কেউ আবার আফগানিস্তান পর্যন্ত গেছে বলে মনে করা হয়।

 আল-কায়েদার ইসলামিক সদস্য সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্যের কিছু গোষ্ঠী বোকো হারামের জন্য তহবিল সংগ্রহ করে বলে জানা যায়। আল মুনতাদা ট্রাস্টও তাদের তহবিল জুগিয়ে থাকে। বোকো হারাম সম্প্রতি জাতীয় রূপ ছেড়ে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তারা নাইজেরিয়া থেকে রাতের আঁধারে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ক্যামেরুনে ঢুকে সহিংস কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে।

 বোকো হারামের মতো ইসলামি জঙ্গিবাদের উত্থান সম্পর্কে পারসপেকটিভ অন টেররিজম-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বেঞ্জামিন ইভস্লেজ সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, আঞ্চলিক পর্যায়ে কর্মকাণ্ড চালিয়ে সফল হলে একই মতাদর্শী জঙ্গি সংগঠনগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোটবদ্ধ হয়ে সন্ত্রাসী হামলা চালাতে পারে। তখন বিশ্বের জন্য সেটি বড় হুমকি হয়ে দেখা দেবে।