19-Wed-Dec-2018 08:50pm

Position  1
notNot Done

কাহলিল জিবরান-এর প্যারাবল

zakir

2018-01-17 23:40:28

শুরুর কথা
‘বছরের ঋতুর মতোই এই জীবন। আনন্দময় গ্রীষ্মের পর আসে বিষাদময় শরৎ, বিষণ্ণ শরতের পর ক্রোধী শীত। ভয়ানক শীত গেলে হয় চমৎকার বসন্তের আগমন। আমি জানি না, তবে উপলব্ধি করি এক ধরনের দেনা-পাওনার প্রক্রিয়াই জীবন। এটি আজ আমাদেরকে দেয়, কাল ফিরিয়ে নেয়ার জন্যই। তারপর আবারও আমাদেরকে দেয়, পুনরায় ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। আমরা ক্লান্ত-শ্রান্ত হতে হতে চিরনিদ্রায় নিজেকে সমর্পণ না করা পর্যন্ত চলে দেওয়া-নেওয়ার এ চক্র।’ একটি চিঠিতে এমনই লিখেছিলেন কাহলিল জিবরান। চিঠির মতোই আবেগ ও দর্শনে ভরপুর তার লেখাও। পাশাপাশি সবগুলিতেই যুক্তি স্থির এবং নিরেট। এই ভাবদার্শনিকের লেখাগুলো তাই পৃথিবীব্যাপীই সমাদৃত। শুধু তাই নয়, বলা হয়ে থাকে পৃথিবীতে যে তিন জন কবির বই সবচে বিক্রি হয়, তাদেরই একজন জিবরান। শুধু কবিতাই নয়, গদ্যে চিত্রে জিবরানের ছিল দারুণ দখল। কাহলিল জিবরানের জন্ম লেবাননের পাহাড়ঘেরা বিশারি গ্রামে। বাবা কাহলিল বে। ছিলেন মদ্যপ আর তুখোড় জুয়ারি। মা কামিলা রাহমি। তিনি আগে আরেকটি বিয়ে করেছিলেন। ১৮৮৩ সালে ৬ জানুয়ারি জন্ম হয় জিবরানের। কামিলা রাহমিরা ছিলেন খ্রিস্টান। তাই ছেলের নাম রাখা হলো জিবরান। এই জিবরানই বড় হয়ে আরবি ভাষার কবিতা লেখার মোড়টা ঘুরিয়ে দেন। বালক জিবরান বড় হন মুসলিম আর খ্রিস্টান ধর্মের একটি রহস্যময় আবহের মধ্য দিয়ে। এগুলো তার পরবর্তী লেখক জীবনে বেশ প্রভাব ফেলে।

জিবরানের জন্মের কিছু দিন পর বাবা কাহলিল বে জুয়ায় হেরে হয়তোবা সরকারি অর্থ কিছুটা নয়-ছয় করেছিলেন। আর তাই আইনে ফেঁসে সোজা হাজতবাসী। ১৮৯৪ সালে যখন মুক্তি পেলেন তখন সবই বেদখল হয়ে গেছে। বাড়িটিও নেই। তাই ভাইয়ের বাড়িতে উঠেন। পাহারা দিতে লাগলেন ভাইয়ের বাদামের বন। অন্যদিকে কামিলা আর দ্বিতীয় স্বামীর ঘর করলেন না। ভাইয়ের সঙ্গে চললেন আমেরিকায়। ১৯৯৫ সালে ২৫ জুন ১২ বছরের জিবরানও রওনা দিলেন মায়ের সঙ্গে জুবেই বন্দর দিয়ে। সেই মদ্যপ কাহলিল বে পড়ে রইলেন বাদাম বাগানেই। লেবানন ছেড়ে যেত কেঁপে উঠেছিল বালক জিবরানের মন। বিষণ্ণ বালক মনে মনে বলেছে, ‘আমি আবার ফিরে আসব গাছ। আমি আবার ফিরে আসব মাটি। আমি আবার ফিরে আসব পাহাড়। পাখি ও পবিত্র সিডার বন।’ ঠিকই ফিরে এসেছিলেন জিবরান। ১৯৩১ সালে ৪৮ বছর বয়সে বুকে তীব্র ব্যথা নিয়ে নিউইয়র্কের একটা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, বিশারি গ্রামের মার সারকিস চ্যাপেলের কাছে আমার কবর দিও। সেই যে জলপাই গাছে ঘেরা।’ ১০ এপ্রিল মারা গেলেন এই মহান লেখক। আজও বিশারিতেই আছেন তিনি। শায়িত, জলপাইছায়ায়। এর মাঝখানে আমরা পেলাম অসম্ভব সব লেখা। যেখানে ফুটে উঠেছে জীবনের তরঙ্গময় কাহনচিত্র। আরবি ইংরেজি দুই ভাষাতেই তিনি লিখেছিলেন। ইংরেজিতে প্রথম প্রকাশিত হয় দ্য ম্যাডম্যান বইটি, ১৯১৮ সালে। দারুণ সমাদৃত হয়। এরপর জীবত অবস্থায় আরও ৭টি বই। মৃত্যুর পর বের হয় আরও তিনটি বই। পাশাপাশি ১৬টি সংগ্রহ। দ্য ফোররানার প্রকাশিত হয় ১৯২০ সালে। নিচের প্যারাবলগুলো ফোররানার থেকে নেওয়া।

ঈশ্বরের বোকামো

একদা মরুভূমি থেকে এক লোক এসেছিল শরীয়া নগরে। সে ছিল স্বপ্নবাদী, এবং পোশাক ও একটা ছড়ি ছাড়া তার কিছুই ছিল না। রাস্তায় হাঁটার সময় সে একই সঙ্গে আতঙ্ক ও বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়েছিল মন্দির, স্মৃতিসরনি ও রাজপ্রসাদের দিকে। মাঝে মাঝেই সে কথা বলত পথিকদের সঙ্গে। প্রশ্ন করত শহর সম্পর্কে। তবে কেউ তার ভাষা বুঝত না, আর সেও বুঝত না পথিকদের ভাষা। এক দুপুরে সে একটা বড় পান্থশালার সামনে থেমেছিল। সেটি ছিল হলুদ রঙের মার্বেলপাথরে তৈরি। সেই পান্থশালায় মানুষের প্রবেশ এবং বেরিয়ে আসতে তেমন বিলম্ব হতো না। তবে এই গৌরবময় কক্ষে লোকটার নিজেকে খুঁজে পাওয়া ছিল অনেকটা বিস্ময়ের মতো। সেখানে টেবিলে বসেছিল অসংখ্য নারীপুরুষ। তারা খাচ্ছিল, পান করছিল এবং শুনছিল সঙ্গীত। স্বপ্নবাদী লোকটি ভাবল, নিশ্চয়ই এটা কোনো প্রার্থনার অনুষ্ঠান নয়। এটা নিশ্চয়ই বড় কোনো উপলক্ষ উদ্দেশ্যে জনগণকে দেওয়া রাজকুমারের ভোজসভা। তখন একজন তার কাছে এগিয়ে এলো, সে ভাবল হয়তো রাজকুমারের দাস। লোকটি তাকে বসতে বলল এবং তাকে পরিবেশন করল মাংস, পানীয় ও অত্যন্ত চমৎকার মিষ্টি। খেয়ে খুবই পরিতৃপ্ত হলো স্বপ্নবাদী। তৈরি হলো যাবার জন্য। তবে দরজায় তাকে থামিয়ে দিল একজন বিশাল সাইজের লোক। তবে দেখল লোকটা পরিপাটি। স্বপ্নবাদী তাকেই রাজকুমার ভেবে বসল। সে তাকে অভিবাদন দিল এবং ভোজের জন্য ধন্যবাদ দিল।

অতঃপর সেই লোকটি শহরের মানুষদের মতো গুছানো ভাষায় বলল, ‘হে জনাব, আপনি আপনার নৈশভোজের অর্থ প্রদান করেননি।’ কিন্তু স্বপ্নবাদী লোকটি বুঝতে পারল না, বরং সে আরেকবার ধন্যবাদ জ্ঞাপন করল। সেই বিশাল পরিপাটি লোকটি স্বপ্নবাদীর দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ ভাবল, তাকে ভালো করে দেখল এবং বুঝতে পারল, এ অঞ্চলে সে নতুন, পোশাক-আশাকও ভালো নয়, দারিদ্র্যের ছাপ, এবং খাবারের মূল্য পরিশোধের মতো তার কাছে কোনো অর্থ নেই। লোকটি হাততালি দিল। এবং তা শুনেই শহরের চার প্রহরী হাজির। তারা এবার মনোযোগ সহকারে বিশাল দেহী লোকটির কথা শুনল। তারপর স্বপ্নবাদী লোকটাকে টেনে নিল তারা নিজেদের মাঝে, দুপাশে দুজন করে। স্বপ্নবাদী তাদের পোশাক-আশাক ও রীতিনীতি এসব আনুষ্ঠানিকতার সংক্ষিপ্ত বিবরণী লিপিবদ্ধ করল এবং আনন্দঘন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল তাদের দিকে। সে বলল, ‘এরা সেইসব মানুষ, যাদের স্বাতন্ত্র আছে, আলাদা।’ অতঃপর হাঁটতে শুরু করল তারা, থামল না যতক্ষণ পর্যন্ত বিচারকের সামনে না এলো এবং তারা প্রবেশ করল। স্বপ্নবাদী লোকটা দেখতে পেল তার সামনে সিংহাসনে বসে আছে একজন পূজনীয় লোক, তার মুখভর্তি দাঁড়ি এবং পরিধানে রাজকীয় আচ্ছাদন। সে ভাবল এটাই রাজা। রাজার সামনে নেওয়ার কারণে দারুণ খুশি হলো লোকটা। প্রহরী বিচারকার্যে সম্পর্কিত হলো, আর সেই পূজনীয় লোকটি, স্বপ্নবাদী লোকটির উপর অভিযোগ তুলল। দুইজন আইনজীবীকে নিয়োগ দিলেন বিচারক। অভিযোগ তুলে ধরবেন একজন, আর অন্যজন অভিযুক্তকে রক্ষা করবেন। আইনজীবীরা একের পর এক উঠে দাঁড়িয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরলেন। স্বপ্নবাদী লোকটা ভাবল এটা তার জন্য অভ্যর্ত্থনার ব্যবস্থা।

রাজা আর রাজকুমারের প্রতি তার হৃদয় কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠল। কারণ সে ভাবল সবই করা হয়েছে তার জন্য। স্বপ্নবাদীকে দণ্ডাদেশ দেওয়া হলো। তার অপরাধের লিপিবদ্ধ বিবরণীসহ একটা লিপিফলক তার গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। একটা ন্যাড়া ঘোড়ার তাকে সমস্ত শহর ঘোরানো হবে। সঙ্গে থাকবে একজন তুর্যবাদক ও ঢাকি। এবং তার দণ্ডাদেশ অভিলম্বে কার্যকর হলো। স্বপ্নবাদী লোকটি ন্যাড়া ঘোড়ায় চলে ঘুরে বেড়ালো সমস্ত শহর। তার সঙ্গে ছিল তূর্যবাদক ও ঢাকি। তাদের শব্দে দৌঁড়ে সামনে এলো নগরবাসীরা। দেখে প্রত্যেকেই হাসল। রাস্তায় রাস্তায় দৌড়াল শিশুরা। স্বপ্নবাদীর মন খুশিতে ভরে গেল, উজ্জ্বল হয়ে উঠল চোখ। কেননা তার মনে হয়েছিল তার গলার লিপিফলকটি রাজার আশীর্বাদ আর এই যে মিছিল, তারই সম্মানে। এই কোলাহলের ভেতর স্বপ্নবাদী দেখতে পেল তারই মতো একটা লোক, যে কিনা মরুভূমি থেকে এসেছিল। দেখে তার মন খুশিতে ভরে উঠল। চিৎকার করে সে বলল, ‘বন্ধু, বন্ধু, আমরা কোথায়? মনে কোন শহরের প্রত্যাশা? মুক্ত হস্তে দানের কি প্রতিযোগিতা, এখানের অতিথিরা প্রাসাদে উৎসবের ভোজ পায়, রাজকুমার তাকে সঙ্গ দেয়, রাজা একটা লিপিফলক ঝুলিয়ে দেয় তার বুকে, এবং সে সমস্ত শহরের আতিথেয়তা পায়, স্বর্গ থেকে নিচে নেমে এসেছে এ শহর?’ মরুভূমির লোকটা কিছুই বলল না। শুধু হাসল এবং সামান্য করে মাথা নাড়াল। মিছিলটা অতিক্রম করে চলে গেল। এবং স্বপ্নবাদী লোকটা মুখটাকে ওপরের দিকে তুলল এবং আলো তার চোখের ওপর বয়ে উপচে পড়তে লাগল।

সাধু

আমার যৌবনে পাহাড়ের ওপর এক কুঞ্জবনে এক সাধুকে দেখেছিলাম; এবং যখন আমরা সদগুণের প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করছিলাম, তখন ক্লান্ত এক ডাকাত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এলো পাহাড়ের ঢালে। কুঞ্জবনে এসে সে হাঁটুগেড়ে বসল সাধুর সামনে, এবং বলল, ‘হে সাধুবাবা, আমি শান্তি পেতে চাই। আমার পাপের ভার যে আমার চাইতেও ভারি।’
এবং উত্তরে সাধু বললেন, ‘আমার পাপও যে আমার চেয়ে ভারী।’
এবং ডাকাত বলল, ‘কিন্তু আমি একজন চোর এবং লুটেরা।’
এবং উত্তরে সাধু বললেন, ‘আমিও যে একজন চোর এবং লুটেরা।’
এবং ডাকাত বলল, ‘কিন্তু আমি একজন খুনি এবং আমি বহু মানুষের রক্তের কান্না শুনতে পাই।’
এবং উত্তরে সাধু বললেন, ‘আমিও তো একজন খুনি এবং বহু মানুষের রক্তের কান্না শুনতে পাই আমি।’
এবং ডাকাত বলল, ‘আমি অগণিত অপরাধ করেছি।’
এবং উত্তরে সাধু বললেন, ‘আমিও অগণিত অপরাধ করেছি।’
তখন ডাকাতটি দাঁড়াল এবং একদৃষ্টিতে তাকাল সাধুর দিকে, এবং তার চোখে ছিল বিস্ময়কর এক দৃষ্টি। এবং সে আমাদেরকে ছেড়ে যাবার সময় লাফাতে লাফাতে নেমে যায় পাহাড়ের নিচে।
এবং আমি সাধুর দিকে ঘুরলাম এবং বললাম, ‘যেসব অপরাধ করেননি, কী কারণে নিজেকে সেইসব অপরাধে অভিযুক্ত করলেন? আপনি কি দেখেছেন আপনার কোনো কথাই বিশ্বাস করেনি লোকটি?’
এবং উত্তরে সাধু বললেন, ‘এটা সত্য যে সে আমার কোনো কথাই বিশ্বাস করেনি। তবে সে ফিরে গেছে অনেক আনন্দের সঙ্গে।’
ঠিক সেই মুহূর্তে দূর থেকে ডাকাতের কণ্ঠের একটা গান শুনতে পেলাম আমরা এবং সেই গানের প্রতিধ্বনি গোটা উপত্যকাকে ভরিয়ে তুলেছে আনন্দে।

বিত্তশালী

আমার বিস্ময়ের মাঝে একদা দেখতে পাই একটা দ্বীপের ওপর মানুষের মাথাওয়ালা, এবং লোহার খুর লাগানো এক কিম্ভূতাকার প্রাণী, যে অবিরাম খেয়ে যাচ্ছে পৃথিবীকে এবং পান করছে সমুদ্রকে। অনেকক্ষণ ধরে এটা আমি দেখি। পরে- তার কাছাকাছি যাই এবং বলি, ‘কখনো সম্পূর্ণ হবে না তোমার খাবার; কখনো মিটবে না তোমার ক্ষুধা এবং তৃষ্ণা।’ এবং সে উত্তরে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি পরিতৃপ্ত নই, খেতে খেতে এবং পান করতে করতে আমি ক্লান্ত; কিন্তু আমি ভীত যে, আগামীকাল আমার খাবার জন্য থাকবে না কোনো পৃথিবী আর পান করার মতো কোনো সমুদ্রও।’

অনুবাদ : চন্দন চৌধুরী