17-Mon-Dec-2018 07:40am

Position  1
notNot Done

দরজাটা খোলা- এক

zakir

2018-01-19 18:46:49

জাকির হোসেন : আজ ২৬ সেপ্টেম্বর। সর্বজনশ্রদ্ধেয় সাংবাদিক আতাউস সামাদের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। আতাউস সামাদ আমাদের প্রজন্মের সাংবাদিকদের প্রায় সকলেরই স্যার। অর্থাৎ শিক্ষক। ২০১২ সালের এই তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। সহসাই যেতে চাননি তিনি। আরো কিছু দিন বাঁচার ইচ্ছে ছিল তাঁর। কিন্তু চলে গেলেন। গেলেন বড়ই শান্তভাবে। যেমন শান্ত, নিরুপদ্রব, বিনয়ী মানুষ ছিলেন তিনি। ছিলেন উপরের ছবির মতোই স্বচ্ছ এবং দৃঢ়,- অচঞ্চল, স্থির ও নিরাসক্ত মুখ, বড় বড় চোখ, অপলক দৃষ্টি। এই দৃষ্টি সামনের দিকে অবারিত, বিশেষ কোনো কিছুর উপর নিবদ্ধ নয়। আতাউস সামাদ ছিলেন শিশুর মতো সরল এবং অতিশয় কোমল মনের মানুষ। এই কোমলতা এসেছে তাঁর সরলতা, অন্তরঙ্গতা এবং হৃদয়ের উষ্ণতা থেকে। যা এখনো তাঁর বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় স্বজন, পরিচিতজন, সহকর্মী এবং অগণিত শুভানুধ্যায়ীকে নিরন্তর স্পর্শ করে, টানে এবং একটি স্থায়ী সম্পর্কের ভেতর ধরে রাখে।  

ব্যক্তি জীবনে এই কোমলতার বিপরীতে পেশাগত জীবনে ঠিক সম্পূর্ণ উল্টো এক আতাউস সামাদকে আমরা দেখতে পাই। এ ক্ষেত্রে তিনি বড়ই কঠিন, তেজস্বী, আপোষহীন এবং স্পস্টভাষী। দীর্ঘ কর্ম জীবনে তিনি বহূবার বিপদ এবং সংকটে পড়েছেন। কারারুদ্ধ হয়েছেন, আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু কখনই মাথা নত করেননি, ভেঙ্গে পড়েননি। দু:সাহস ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। পেশাগত দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনে মৃত্যুর কাছাকাছি থাকার মধ্যেও তিনি এক ধরনের সুখ অনুভব করতেন।
জীবনের কোনো স্তরেই তিনি যশ, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি লাভের আকাঙ্খায় প্রভাবিত হননি। এসব কিছু উপেক্ষা করে সত্যের সন্ধানে ছুটেছেন অবিরাম. অবিরত। দুর্দমনীয় কৌতুহলে কেবলই সত্যকে দেখার, জানার এবং প্রকাশের আকুল ইচ্ছায় সীমাহীন পরিশ্রম করেছেন। ক্রোদ্ধ, অসহিষ্ণুতা সমস্ত কিছুকেই কঠিন সংযমে সংযত করেছেন। চিন্তার দৃপ্তি ও ক্ষেত্রকে প্রসারিত করেছেন ন্যায়নীতির অক্ষয় শিলালিপির উপর।

পেশাগত জীবনে তিনি কখনই ক্ষমতাসীনদের কাছে কোনো দায় অনুভব করেননি। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ হননি। প্রভাবিত হননি কোনো কোনো গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের দ্বারা। যথাযথভাবে অনুসন্ধান শেষে নি:সংশয় হয়ে তবেই তিনি মতামত প্রকাশ করেছেন। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার কাজটি যে গোষ্ঠী, সম্প্রদায় এবং রাজনীতির চেয়েও জরুরি এটা তিনি দেখিয়ে গেছেন জীবনব্যাপী সাধনার মাধ্যমে।

শাসক শ্রেণী, রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তি বিশেষের বিপরীতে তাঁর দায় ছিল গণমুখী, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং বৃদ্ধিবৃত্তিক চৈতন্যের নিকট। মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল সব সময়ই দৃঢ়। এ ব্যাপারে তিনি কখনই আপোষ করেননি। পরিচ্ছন মানবিক বোধ, অবিচ্ছিন্ন সততা, চিন্তার তীব্রতা এবং বিরামহীন সজাগ চৈতন্য,- এটাই ছিল তাঁর সম্বল। রাষ্ট্র, সমাজের প্রয়োজনে তিনি সব সময় তৎপর থেকেছেন। নির্যাতিত, নিপীড়িন, গরিব- দুখী শ্রমজীবী  মানুষের প্রতি তিনি কখনো উদাসীন ছিলেন না। তাদের জন্য লিখেছেন গভীর সহানুভূতির সঙ্গে। এ ক্ষেত্রে কোথাও কোনো ফাঁক বা ফাঁকি ছিল না। আবার ভাবালুও ছিলেন না। ছিলেন সংযমী। সাংবাদিক এবং ব্যক্তি আতাউস সামাদকে তাই আমরা দেখতে পাই একই সঙ্গে অনমনয়ী এবং সংবেদনশীল রূপে। যেমন সংবেদনশীল তেননি অনমনীয়। তিনি বেঁচে থাকবেন আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও গণমাধ্যমের ইতিহাসে, আমাদের অনেকের ব্যক্তিগত স্মৃতিতে। থাকবেন এই কারণে যে তিনি অন্যরকম মানুষ ছিলেন।

আতাউস সামাদের মৃত্যুর পর এরই মধ্যে কেটে গেছে পাঁচটি বছর। জীবদ্দশায় তিনি এই পাঁচ বছর সময়ের প্রথম দু’বছরে একটি কাজ সম্পন্ন এবং দুটি কাজ শুরুর পরিকল্পনা করেছিলেন। প্রথমত তিনি দেশব্যাপী প্রত্যন্ত অঞ্চল সফরের মধ্যেমে শ্রমিক-কৃষক তথা শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সংস্কৃতিক জীবন নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করতে চেয়েছিলেন। এরপর তিনি শুরু করতে চেয়েছিলেন একটি স্থায়ী আর্ট গ্যালারী প্রতিষ্ঠার কাজ। এ বিষয়ে তিনি দৈনিক কালের কন্ঠে ‘একটি ভালো স্থায়ী গ্যালারির জন্য আবেদন’ শিরোনামে একটি কলাম লিখেছিলেন এবং শিল্পকলা একাডেমির তৎকালীণ মহাপরিচালক বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক সংগঠক কামাল লোহানীর সঙ্গে আলোচনাও করেছিলেন।  প্রকাশিত কলামে তিনি বাংলাদেশের প্রভাবশালী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও জনপ্রিয় চিত্রশিল্পীরা এবং আমাদের সরকারকে ইংল্যান্ডের ন্যাশনাল গ্যালারির মতো একটি সংগ্রহ গড়ার উদ্যোগ নেয়ার আহ্বাণ জানিয়েছিলেন।

আর্ট গ্যালারি প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি নেয়ার পাশাপাশি তিনি আত্মজীবনী লেখার কাজটিও শুরু করতে চেয়েছিলেন। এ লক্ষ্যে তিনি তাঁর অনুগত শিষ্যদের একজন হিসেবে আমাকে তথ্য সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত করেছিলেন। তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী আমি কিছু তথ্য সংগ্রহও করেছিলাম। বিচিত্র অভিজ্ঞতায় পূর্ণ ছিল তাঁর জীবন। যুদ্ধ, সেন্সরশিপ, সামরিক শাসন ও অগণতান্ত্রিক জরুরি আইনের শাসনের মধ্য দিয়ে কেটেছে তাঁর রিপোর্টার জীবনের প্রায় সবটা সময়। ’৬২, ’৬৮, ’৬৯-এর আন্দোলন আর গণঅভ্যুত্থানে সবাই যখন গুলির শব্দে মাঠ ছেড়েছে, তখন আতাউস সামাদ জীবন বাজি রেখে সামনে এগিয়ে গেছেন। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে দেখেছেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসর রাজকার, আল-বদর, আল-সামস বাহিনীর নিষ্ঠুরতা, আর মুক্তিকামী নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের অসহায়ত্ব। যুদ্ধ শেষে দেখেছেন বিজয়, আর এর  পড়েই উপলব্ধি করেছেন যুদ্ধজয়ী মানুষের স্বপ্ন ভঙ্গের দু:খ। প্রত্যক্ষ করেছেন নৈরাজ্য, দু;শাসন, সামরিক অভ্যূত্থান, সামরিক শাসন, মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ও গণঅভ্যূত্থান। দেখেছেন দুর্ভিক্ষ, ঘূর্নিঝড় এবং বানভাসী মানুষের আর্ত চিৎকার। এসব স্মৃতি মধুর নয়, পিড়াদায়ক। ব্যক্তি জীবনে অবসাদ, ক্লান্তি, হতাশা, দু:খ, নি:সঙ্গতা এসব আসে। আতাউস সামাদের জীবনকেও এ গুলো স্পর্শ করেছে। কিন্তু নিজের সম্পর্কে খুব কথাই বলে গেছেন তিনি। ব্যক্তি জীবনের নানা দিক তিনি প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন আত্মজীবনীতে। একই সঙ্গে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির অন্তর্গত অনেক রহস্যজনক অধ্যায়। কিন্তুু হলো না। তিনি চলে গেলেন। অনেক রহস্য মানুষ মৃত্যুকে সঙ্গে নিয়ে চলে যায়। সেই সব রহস্যের কখনই কোনো কিনারা হয় না।    

বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় আতাউস সামাদের অবদান যে কোনো পরিমাপে অনেক বড়। তাঁর কর্মক্ষেত্রের পরিধি ও ঐশ্বর্য্যও ক্রমগত প্রসারিত হয়েছে। আমাদের যাপিত জীবনের নানারূপ তিনি আবিষ্কার করেছেন, সর্বত্র বিচরণ করেছে তাঁর দৃষ্টি। শাসন, শোষন, নির্যাতন, নিপীড়ন, বঞ্চনার পাশাপাশি আনন্দ, উচ্ছ্বাস, সাফল্য এবং অর্জনকে তিনি এক পংক্তিতে বসিয়েছেন।
সাংবাদিকতা পেশায় তাঁর খ্যাতি আকাশছোঁয়া। মজলুম জননেতা মওলানা হামিদ খান ভাসানী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্নেহধন্য ছিলেন। ২৫ মার্চ কালরাতে গ্রেফতারের আগমুহূর্তে সর্বশেষ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেছিলেন তিনি। আশি ও নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে বিবিসি বলতে মার্ক টালির নামের পাশে উচ্চারিত হতো তাঁর নাম। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় বিবিসি বাংলার খবর ছিল এক ধরনের লাইফ-লাইনের মতো, যেখানে প্রধান তথ্য সরবরাহকারী ছিলেন তিনি।
তথাপি সাংবাদিক আতাউস সামাদ মানুষ হিসেবেই অনেক বড়Ñ সাংবাদিক হিসেবে নয়। আতাউস সামাদের মৃত্যুতে আমরা একজন ভালো মানুষকে হারিয়েছি। ভালো সাংবাদিক তৈরি করা যায়, ভালো অভিনেতা তৈরি করা যায়, ভালো ডাক্তার তৈরি করা যায়। কিন্তু ভালো মানুষ তৈরি করা যায় না। তা যদি করা যেত তবে ভালো মানুষ তৈরির স্কুল নি:শ্চয়ই এতদিন প্রতিষ্ঠিত হতো।

মানবিক মূল্যবোধ: 
জীবনের প্রতীক মানুষের প্রতি ছিল তাঁর উদার নৈতিক ভালোবাসা। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর এ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ব্যক্ত হয়েছে প্রচলিত সমাজ কাঠামোয় যারা বঞ্চিত, দরিদ্র ও নিপীড়িত তাদের প্রতি। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে যারা প্রতিষ্ঠিত, যারা প্রভাবশালী তাদের প্রতি নয়। কেননা এই লুটেরা শ্রেণী প্রতিনিয়ত তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে দরিদ্র, বঞ্চিত, মেহনতি মানুষকে অশ্রদ্ধা ও অবজ্ঞা করে। এ কারণে আতাউস সামাদ জীবন বলতে এবং মানুষ বলতে মূলত অবহেলিত, নিষ্পেষিত ও শোষিতজনদের জীবনকেই বুঝতেন। এদেরকেই তিনি ভালোবাসতেন সবচেয়ে বেশি। আর এই ভালোবাসার মধ্যেই খুঁজে পেতেন অনাবিল আনন্দ।
আশাবাদী মানুষ ছিলেন আমাদের স্যার। তাঁর সঙ্গলাভে সহজেই যে কারো অভাব, অনটন, দারিদ্র ও ব্যর্থতার দু:খ আর ক্ষোভ তুচ্ছ হয়ে যেত। কেননা কিছু না বলেও তিনি যেন ক্রমাগত বলে যেতেন অভাব, অনটন, দারিদ্র, ব্যর্থতা ও সফলতার চেয়ে মানুষ অনেক বড়। মানুষের অবস্থান যাইহোক না কেন, মানুষ যে অবস্থায়ই জীবন যাপন করুক না কেন, মানুষ চিরদিনই মানুষ। তাই তিনি সারা জীবনই তাঁর আচার-আচরন ও লেখনীতে এই জীবন বোধেরই রূপায়ণ ঘটিয়েছেন। জীবন সম্পর্কে আতাউস সামাদের এই উপলব্ধিটি যে শুধুই মার্কসীয় ভাবাদর্শে আস্থা স্থাপনের ফল তা নয়, প্রথম যৌবনে মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, প্রখ্যাত সাংবাদিক ফয়েজ আহ্মদ প্রমুখের ঘনিষ্ঠ সহচর্যও এর অন্যতম কারণ। ফলে জীবনের শুরু থেকেই তিনি দারিদ্রের নেতিবাচক ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। অন্যদিকে বিত্তবানের বিলাসী জীবন সম্পর্কেও ছিল গুরুতর সমালোচনা। ভদ্রভাবে জীবন নির্বাহের উপযোগী সীমিত অর্থের মালিকানাই যাপিত জীবনে সুস্থতার সহায়ক,- এই ধারণা তিনি নানাভাবে ব্যক্ত করেছেন। জীবন সম্পর্কে তাঁর এই বোধটি এ দেশের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দুর্লভ বৈকি!  

পথ চলার শুরু:
স্যারের সঙ্গে আমার পরিচয় ২০০৪ সালের এপ্রিলে। তখন তিনি সাপ্তাহিক এখন-এর সম্পাদক ও প্রকাশক। আর আমি একটি সাপ্তাহিকে বিভাগীয় সম্পাদক পদে নিয়োজিত। পত্রিকাটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমার অফুরন্ত অবসর। সারাদিন পল্টন-সেগুন বাগিচায় বিভিন্ন বামপন্থী রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে আড্ডা দেই আর সন্ধ্যায় ছুটে যাই শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটে। এই আজিজ মার্কেট তখন ছিল রাজধানীর শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীদের আড্ডার অন্যতম স্থান। গুণীজনদের সান্নিধ্য আমার বেশ ভালো লাগতো। মার্কেটে একদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ দেখি আমার বন্ধ হয়ে যাওয়া পত্রিকার সহকর্মী আবুল কালাম আমাকে খুঁজছে। তাঁর সঙ্গে দেখা হতেই তিনি স্বস্তির হাসি হেসে বললেন, ‘স্যার, কয়েকদিন ধরে আপনাকে বিভিন্ন জায়গায় খুঁজছি। কোথাও না পেয়ে এখানে এলাম। আমি আতাউস সামাদের পত্রিকায় কাজ শুরু করেছি। উনাকে আপনার কথা বলেছি, আপনাকে দেখা করতে বলেছেন। নয়াপল্টনে উনার বাড়ির নিচ তলায় অফিস।’

কালাম ভাইয়ে কথা মতো কয়েকদিন পর বেলা ১১টার দিকে ওই বাড়িতে গেলাম। ‘ওয়েসিস’, ২২ নম্বর নয়াপল্টন, লাল রঙের দোতলা বাড়ি। বাড়ির সদর দরজায় কোনো দায়োরান নেই, নেই ডোবারম্যান, সেফার্ড কিংবা অ্যালসেশিয়ানের শতর্ক উপস্থিতি। দরজার কাছে গিয়ে দেখি দরজাটা খোলা। এ এক বিরল ঘটনা। বাড়ির ভেতরে বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে সবুজ ঘাসের উঠান। বাড়ির নিচ তলার পুরোটাই অফিস। একটি রুমে বসে কাজ করছেন পত্রিকার ম্যানেজার। আমার পরিচয় জানার পর দোতলায় যেতে বললেন। দোতালার সিড়ির মুখে রুমে বসে লেখলেখিতে ব্যাস্ত আতাউস সামাদ, পরনে লুঙ্গি, গায়ে সাদা গেঞ্জি। আমাকে দেখেই টেবিলের সামনের চেয়ারে বসতে বললেন এবং দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নানা রকম আলাপ আলোচনা করলেন। অর্থাৎ রাজনীতি বিষয়ে আমার ধারণা যাচাই করলেন। সেদিন ছিল ২০০৪ সালের ২৮ এপ্রিল। “আর মাত্র দু’ দিনের মধ্যেই তৎকালীণ বিএনপি সরকারের পতন হবে”- এমনটাই ঘোষণা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল। জলিল ভাইয়ের এই  ঘোষণায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা, সমালোচনা ও উত্তেজনা। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩০ এপ্রিল হাওয়া ভবন ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। স্যার আমাকে ‘এখন’-এ কাজ শুরু করতে বললেন এবং হাওয়া ভবন ঘেরাও কর্মসূচি`র উপর নজর রাখতে বললেন।এদিন থেকেই এখন-এর সহযোগী সম্পাদক হিসেবে শুরু হলো স্যারের সঙ্গে আমার পথ চলা। সেই থেকে তাঁর সঙ্গে ছিলাম জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত...।

প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট:
হাওয়া ভবন ঘেরাওকে কেন্দ্র করে শহর জুড়ে নেয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা। যেদিকে চোখ যায় শুধু পুলিশ আর পুলিশ। চার স্তরের নিরাপত্তার চাদরে ঘিরে রাখা হয়েছে ‘বনানী ও হাওয়া ভবন’। এরই মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে চলছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল। সকাল প্রায় ১০টায় হাওয়া ভবনের সামনে গিয়ে দেখি পাশের ফাঁকা জায়গায় ক্রিকেট খেলা চলছে। তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান টিম দু’টির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। রয়েছে ভুরি ভোজের আয়োজন। হাওয়া ভবনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়ে এ টিম দুটি গঠন করা হয়েছে। আম্পায়ের দায়িত্ব পালন করছেন হাওয়া ভবনের প্রভাবশালী কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম ছোটন। খেলায় তারেক রহমানের দল বিজয়ী হলো। এ বিজয়ে আরাফাত রহমান তাঁর বড় ভাই তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানালেন। তারেক রহমানও তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করলেন। এরপর সবাই বিরানী খেয়ে মাঠ ছাড়লেন। হাওয়া ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে স্যারকে ফোন করলাম। রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্ট এবং হাওয়া ভবন বিষয়ে বিস্তারিত জানালাম। স্যার একটু হাসলেন এবং আমাকে সাবধানে থাকতে বললেন। উল্লেখ্য, দিনের শেষে সরকারের পতন হয়নি এবং হাওয়া ভবনে লাগেনি আন্দোলনের হাওয়া। তবে ২০০৪ সালের ৩০ এপ্রিল আজও এদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

সেলফোন বিড়ম্বনা:
স্যারের সঙ্গে কাজ শুরুর কয়েকদিন পর আমার সেলফোনটি হারিয়ে গেলো। এটা জানার পর স্যার তাঁর সেলফোনটি আমাকে দিলেন। সিটিসেল কোম্পানির এই ফোনটির নম্বর ছিল ০১১৮১২৮৯৪। তখন সিটিসেল ছিল তৎকালীণ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোর্শেদ খানের নিয়ন্ত্রণে। তিনি সাপ্তাহিক এখন এবং  এজেন্সি ‘নিউজ গার্ডেন’-এর জন্য ১০টি সেট দিয়েছিলেন, তারই একটি এটি। সেলফোন ব্যবহারে স্যার খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না। সেটে নম্বরও সংরক্ষনের উপায় জানতেন না। কল করতেন নোটবুকের নম্বর দেখে। ফলে এই সেটটি স্যার কিছুদিন ব্যবহার করলেও এতে কোনো নম্বর সংরক্ষিত ছিল না। রাতে বাড়ি ফিরতেই সারে ১০টার দিকে কল এলো-
‘হ্যালো খোকন’।
না এটা খোকনের নম্বর না।
‘এটা কার নম্বর। আপনার নাম কি’
আমার নাম জাকির হোসেন, এটা আমার নম্বর, আগে আমার স্যার ব্যবহার করতেন, এখন আমি ব্যবহার করি। আপনার নাম কি?  কি করেন?
‘আমি সাইফুর রহমান, অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে আছি’।
শুনেই ঘাবরে গেলাম, স্যারের ডাক নাম যে খোকন তা  জানতাম না। তাঁর কাছ থেকেই শুনলাম। এরপর সাইফুর রহমানকে স্যারের বাড়ির ল্যান্ডফোনের নম্বর দিয়ে বললাম এই নম্বরে এখন স্যারকে পাবেন। পরে সাইফুর রহমানের সঙ্গে আমার একধরনের যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিলে। ‘কিছু কথা, কিছু স্মৃতি’ শিরোনামে তাঁর লেখা আত্মজীবনী আমাকে রিভিউ করতে দিয়েছিলেন। আমার রিভিউ পরে তিনি খুশি হয়েছিলেন এবং টেলিফোনে একটি নজরুল গীতি গেয়ে শুনিয়েছিলেন-

‘জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা,
মরণে কেন তারে দিতে এলে ফুল
মুখপানে যার কভু চাওনি ফিরে,
কেন তারি লাগি আঁখি অশ্রু সজল।

চিরদিন যারে তুমি দিয়েছো হেলা,
হৃদয় লয়ে শুধু খেলেছো খেলা
বিরহে তারি আজি বলো গো কেন,
শূন্য লাগে এই ধরণী বিপুল ॥’

সাইফুর রহমান এদেশের সবচেয়ে সফল অর্থমন্ত্রী। তথাপি সাহিত্য এবং সংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর জ্ঞানের গভীরতায় বিস্মিত হয়েছি। গানটিও তিনি ভালোই গেয়েছিলেন। পুরোটাই খুব দরদ দিয়ে গেয়েছিলেন। সুরে একটু হেরফের ছিল বটে। তবে তা মাহফুজুর রহমানের মতো এতোটা বেসুরো নয় মোটেই।
যাই হোক,  কিছুক্ষণ পর আরেকটি কল এলো-
‘হ্যালো খোকন’
এবার আমি বেশ সতর্ক। বললাম, স্যার এখন এই সেটটি ব্যবহার করেন না, আমাকে দিয়েছেন, আমি উনার সঙ্গে কাজ করি। আপানার পরিচয় জানতে পারি?
‘খোকন  আমার বন্ধু, আমার নাম শামসুল ইসলাম, আমি তথ্যমন্ত্রী।’
সাইফুর রহমানের ফোনকল সামাল দেবার পর এবার খুব একটা বিস্মিত হলাম না। তবু সারারাত একটা ঘোরের মধ্যে কাটালো, কখন যে কার কল আসে এ নিয়ে উদ্বেগ কাটছিল না। সকাল এগারোটা দিকে স্যার অফিসে এলে রাতের বিড়ম্বনার কথা জানালাম।  শুনে স্যার একটু হেসে বললেন, “দু’জনের সঙ্গেই কথা হয়েছে। বিশেষ কোনো কাজে ফোন করেননি। অনেক দিন পর আমার খোঁজ খবর নিলেন।  উনাদের সময় এখন ভালো যাচ্ছে না। তাই উনারা এখন আমার খোঁজ খবর নিতে শুরু করেছেন। উনাদের সময় যখন ভালো যায় তখন আমার খোঁজ-খবর উনারা খুব একটা নেন না। বরং আমিই তখন উনাদের খোঁজ-খবর নেয়ার চেষ্টা করি,- প্রায়শই নাগাল পাই না।’  


গভীর রাতে শহর দেখা:
২০০৪ সালের শেষ দিকে স্যার দৈনিক আমার দেশ-এর উপদেষ্টার সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন। ওই বছর আমিও এ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হই। আমি প্রথম দিকে লিখতাম উপসম্পাদকীয়। প্রায় একবছর পর রিপোর্টার হিসেবে নিয়োগ পাই। তখন দেশের রাজনীতি চলছে অস্থিরতা। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল তখন “তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার”-এর দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু করেছে। ১৪ দলের আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে প্রায়ই ডাকা হতো সকাল সন্ধ্যা হরতাল। এদিনগুলোতে সন্ধ্যার পর ঢাকা শহরের প্রায় সব রাস্তা জনশূন্য হয়ে যেত। এমন নিরিবিলি পরিবেশে স্যার বেড়াতে ও আড্ডা দিতে পছন্দ করতেন। রাত ৯টার দিকে অফিসের সিএনজি নিয়ে আমার দু’জন প্রায়ই মহাখালী, বনানী, গুলশান, বারিধারা’র বিভিন্ন রাস্তায় ঘুড়ে বেড়াতাম। পথ চলতে স্যার বাদাম খেতে পছন্দ করতেন। আর আমাকে কিনে দিতেন আইসক্রিম। মাঝে মধ্যে আমাদের সঙ্গে বেড়াতে যেতেন কবিতা আপা (আমার দেশ’র সিনিয়র রিপোর্টার)। কবিতা আপাকে স্যার ভীষন পছন্দ করতেন। এ কারণে যে, তিনি খুব ভালো রিপোর্টার এবং মানুষ হিসেবেও খুব ভদ্র ও বিনয়ী। রাত ১০টা-১১টা পর্যন্ত চলতো আমাদের আড্ডা, ঘোরাফেরা। এ সময় স্যার নিজের নানা অভিজ্ঞতা, ঢাকা শহরের রূপান্তর এবং রাজনীতির বিচিত্রসব কাহিনী বলতেন।

একদিন রাত প্রায় ১১টায় স্যার আলাপের এক পর্যায়ে আমাকে বললেন, ‘তোমার মুখ এতো শুকনো কেন? খিদে পেয়েছে নাকি?’ বলেই বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় ম্যাডামের দেয়া কলা, কমলা ও আপেল আমাকে দেবার জন্য ব্যাগের মধ্যে হাত দিলেন। ব্যাগের মধ্যে কিছু না পেয়ে খুব হতাশ হলেন। স্যারের মুখখানিও আমার মুখের মতোই শুকনো হয়ে গেলো। বললেন, ‘বাড়ি  থেকে তোমার ম্যাডাম কিছু ফল দিয়েছিল। আমি খাওয়ার সময় পাইনি। তোমাকে দিতে চাইলাম। এখন তো দেখছি ব্যাগে কিছুই নাই।’ জবাবে বললাম, আমার খিদে পেয়েছিল। আপনাকে না বলেই খেয়ে ফেলেছি।’ স্যার কিচ্ছুক্ষণ হাসলেন। স্যারের হাসি দেখে আমারও হাসি পেলে। আমরা দু’জনই কিছুক্ষণ হাসলাম। স্যার বললেন,‘ খেয়েদেয়ে পেট ভারী করে মুখ শুকনো করে আছো কেন।’
বললাম, খেয়েছিতো সেই সন্ধ্যা ৬টায়। আপনি তখন অফিসে লেখার কাজে ব্যাস্ত ছিলেন। তাই আপনাকে বিরক্ত করিনি। নিজ দায়িত্বে খেয়ে ফেলেছি। এখন রাত প্রায় ১১টা, এতক্ষণ কি আর এগুলো পেটে থাকে! শুনে স্যার আবার হাসতে শুরু করলেন। শিশুর সরলতা মিশ্রিত প্রাণ খোলা সেই হাসি। হাসি কখনো হারিয়ে যেত না তাঁর মুখ থেকে...।    
 
মোটরবাইকে একদিন
সেদিন ছিল শনিবার, ২০১২ সালের ২ সেপ্টেম্বর। শনিবার বেলা ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত সাপ্তাহিক মিটিং হতো। সেদিন মিটিং শেষে সবে লিখতে বসেছি, স্যার এসে জানতে চাইলেন আমার হাতে কোনো কাজ আছে কিনা, থাকলে আমি যেন একটু তাড়াতারি শেষ করি। এদিন বিশেষ কোনো কাজ ছিল না। সন্ধ্যা ৬টার আগেই লেখা শেষ করে স্যারের রুমে গেলাম। স্যার বললেন, আজ তিনি আমার মোটরবাইকে বাড়ি ফিরবেন। আমি বিস্মিত হলাম না। স্যার প্রায়ই ছুটির দিনে আমাকে মোটর বাইকে শহরের বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যেতে বলতেন। দুর্ঘটনার ভয়ে আমি রাজী হতাম না। মোটর বাইকে সমস্যা, শরীরটা ভালো নেই- ইত্যাদি নানা অজুহাতে স্যারের এই প্রস্তাব এড়িয়ে যেতাম। স্যারকে নিয়ে মোটর বাইক চালানো আমার জন্য বিব্রতকর ছিল বৈকি। কিন্তু সেদিন আর কোনো অজুহাত খোজার উপায় নেই, চেষ্টাও করলাম না। আমার দেশ অফিসের নিচে ইটিভি’র গলিতে রাখতাম মোটর বাইক। সেখান থেকে আমরা দু’জন রওনা দিলাম বারিধারার দিকে। সরকারি ছুটির দিন, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, রাস্তায় তেমন যানজট নেই। কারওয়ান বাজার পার হয়ে এফডিসি’র গেটে পৌঁছেতেই শুরু হলো স্যারের আলাপ। “অনেক দিন পর মুক্ত আকাশ দেখছি। সন্ধ্যার মায়াবী আলোটাও খুব ভালো লাগছে। গাড়ির মধ্যে আবদ্ধ অবস্থায় চলাচল করতে ভালো লাগে না, জেলখানার মতো মনে হয়। দীর্ঘ যানজটে দম বন্ধ হয়ে আসে। অনেক দিন পর মুক্তভাবে আজ চেনা রাস্তাগুলো দেখছি। শহরের সবকিছু কেমন দ্রুত পাল্টে গেছে, শহর জুড়ে শুধু উচু উচু দালান। নিজের শহরকে আজ বড় অচেনা মনে হচ্ছে। শহর মানেই বড় বড় দালান আর অগনিত অচেনা মানুষ। যন্ত্রের মতো সবাই ছুটেই বেড়ায় যে যার কাজে। ট্রাফিক সিগন্যালে আটকে পড়া  গাড়িগুলোর শব্দকে  ফাঁদে পরা জন্তুর গোঙানির মতো মনে হয়।”
হাতির ঝিলের কাছাকাছি পৌঁছাতেই স্যার প্রসঙ্গ পাল্টালেন। প্রজেক্টের তখন কাজ চলছে, তবে ভিতর দিয়ে যাতায়াত করা যায়। “এই প্রজেক্টে যদি পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা না করলে  দুর্গন্ধে এখানে কেউ টিকতে পারবে না।” প্রজেক্টের দায়িত্বে নিয়োজিত কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললেন এবং এ নিয়ে এনিয়ে আমাকে রিপোর্ট করতে বললেন। আমি নিয়ে রিপোর্ট করলাম। রিপোর্টটি ৩-এর পাতায় ছাপা হওয়ায় একটু মনক্ষুণ হয়েছিলেন।
যাইহোক, হাতিরঝিল পার হয়ে রাইলেফ ক্লাবের কাছে পৌঁছতেই শুরু শুরু হলো অন্য আলোচনা। “গুলশান, বনানী, বারিধারার রাস্তার দু’পাশে পরিকল্পনাহীনভাবে গড়ে উঠছে বিদেশী খাবারের রেস্তোরা। এসব রেস্তোরায় ভোক্তাদের অধিকাংশই এদেশের নাগরিক। একশ্রেণীর মানুষের অনেক টাকা হয়েছে। এদের পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন  রেস্তোরায় খাওয়া এবং  ঘুরে বেড়ানো  ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। দেশের মানুষ যে কতো গরিব এ বিষয়ে এদের কোনো ধারণ  নেই। এদের কথা বলেই বা কি হবে, যারা দেশের মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নের কথা বলে।  ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্রমুক্ত দেশ গড়তে চায়, সেই সব রাজনীতিকদেরও এদেশের মানুষের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। দেশের উন্নয়ন চাইলে দেশটাকে বুঝতে হয়, দেশের মানুষকে বুঝতে হয়। যারা দেশটাকেই এখনো বুঝতে পারলো না, দেশের মানুষকে বুঝতে পারলো না, তাদের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নের কথা ভাবা অবান্তর। ”
এরপর শুরু করলেন বুয়েটের ভিসি’র পদত্যাগের দাবি নিয়ে ছাত্রদের চলমান আন্দোলন নিয়ে আলোচনা। “সমাজে মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় হয়েছে। আমরা এসব বিষয় কখনো চিন্তা করিনি।”  পথ চলতে আরো কত রকম কথা যে স্যার বললেন এর সবটা মনে নেই। বাড়ির সামনে  পৌঁছানোর পর আমার মোটর বাইকের পেছনে স্যারকে দেখে দারোয়ানসহ অনেকেই একটু বিষ্মিত হলেন। তবে স্যারকে বেশ প্রাণবন্ত মনে হলো। এটাই ছিল স্যারের শেষ অফিস। এরপর তিনি আর অফিসে যাননি। তিনি চলে যান অন্য জগতের অভিযাত্রী হয়ে...।  

নদী ভাঙন ও বটগাছ:
২০০৪ দেশে বড় বন্যা হয়। রাজধানীর চারপাশ প্লাবিত হয়। নদীভাঙনে বিলীন হয় বহু জনপদ। গৃহহারা হয় শত শত মানুষ। বানভাসী বহু মানুষ আশ্রয় নেন স্থানীয় স্কুল কলেজে। এ বিষয়ে স্যারের প্রতিক্রিয়া জানতে প্রায় প্রতিদিনই ‘এখন’ অফিসে ধর্না দিনে শুরু করেন একাধিক বিদেশী গণমাধ্যম সাংবাদিক। বন্যার প্রকৃত অবস্থা জানতে স্যার আমাকে সাভার, নরসিংদী এবং লৌহজং-এ যেতে বলেন। আমি  ঘুরে এসে বিস্তারিত জানাই। এ প্রেক্ষিতে স্যার কয়েকটি বিদেশী গণমাধ্যমে বন্যা পরিস্থিতি এবং করণীয় বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দেন।  এক পর্যায়ে স্যার আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন লৌহজং-এর নদীয় ভাঙন বিষয়ে। সেবার পদ্মা দাববের মতো গর্জে ওঠে। লৌহজং-এর বিস্তীর্ণ এলাকা পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। ভাঙনের মুখে পড়ে উপজেলার বেশ কয়েকটি কার্যালয়। লৌহজং বাজারের একটি অংশও ভেঙে যায়। এই বাজারে প্রকা- একটি বটগাছ ছিল, শুনলাম স্যারের মুখে। একই সঙ্গে তিনি জানতে চাইলেন বটগাছটি আছে কিনা। আমি জানালাম- বাজারের আমি কোনো বটগাছ দেখি নাই। স্যার আবার আমাকে বটগাছের খোঁজ নিতে পাঠালেন। আমি তৎক্ষনাৎ রওনা দিলাম লৌহজং-এর উদ্দেশে। স্থানীয়রা জানালেন, লৌহজং বাজার বেশ কয়েকবার ভাঙনের শিকার হয়েছে। যে বাজারের প্রকা- বটগাছ ছিল তা প্রায় ২৫ বছর আগে পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়েছে গেছে। ফিরে এসে স্যার কে জানালাম। তিনি বললেন, ‘তাই হবে, আমি ১৯৭৩ সালে দেখেছিলাম গাছটি। এরপর আর দেখি নাই।’    

টেলিফোনে কলাম লেখা:
সাপ্তাহিক এখন-এ কাজের পাশাপাশি আমি স্যারের বিশেষ সহযোগী হিসেবেও কাজ করতাম। এজন্য স্যার আমাকে সম্মানী দিতেন। নিতে না চাইলেও দিতেন। শেষদিকে স্যার কালের কণ্ঠ, যুগান্তর, সমকাল এবং আমার দেশ-এ নিয়মিত কলাম লিখতেন। এ জন্য আমাকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে হতো। লেখার সময় মাঝে মাঝে স্যার ক্লান্তিবোধ করতেন। তখন রিডিংরুমের বিছানায় শুয়ে স্যার বলতেন আর আমি টেবিলে বসে লিখতাম। আমার দেশ’র জন্য লেখাটি বাড়ি থেকে নিয়ে যেতেন আমাদের রাজাভাই।  আমরা যখন লেখার কাজে ব্যস্ত থাকতাম তখন ম্যাডাম কিছুক্ষণ পর পর আমাদের জন্য চা-নাস্তা নিয়ে আসতেন এবং আমাদের খোঁজ খবর নিতেন। আমাদের কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞাসা করতেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলতো আমাদের লেখালেখির কাজ।
সেদিন ১ আগস্ট। সিডিউল অনুযায়ি আমার কোনো কাজ নেই। সাত-সকালে গেলাম রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আড্ডা দিতে। বেলা এগারোটার দিকে স্যারের ফোন এলো। ফোনটি করেছেন বাসা থেকে। বললেন, তোমার কোনো কাজ না থাকলে একটু আফিসে যাও, জরুরি কথা আছে। দুপুর ১২টার দিকে অফিসে পৌঁছে স্যারকে ফোন দিলাম। বললেন, “আগামীকাল অবজারভার সম্পাদক আবদুস সালাম সাহেবের জন্মদিন। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। ভ্যাগিস মনে পড়েছে। তুমি কাগজ কলম নাও, আমরা টেলিফোনেই একটি লেখা লিখে ফেলি।” স্যার বলতে শুরু করলেন, আমি লিখতে শুরু করলাম। বিকেল চারটাই সেই লেখা শেষ হলো। সেদিন স্যার জ্বরে ভুগছিলেন। তব্ওু গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনে বিন্দুমাত্র অনীহা প্রকাশ করেনি। লেখা শেষ হওয়ার পর শুরু হলো কম্পোজ এবং প্রুফের তাড়া। কিছুক্ষণ পর পর স্যার ফোন করেন এবং কয়েক লাইন যোগ করেন।  সেদিনের কথা হয়তো আমি কোনো দিন ভুলবো না। আরো একটি দিনের কথা প্রায়ই মনে পড়ে, ২০১২ সালে ১৩ এপ্রিল। পরে দিন ১৪ এপ্রিল অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ- শুভ নববর্ষ। দৈনিক আমার দেশ’র জন্য পয়লা বৈশাখ নিয়ে প্রথম পৃষ্ঠার জন্য লেখা দিয়েছেন স্বনামধন্য সঙ্গীত শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন। প্রথম পৃষ্ঠার জন্য আরো অন্তত একটি লেখা প্রয়োজন। সন্ধ্যায় অফিসে ঢুকতেই লেখা সংগ্রহের দায়িত্ব পড়লো আমার উপর। কোনো উপায়ন্তর না দেখে স্যারকে ফোন করলাম। প্রথমে স্যার একটু অস্বস্তিবোধ করলেন। তবে পিড়াপিড়িতে রাজী হলেন। রাত ৮টায় খেলা শুরু হলো, দশটার মধ্যেই শেষ হয়ে হলো। ‘বৈশাখের আবাহনে মাটি এবং ঘাসের গন্ধ পাই’- শিরোনামের এ লেখাটি পয়লা বৈশাখে আমার দেশ পত্রিকার প্রথম পাতায় ছাপা হলো। সমান্তরালে ছাপা হলো সাবিনা ইয়াসমিনের লেখা। দুজনের ছবিও ছাপা হলো পাশাপাশি। কোনো একটি লেখা শেষ হওয়ার পর থেকেই এ বিষয়ে পাঠকের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য স্যার উন্মুখ হয়ে থাকতেন। পরদিন সকালে স্যারের ফোন পেলাম। জানতে চাইলেন লেখা কেমন হয়েছে। আমি একটু রসিকতা করে বললাম, ‘সবাই বলছে লেখাটা খুব ভালো হয়েছে। আপনার পাশে সাবিনা ইয়াসমিনকে বেশ মানিয়েছে। দু’জনকে খুব সুন্দর লাগছে। আপনাদের দু’জনের চেহারায় যেমন মিল, তেমনি নামেও- সামাদ আর সাবিনা।’ কথাটা শুনে স্যার এমন একটা হাসি দিলেন যেনবা গোটা পৃথিবীটাকে তিনি জয় করে ফেলেছেন। খুবই স্বচ্ছ, সরল, সহজিয়া অনুভবের মানুষ ছিলেন স্যার। ‘মানুষের মানচিত্র এবং মানচিত্রের মানুষ’- স্যারের ক্ষেত্রে এ দুয়ের মধ্যে কোনো বিভেদ ছিল না,- ছিল না কোনো বৈরিতা, ছিল না কোনো দ্বন্দ্ব। এই দুই স্বত্বাকে তিনি একাকার করেছিলেন তাঁর যাপিত জীবনে...

লেখক: সাংবাদিক