17-Mon-Dec-2018 07:43am

Position  1
notNot Done

শোষিত মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু নাজমা জেসমিন চৌধুরী

zakir

2018-01-19 18:50:01

জাকির হোসেন: যা হবার নয়, ঘটার নয়, অনেক সময় যেন তাই ঘটে। নাজমা জেসমিন চৌধুরীর অকাল প্রয়াণ তেমনি একটি নিষ্ঠুর মর্মান্তিক ঘটনা। অকাল প্রয়াত ড. নাজমা জেসমিন চৌধুরী পরিচয় একাধিক। তিনি একজন বিশিষ্ট নাট্যকার, ঔপন্যাস্যিক, গল্পকার এবং শিক্ষিকা । জন্ম ১ ডিসেম্বর ১৯৪০ কলকাতায়। আর ১৯৮৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তাঁর বয়স হয়েছিল ৪৯ বছর। তিনি দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। ঘাতক ব্যাধির কবল থেকে তাঁকে বাঁচানো যায়নি। তিনি তাঁর স্বামী বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও দুইকন্যা রওনাক ও শারমিন এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।  
ড. নাজমা জেসমিন চৌধুরী ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ পাস করার পর ঢাকা সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। ১৯৬২ সালের ডিসেম্বরে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ১৯৬৫ সালের অক্টোবরে কমনওয়েলথ স্কলারশীপ নিয়ে ইংরেজী সাহিত্যে গবেষণার জন্য বিলাতে গেলে অধ্যাপিকা নাজমা জেসমিন চৌধুরী তাঁর সাথে যান। তিন বছর অবস্থানের পর দেশে ফিরে পুনরায় নাজমা জেসমিন চৌধুরী সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজেই অধ্যাপনা শুরু করেন।
১৯৭৫ সালে তিনি বাংলা একাডেমীর গবেষণা বৃত্তি নিয়ে বাংলা উপন্যাসে রাজনীতির প্রভাব বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন। নির্যাতিত, নিপীড়িত, নি:স্ব ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর সার্বিক মুক্তিভিত্তিক রাজনীতির প্রতি সুদৃঢ় আস্থাশীল নাজমা জেসমিন তাঁর রাজনীতি সচেতনতাকে পিএইচডি সন্দর্ভ রচনার বিষয় হিসেবে বিবেচনায় নেন। সে জন্যই গবেষণার বিষয় হিসেবে বেছে নেন ‘বাংলা উপন্যাস ও রাজনীতি’। ১৯৭৯ সালে তিনি এ বিষয়ে পিএইচডি লাভ করেন। তাঁর এই গবেষণা সন্দর্ভটি বাংলা একাডেমি পুস্তকাকারে প্রথম প্রকাশ করলেও পরে ১৯৮৭ সালে কলকাতার ‘চিরায়ত প্রকাশন প্রাইভেট লিমিটেড’ থেকে প্রকাশিত হয়। এ সংস্করনে বঙ্কিম এবং রবীন্দ্রনাথের আলোচনায় সংযোজন আছে। এছাড়াও বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ী, বুদ্ধদেব বসু, মনোজবসু, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ও গোপাল হালদারের উপন্যাসকে কেন্দ্র করে একটি নতুন অধ্যায়ও সংযোজিত হয়েছে। এই পুস্তকে তিনি গত দুই শতাব্দী ধরে সমাজের এক ক্রমবিকাশ প্রক্রিয়ায় চালিকা শক্তি হিসেবে রাজনীতি কিভাবে কাজ করেছে বাংলা উপন্যাসের ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে তা সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে তিনি বাংলা উপন্যাসের একটি সুষ্ঠু ও সৃজনশীল রাজনৈতিক জরিপ করেছেন। অন্তত প্রধান ঔপন্যাসিকদের উপন্যাসগুলোকে রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একে একটি সার্থক প্রায়স বলা যেতে পারে। এটা অবশ্যই একটি ব্যাপক ও কষ্টসাধ্য গবেষনা। এই গবেষনার জন্য নামজা জেসমিন চৌধুরীকে প্রতিটি ঔপন্যাসিকের সমসাময়িক রাজনৈতিক অবস্থা এবং তার প্রেক্ষিতে তাদের উপর ঐ অবস্থার ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। একাজ যে কত কঠিন তা সহজেই অনুমেয়।

শুধু এই গবেষণার ক্ষেত্রে নয়- নাজমা জেসমিন চৌধুরী তাঁর প্রতিটি উপন্যাস, নাটক, গল্প বা অন্য কোনো রচনার ক্ষেত্রেও নিজের রাজনৈতিক আদর্শ তথা অঙ্গীকারের কথা ভোলেননি এবং আপোসও করেননি। তার রাজনৈতিক আদর্শগত অঙ্গীকার কত দৃঢ় ছিল সে স্বাক্ষরও আছে ছোটদের জন্য লেখা তার নাটকে। তিনি নাটক লিখেছেন এবং নাট্য সংগঠন গড়ে তুলেছেন।  টেলিভিশনে নারী প্রগতি ও গণমানুষের পক্ষে রাজনীতি সচেতন নাটক লিখে তিনি এক ভিন্নধারার সূচনা করেন। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশন আয়োজিত নাট্য প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ছিলেন শিশু-কিশোরদের নাট্যসংগঠন ঢাকা লিটল থিয়েটারের মূল সংগঠক ও প্রধান লেখক । আমৃত্যু তিনি শিশুকিশোর সংগঠন কচি কাঁচার নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। এছাড়াও তিনি অনেক শিশু কিশোর সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। কিন্তু তার প্রধান পরিচয় কথাশিল্পী হিসেবেই। সে-পরিচয় পাওয়া যায় তার রচনাসমূহের মাধ্যমে। দেখা যায় কেমন সতর্ক দৃষ্টিতে তিনি পরিচিত জগতটিকে দেখেছেন এবং সেই স্বপ্ন কল্পনা, কৌতুকবোধে ও বৈদগ্ধের সাহায্যে সেই জগতকে নতুন করে তুলেছেন। তাঁর সব চরিত্রই আমাদের পরিচিত, কিন্তু কোনো চরিত্রই পুরাতন নয়, সকলেই মৌলিক। তিনি কাহিনী বলেছেন প্রাণবন্ত বর্ণনায়, এবং সেখানে নাটকীয়তা রয়েছে পর্যায়ে পর্যায়ে। তাঁর উপন্যাস ও গল্পগুলো পড়বার পর ইচ্ছা করলেই যে ভুলে যাওয়া যাবে তেমন নয়। নাজমা জেসমিন চৌধুরীর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় দৈনিক সংবাদে, অষ্টম শ্রেনীর ছাত্রী থাকাকালে। জীবনের স্বল্প পরিসরে তিনি ৬টি উপন্যাস, ২২টি গল্প, ৯টি নাটকসহ লিখেছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রবন্ধ। তাঁর লেখা উপন্যাস সমূহের মধ্যে রায়েছে ‘সমানে সময়’, ‘ঘরের ছায়া’, শেষ ঠিকানা (কিশোর উপন্যাস), লোকে বলে, আমার খোকা যায়, ভোর হয় রাত হয়। গল্পগ্রন্থ সমূহের মধ্যে রয়েছে অন্য নায়ক এবং মেঘ কেটে গেল। এতে রয়েছে পরের ঘর, মাইনুদ্দির শহীদ দিবস, জয়নাবের সন্তান বাপের বাড়ি, একদিন এক রাত, খেলা, কাউকে বলা যাবে না, আর একবার, চিড়িয়াখানায় কয়েকজন মানুষ, একশ্রেনীর লোক, অনুভব, নতুন, রঞ্জনা, শেষ উৎসব, অন্য এক জীবন, যেখানে ঘৃণা, একা একা, ছেলেটার দিনকাল, পেছনের ছায়া, প্রচ্ছন্ন অনল, ইন্টারভিউ ইত্যাদি শিরোনামের গল্প। টেলিভিশনে সম্প্রারিত নাটক গুলো হলো- খেলা, ছাড়পত্র, পালাবদলের পালা, প্রথম অঙ্গীকার, প্রতিদ্বন্দ্বী, প্রিয়জন এবং ঘরের ছায়া। রেডিওতে সম্প্রারিত হয় তার দুটি নাটক। এগুলো হলে, ষেশ পরিচয় এবং হিংসুটে দৈত্য।
লেখক: সাংবাদিক