19-Wed-Dec-2018 08:52pm

Position  1
notNot Done

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার-২০১৪

zakir

2018-01-27 11:08:02

পটভূমি

আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ। শুরু হয়েছে দারিদ্র্য ও পশ্চাৎপদতা হতে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের ঐতিহাসিক কালপর্ব। পূর্ণ হয়েছে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪২ বছর। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুমহান নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে ত্রিশ লড়্গ শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় বিশ্ব ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। স্বাধীনতা বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেবল এই অর্জনের রূপকারই নয়; ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অদ্যাবধি বাঙালি জাতির যা কিছু মহৎ অর্জন- বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়, ভাষা, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিরও রূপকার। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বেই সূচিত হয়েছিল উন্নত-সমৃদ্ধ ‘সোনার বাংলা’ নির্মাণের মহৎ কর্মযজ্ঞ। যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ।


কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ভেতর দিয়ে আবার মুখ থুবড়ে পড়ে বাংলাদেশ। ৩ নভেম্বর কারাগারে আটক চার জাতীয় নেতাকেও একই খুনি চক্র হত্যা করে। খুনি মোশতাক ও জিয়া চক্র স্বাধীন বাংলাদেশে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে সামরিক শাসন ও স্বৈরতন্ত্রের ধারা। সামরিক ফরমানের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা হয়; নিষিদ্ধ ঘোষিত দলগুলোকে রাজনীতি করার সুযোগ দিয়ে পুনর্বাসিত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অঙ্গীকার হয় নির্বাসিত। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার প্রত্যড়্গ বিরোধিতাকারী, যুদ্ধাপরাধী এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত জামাতে ইসলামী প্রভৃতি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতাদের কেবল পুনর্বাসিতই করা হয়নি, সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীকালে তার উত্তরসূরি খালেদা জিয়া তাদের রাষ্ট্রড়্গমতার অংশীদার করে। অবৈধ সামরিক শাসকরা সংবিধান কর্তন, জনগণের ভোটাধিকার হরণ এবং নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সামরিক ছাউনিতে গড়ে তোলা হয় একাধিক রাজনৈতিক দল। হত্যা-ক্যু-পাল্টা ক্যু হয়ে দাঁড়ায় নিত্যদিনের ঘটনা। ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থে সশস্ত্র বাহিনীকে ব্যবহার, মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও জওয়ানদের হত্যা এবং চাকরিচ্যুত করার মাধ্যমে দুর্বল করা হয় মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী গৌরবোজ্জ্বল সেনাবাহিনীকে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মের অপব্যবহার, কালো টাকা, পেশীশক্তি, দুর্নীতি, লুটপাট এবং দুর্বৃত্তায়নকে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিতে পরিণত করা হয়। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেও ড়্গমতাসীন বিএনপি স্বৈরশাসনের এ ধারাই অব্যাহত রাখে। এভাবেই পঁচাত্তর-পরবর্তী সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের অর্জন এবং একটি সুখী সুন্দর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার সকল সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দেয়।


বাংলাদেশের স্বর্ণযুগ (১৯৯৬-২০০১)

এই দুঃসহ অবস্থার অবসান ঘটে ১৯৯৬ সালে। দেশবাসীর বীরত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং অগণিত শহীদের আত্মদানের পটভূমিতে ১২ জুন অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। দীর্ঘ ২১ বছর পর আবার আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের গৌরবোজ্জ্বল সাফল্যগাঁথা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। মাত্র পাঁচ বছরে খাদ্যে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন, দ্রব্যমূল্য হ্রাস, মূল্যস্ফীতির হার ১.৫৯ শতাংশে নামিয়ে আনা, প্রবৃদ্ধির হার ৬.২ শতাংশে উন্নীতকরণ, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম শানিত্মচুক্তি, দারিদ্র্য বিমোচনে নানা উদ্ভাবনী কর্মসূচি গ্রহণ ও হত-দরিদ্র মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গ্রহণ, মানব দারিদ্র্য সূচক দ্বিগুণ হারে কমিয়ে আনা, সাড়্গরতার হার ৬৫ শতাংশে উন্নীতকরণ এবং ২১ ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা লাভ প্রভৃতি অর্জন বাংলাদেশকে বিশ্বে অমিত সম্ভাবনার দেশ হিসেবে পরিচিত করে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ, বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের ড়্গেত্রে অর্জিত হয় অভূতপূর্ব সাফল্য। মাত্র পাঁচ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩০০ মেগাওয়াট। যমুনা নদীতে বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণ, ৬২ হাজার কিলোমিটার রাস্তা, ১৯ হাজার সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ নির্ভরযোগ্য ভৌত কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করে। ওই সময়ে দেশে ছোট-বড় ১ লাখ ২২ হাজার শিল্প-কারখানা স্থাপিত হয়। সরকারি ও বেসরকারি খাতে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়। মনোপলি ভেঙে স্বল্পমূল্যে সবার হাতে মোবাইল, কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তিকে সকলের জন্য অবারিত করে দেওয়া হয়। সকলের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রতি ৬ হাজার মানুষের জন্য গ্রহণ করা হয় কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি।


আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কুখ্যাত ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স বাতিল, বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচার, জেলহত্যার বিচার প্রক্রিয়া শুরু এবং আইন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। সুশাসন প্রতিষ্ঠা, নারীনীতি প্রণয়ন ও নারীর ড়্গমতায়ন, সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর প্রথা চালু, স্থায়ী কমিটিতে মন্ত্রীর বদলে সদস্যদের চেয়ারম্যান নিয়োগ, চার স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার জন্য আইন প্রণয়ন এবং সরকারের সর্বস্তরে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা হয়। সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতিসহ সর্বক্ষেত্রে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধের ধারা। ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ।


সম্ভাবনার অপমৃত্যু : বিএনপি-জামাত দুর্বৃত্তকবলিত বাংলাদেশ

পক্ষপাতদুষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মদতে কারচুপি ও কারসাজির ফলে ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিশ্চিত বিজয় ছিনতাই হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-জামাত জোট প্রায় সমানসংখ্যক (৪০ শতাংশ) ভোট পেলেও বিএনপি-জামাত জোটের জন্য দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিশ্চিত করা হয়। প্রশ্নবিদ্ধ হয় নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের ধারণা।

রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বিএনপি-জামাত জোট তাদের পাঁচ বছরের দুঃশাসনে বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করে। হত্যা, সন্ত্রাস, রক্তপাত, জঙ্গিবাদী উত্থানের ফলে বাংলাদেশ পরিণত হয় মৃত্যু উপত্যকায়। স্বয়ং খালেদা জিয়া এবং তার পুত্র তারেক রহমানের তত্ত্বাবধানে ও নির্দেশে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট জননেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড হামলা করে হত্যার চেষ্টা চালাতে গিয়ে নারী নেত্রী বেগম আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগের ২২ নেতাকে হত্যা করা হয়। হত্যা করা হয় সংসদ সদস্য ও সাবেক অর্থমন্ত্রী এ এস এম কিবরিয়া, সংসদ সদস্য ও শ্রমিক নেতা আহসানউল্লাহ মাস্টার, অ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল ইমাম ও সাবেক সংসদ সদস্য মমতাজউদ্দিনসহ আওয়ামী লীগের ২১ হাজার নেতা-কর্মীকে। হত্যা করা হয় হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী বিশিষ্টজনসহ বহুসংখ্যক মানুষকে। সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার হয় ধর্মীয় সংখ্যালঘু লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে শত শত নারী এবং শিশু-কিশোরী হয় গণধর্ষণ ও ধর্ষণের শিকার। সাংবাদিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, কৃষক, শ্রমিক কেউই বিএনপি-জামাত জোটের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ফ্যাসিস্ট হামলার হাত থেকে রেহাই পায় নি। মন্ত্রিসভায় স্থান পায় চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীরা।

সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় উগ্র জঙ্গিবাদের সশস্ত্র উত্থান ঘটে। ১৭ আগস্ট, ২০০৫ তারিখে দেশের ৬৩টি জেলায় একই সময়ে পাঁচ শতাধিক স্থানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়, বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলের বিভিন্ন সময়ে আদালত, সিনেমা হল, মেলা, দরগা, মসজিদ, গীর্জা, মন্দির, অফিস, সভা-সমাবেশ প্রভৃতি স্থানে জঙ্গিবাদীদের বোমা হামলায় বিচারক, আইনজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীসহ অসংখ্য মানুষ নিহত হয়। আহত হয় ও চিরদিনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করে হাজার হাজার মানুষ। বাংলাদেশ পরিণত হয় জঙ্গিবাদীদের অভয়ারণ্যে। সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের কালো তালিকাভুক্ত হয় বাংলাদেশ।


অন্যদিকে দেশ পরিচালনায় বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সামগ্রিক ব্যর্থতা, অদড়্গতা, দুর্নীতি, দলীয়করণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাকেই উল্টে দেয়। নস্যাৎ করে দেয় সব সম্ভাবনা। তারেক রহমানের উদ্যোগে গড়ে তোলা হয় রাষ্ট্রক্ষমতার সমান্তরাল বা বিকল্প কেন্দ্র ‘হাওয়া ভবন’। এই হাওয়া ভবন থেকেই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা নেয়া হয়। ‘হাওয়া ভবন’ হয়ে উঠেছিল সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি ও কমিশন সংগ্রহ, প্রশাসনের নিয়োগ-বদলি, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা প্রভৃতি দেশবিরোধী অবৈধ কর্মকান্ডে অঘোষিত হেড কোয়ার্টার।

বিএনপি-জামাত জোট সরকারের মন্ত্রী, এমপি এবং দলীয়/অঙ্গ/সহযোগী সংগঠনের দুর্নীতি, দৌরাত্ম্য দেশবাসীর জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। জোট সরকারের পাঁচ বছরের শাসনামলের পাঁচ বছরই টিআইবির রেটিংয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে কুখ্যাতি অর্জন করে।

হাওয়া ভবনের মদতপুষ্ট অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট সৃষ্টি করে কৃত্রিম সংকট। আওয়ামী লীগ আমলের তুলনায় দ্রব্যমূল্য ১০০-২০০ গুণে বৃদ্ধি পায়। মূল্যস্ফীতি আওয়ামী লীগ আমলের ১.৫৯ থেকে ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। তারেক রহমান, আরাফাত রহমান ও বিএনপির মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও দলীয় ব্যক্তিরা আমদানি ব্যবসা করার প্রতি বেশি তৎপর ছিল; তারা বাংলাদেশকে আত্মনির্ভরশীল করতে চায়নি। ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথেই বিএনপি সরকার বেশি যুক্ত ছিল। তারা নিজেদের স্বার্থকে বড় করে দেখে দেশ ও জনগণের স্বার্থকে বিসর্জন দিয়েছে। রাতারাতি হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছে। অন্ধকারে হারিয়ে যেতে বসেছিল দেশ। এসবের ফলে আওয়ামী লীগ আমলে খাদ্যে আত্মনির্ভরশীল দেশ আবার খাদ্য ঘাটতির দেশে পরিণত হয়। আবার মঙ্গা দেখা দেয়; খাদ্যাভাব ও কর্মসংস্থানের অভাবে মানুষের মৃত্যু সংবাদ সংবাদপত্রের হেডলাইন হয়। আওয়ামী লীগ আমলে চালু কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। সাক্ষরতার হার ৬৫ থেকে আবার ৫০ শতাংশে নেমে আসে। ১৯৯৭ সালের নারীনীতি ও শিক্ষানীতি বাতিল করা হয়। নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সৃষ্ট স্থবিরতা আওয়ামী লীগ আমলের উন্নয়নের ধারাকে বানচাল করে দেয়।


টানা পাঁচ বছর ড়্গমতায় থাকলেও বিএনপি-জামাত জোট সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে পারেনি; বরং কার্যকর বিদ্যুৎ উৎপাদন ড়্গমতা ১ হাজার মেগাওয়াট হ্রাস পায়। গ্যাস উৎপাদনেও বিরাজ করে স্থবিরতা। কিন্তু খালেদা-পুত্র তারেক ও তার বন্ধুর খাম্বা লিমিটেডের অতিমুনাফা ও লুটপাটের সুযোগ করে দেয়ার জন্য শত শত কোটি টাকার বিদ্যুতের খুঁটি ক্রয় করা হয়। বিদ্যুতের দাবি জানানোর অপরাধে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার কানসাটে এক বছরে ১৭ কৃষককে গুলি করে হত্যা করা হয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে। ফলে দেশের শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ মুখ থুবড়ে পড়ে। এর পাশাপাশি সার, বীজ, ডিজেল প্রভৃতি কৃষি উপকরণের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও দুষ্প্রাপ্যতার জন্য মারাত্মকভাবে কৃষি উৎপাদন হ্রাস পায়। কৃষিতে সৃষ্টি হয় স্থবিরতা।

প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, শিড়্গা প্রতিষ্ঠান, পুলিশ প্রশাসনসহ সর্বস্তরে নির্লজ্জ দলীয়করণ, চাকরিচ্যুতি, দখল, অবদমন প্রভৃতির ফলে সুশাসন ও ন্যায় বিচারের অবসান ঘটে। বিএনপি-জামাত জোট দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস ও নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অর্থহীন করে তোলে। দলীয় অনুগত ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা করার লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধন করে প্রধান বিচারপতির চাকরির বয়সসীমা দুই বছর বৃদ্ধি, আজ্ঞাবহ অযোগ্য ব্যক্তিদের বিচারপতি ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ, ১ কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটার করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা কারচুপি ও ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নীল-নকশা কার্যকর করার মরিয়া প্রচেষ্টা চালায়। ২০০৬ সালে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও জনমত উপেক্ষা করে বিএনপির দলীয় রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন নিজেকে একতরফাভাবে ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক’ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা করেন। কিন্তু হাওয়া ভবনের আজ্ঞাবহ ইয়াজউদ্দিনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেও দলীয় নীল-নকশা বাস্তবায়নের হাতিয়ারে পরিণত করার পরিপ্রেক্ষিতে নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়ে দফায় দফায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টারা পদত্যাগ করেন। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নীল-নকশা প্রকাশ হয়ে পড়ে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কর্মকা- একটি অবাধ নিরপেক্ষ সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অসম্ভব করে তোলে। এ পটভূমিতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। দেশে জরুরি অবস্থা জারি ও সংসদ নির্বাচন স্থগিত করা হয়। ড. ইয়াজউদ্দিন প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে অপসারিত হন। সেনাবাহিনীর সমর্থনে ড. ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বে গঠিত হয় নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

বিরাজনীতিকরণের রাজনীতি ও মাইনাস টু’র অপপ্রয়াস সনাসমর্থিত এই নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার জরুরি অবস্থার সুযোগে ঢালাওভাবে রাজনীতিবিদদের চরিত্র হনন ও নির্যাতনের পথ গ্রহণ করে। শুরু হয় বিরাজনীতিকরণের নামে প্রচ্ছন্ন সামরিক শাসন। দীর্ঘদিন রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিষিদ্ধ থাকে। কেবল রাজনীতিবিদই নয়, দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিড়্গক-বুদ্ধিজীবী, সাধারণ দোকানদার, ফেরিওয়ালা এবং ছাত্রসমাজ হয় নির্যাতন-নিপীড়ন ও হয়রানির শিকার। আওয়ামী লীগের পড়্গ থেকে অবিলম্বে নির্বাচন দেয়ার দাবি জানালেও তারা তা উপেক্ষা করে। সংবিধান-বহির্ভূত কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ দুই বছর পর্যন্ত প্রলম্বিত করা হয়।


ইতোমধ্যে প্রচার করা হয় মাইনাস টু ফর্মুলা। কার্যত বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে বিরত রাখার লক্ষ্য থেকেই এই তত্ত্ব হাজির করা হয়। বিদেশ গমন করলে জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কিন্তু জননেত্রী শেখ হাসিনা ভয়-ভীতি-নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দেশে ফিরে আসার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবং এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলেন। ফলে সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়। মাথা উঁচু করে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু গ্রেফতার নির্যাতনের প্রতিবাদ এবং সরকারি কার্যক্রমের ব্যর্থতার কথা তুলে ধরায় এর কিছুদিন পরেই ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই কোনো পরোয়ানা ও অভিযোগ ছাড়াই বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়। দায়ের করা হয় একের পর এক মিথ্যা মামলা। নির্জন বন্দী অবস্থায় তার ওপর চালানো হয় মানসিক নির্যাতন, এমনকি তার জীবন সংশয়ও দেখা দেয়।

সেনাসমর্থিত এই সরকারের সময়ে মাইনাস টু ফর্মুলা কার্যকর করা, বড় রাজনৈতিক দলে ভাঙন সৃষ্টি, সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর সহযোগিতায় একাধিক ব্যক্তির নতুন রাজনৈতিক দল- কিংস পার্টি গঠনের উদ্যোগ, এমনকি সেনাবাহিনী প্রধানের রাষ্ট্রপতি হওয়ার মতো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙড়্গা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং সাংবিধানিক ধারাকেই বিপন্ন করে তোলে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাংবিধানিক ধারা অক্ষুণ্ন রাখা, রাজনৈতিক কর্মকান্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অবিলম্বে সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার দাবিতে সারাদেশে জনমত গড়ে তোলে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার একপর্যায়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়। আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনাকে ছাড়া কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা এবং হতে না দেয়ার সিদ্ধানত্ম ঘোষণা করে। জাতীয় ও আনত্মর্জাতিক চাপে পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে থাকে। আমাদের দাবির প্রেড়্গিতে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন এবং নির্বাচনে স্বচ্ছ ব্যালট বক্স ব্যবহার করা হয়। নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য সাংবিধানিক সংস্থা পুনর্গঠিত হয়। নির্বাচনী আইন ও রাজনৈতিক দলবিধিতেও ইতিবাচক সংস্কার/সংশোধনী আনা হয়। জননেত্রী শেখ হাসিনাকে মুক্তি দেয়া হয়। দীর্ঘ দুই বছরের মাথায় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সংসদের প্রায় নয়-দশমাংশ আসনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার দিনবদলের সনদের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানায় দেশবাসী। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার শপথ গ্রহণ করে। সংকটজাল ছিন্ন করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা হয় অবারিত।


আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পাঁচ বছর : বদলে যাওয়া দৃশ্যপট

আমরা আমাদের অঙ্গীকার পূরণ করেছি। তবে আমাদের অঙ্গীকার ও কর্মসূচি কেবল পাঁচ বছরের জন্য ছিল না। বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো রাজনৈতিক দল একটা দীর্ঘমেয়াদি সুস্পষ্ট কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিসত্মৃত রূপকল্প-২০২১ বা ভিশন আমরা উপস্থাপন করেছিলাম। সদ্য সমাপ্ত পাঁচ বছর মেয়াদে আমরা এই কর্মসূচি ও রূপকল্প-২০২১-এর যে অংশটি বাসত্মবায়িত করেছি, এখানে তার সংড়্গিপ্তসার তুলে ধরা হলো-

    অতীতের অনিশ্চয়তা, সংকটের চক্রাবর্ত এবং অনুন্নয়নের ধারা থেকে বের করে এনে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শানিত্ম, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের গতিপথে পুনঃস্থাপিত করা হয়।

    রূপকল্প-২০২১ বাসত্মবায়নের লড়্গ্যে প্রণয়ন করা হয় প্রেড়্গিত পরিকল্পনা ২০১০-২১ এবং ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১০-১৫)। উভয় পরিকল্পনা বাসত্মবায়নাধীন রয়েছে।

ষ   গত নির্বাচনী ইশতেহারে যে ‘পাঁচটি অগ্রাধিকারের বিষয়’ নির্ধারিত হয়েছিল, সেসব ড়্গেত্রে কেবল কাঙিড়্গত সাফল্যই অর্জিত হয়নি, কোনো কোনো খাতে লড়্গ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।

     কঠোর হসেত্ম ভোক্তা অধিকার রড়্গা এবং মূল্য সন্ত্রাস বন্ধ করা হয়। চাল, ডাল, আটাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর ঊর্ধ্বগতি রোধ, চালের দাম হ্রাস এবং জনগণের ক্রয়ড়্গমতার মধ্যে স্থিতিশীল রাখা হয়। মূল্যস্ফীতির হার ১১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭.৫ শতাংশে স্থিতিশীল করা হয়। পড়্গানত্মরে জনগণের আয়-রোজগার ও ক্রয়ড়্গমতা বৃদ্ধি পায়।

     টাস্ক ফোর্স গঠন, রপ্তানিকারকদের আর্থিক প্রণোদনাদানসহ দড়্গতার সঙ্গে বিশ্বমন্দার অভিঘাত ও প্রভাব সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করা হয়। বিশ্ব পরিসরে প্রবৃদ্ধি এবং বাণিজ্যের নিম্নগতি সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা কেবল চালুই থাকেনি, এই প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশে গড়ে ৬.২ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতিতে বিএনপি জোট সরকারের আমলের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের তুলনা করলেই সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে, কারা দেশকে দ্রম্নত উন্নত-সমৃদ্ধ করতে সড়্গম। অর্জিত সাফল্যের নিম্নলিখিত তুলনামূলক চিত্রের দিকে তাকালেই এ সত্যই প্রতিভাত হবে যে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ অবশ্যই একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে।

সামষ্টিক অর্থনীতির এই চিত্র আনত্মর্জাতিকভাবে প্রশংসাসূচক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এ কথা সবাই স্বীকার করবেন, অভ্যনত্মরীণ সঞ্চয় ও জাতীয় আয় বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের পাঁচ বছরে আমাদের জাতীয় বাজেটের আয়তন ২০০৬-এর তুলনায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৩.৭ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। রেমিট্যান্স বেড়েছে ৩.৭ গুণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ গুণ, যা এ যাবতকালের সর্বোচ্চ। রপ্তানি আয় বেড়েছে আড়াই গুণ। বিদ্যুৎ উৎপাদনে সড়্গমতা ৩ গুণের বেশি বেড়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ ১০ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে।

    বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলের পাঁচ বছরই বাংলাদেশ শীর্ষ দুর্নীতিপরায়ণ দেশ হিসেবে কুখ্যাতি অর্জন করেছিল। গত পাঁচ বছরে সেই দুর্নাম বহুলাংশে মোচন হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠন করেছে। দুর্নীতির তদনত্ম, অনুসন্ধান, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দুদক প্রয়োজনে মন্ত্রী, আমলাসহ যে-কোনো ড়্গমতাধর ব্যক্তিকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদের নজির স্থাপন করেছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের উৎসমুখগুলো বন্ধ করার লড়্গ্যে অনলাইনে টেন্ডারসহ বিভিন্ন সেবা খাতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে দুর্নীতির সর্বগ্রাসী প্রকোপ কমেছে।

    বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অর্জিত হয়েছে অভূতপূর্ব সাফল্য। জরম্নরি আপদকালীন ব্যবস্থা ছাড়াও মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে ইতোমধ্যেই বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান হয়েছে। ২০১৩ সালের মধ্যে ৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের নির্ধারিত লড়্গ্যমাত্রা অতিক্রম করে ইতোমধ্যে তা ১০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। ভারত থেকে আমদানি করা হচ্ছে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লড়্গ্যে রাশিয়ার সাহায্যে ২০০০ মেগাওয়াটের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ শুরম্ন হয়েছে। মংলা ও চট্টগ্রামে কয়লাভিত্তিক আরও দুটি বৃহৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। দেশের ৬২ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে। নতুন নতুন গ্যাসকূপ খনন, গ্যাসক্ষেত্র এবং দুটি তেলড়্গেত্র আবিষ্কার হয়েছে। শিল্প-কারখানা এবং গৃহস্থালী কাজে নতুন গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়েছে।

ষ   দারিদ্র্য বিমোচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের অভূতপূর্ব সাফল্য আনত্মর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। দারিদ্র্য বিমোচনসহ কয়েকটি ড়্গেত্রে জাতিসংঘের সহস্রাব্দ লড়্গ্যমাত্রা (এমডিজি) নির্ধারিত ২০১৫ সালের দুই বছর আগেই অর্থাৎ, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ অর্জন করতে সড়্গম হয়েছে। ইতোমধ্যে ২০১৩ সালে সাধারণ দারিদ্র্যসীমা ২৬.২ শতাংশে এবং হত-দরিদ্রের হার নির্ধারিত লড়্গ্যমাত্রা ১১.৯ শতাংশে নেমে এসেছে। প্রায় ৫ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে মধ্যবিত্তের সত্মরে উঠে এসেছে। কমেছে আয়-বৈষম্য।

    গত পাঁচ বছরে সরকারি ও বেসরকারি খাতে প্রায় ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। এর মধ্যে অভ্যনত্মরীণ সংগঠিত খাতে ৬৯ লাখ মানুষের এবং বিদেশে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। মাত্র ৩৩ হাজার ২৭৪ টাকা ব্যয় করে মালয়েশিয়ায় সরকারিভাবে শ্রমিক নিয়োগ, সৌদি আরবে ‘ইকামা’ পরিবর্তনের সুবাদে ৪ লড়্গাধিক কর্মী বৈধ হয়েছে। বেকার যুবকদের আত্মকর্মসংস্থান ও ঋণ প্রদানের লড়্গ্যে প্রশিড়্গণ কর্মসূচি অব্যাহত আছে। ন্যাশনাল সার্ভিসের আওতায় প্রায় ৫৭ হাজার প্রশিড়্গণার্থী তরম্নণের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। এ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

    নির্বাচনী ইশতেহার-২০০৮-এ সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছিল অন্যতম অগ্রাধিকারের বিষয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, শুরম্নতেই এ ড়্গেত্রে আওয়ামী লীগ সরকারকে হোঁচট খেতে হয়; মোকাবিলা করতে হয় অকল্পনীয় চ্যালেঞ্জ। জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকারের দায়িত্বভার গ্রহণ করার মাত্র ৫২ দিনের মাথায় সংঘটিত হয় রক্তাক্ত বিডিআর বিদ্রোহ। চরম ধৈর্য, অসীম সাহস ও রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিডিআর বিদ্রোহের শানিত্মপূর্ণ সমাধান করেন। সেনাবাহিনীতে আস্থা ফিরিয়ে আনেন। ইতোমধ্যে বিডিআর বিদ্রোহের ১৮ হাজার আসামির বিচার সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধিতে ৮৫০ জন অভিযুক্তের বিচার করা হয়েছে। এই বিচার সেনাবাহিনী ও আধা-সামরিক বাহিনীতে শৃঙ্খলা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। বিডিআর বিদ্রোহের কলঙ্ক মোচনের উদ্দেশ্যে এই বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) রাখা হয়েছে। নতুন আইনও প্রণয়ন করা হয়েছে।

    বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের বিচারের রায় কার্যকর করা হয়েছে, সম্পন্ন হয়েছে জেলহত্যার বিচার। উন্মুক্ত হয়েছে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথ।

    নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে আনত্মর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১০ যুদ্ধাপরাধীর বিচার সম্পন্ন হয়েছে। কার্যকর করা হয়েছে কাদের মোলস্নার ফাঁসির রায়।

     সংসদকে কার্যকর ও অংশগ্রহণমূলক করতে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই ৫০টি স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়। বিরোধীদল থেকেও সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়। সংসদে সংরড়্গিত মহিলা আসনের সংখ্যা ৫০ জনে উন্নীত করা হয়েছে।

     ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান সামরিক ফরমান বলে ’৭২-এর সংবিধান সংশোধন করে। পরবর্তীকালে সেনাশাসক এরশাদও একইভাবে সংবিধান সংশোধন করে। ২০০৬ সালে হাইকোর্ট এবং ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্ট জিয়া-এরশাদের সামরিক শাসন ও সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রথম থেকেই সামরিক শাসকদের অবৈধ সংবিধান সংশোধনীর বিরোধিতা করেছে। ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ ছিল প্রতিশ্রম্নতিবদ্ধ। ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পড়্গ থেকে ’৭২-এর সংবিধানের মূল চেতনায় ফিরে যাওয়ার লড়্গ্যে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপন করা হয়। ২১ জুলাই ২০১০ জাতীয় সংসদের সকল দলের সদস্য সমন্বয়ে ১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি সংবিধান সংশোধনী সংসদীয় কমিটি গঠিত হয়। দীর্ঘ প্রায় এক বছর সংসদীয় কমিটি দেশের প্রতিষ্ঠিত প্রায় সকল রাজনৈতিক দল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, পেশাজীবী, সুশীল সমাজের বিভিন্ন সংগঠন এবং সমাজের বিভিন্ন সত্মরের মানুষের সঙ্গে আলোচনা ও মতবিনিময় করে। অসংখ্য সংগঠন/প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি লিখিতভাবেও তাদের মতামত জানায়। সংসদীয় কমিটির ২৭টি সভায় এসব নিয়ে বিসত্মারিত আলোচনা হয়। ৩০ জুন ২০১১ জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনী বিল পাস হয়। এ সংশোধনীর ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সংবলিত ’৭২-এর সংবিধানের চার মূলনীতি সংবিধানে পুনঃসংযোজিত হয়। অসাংবিধানিক পন্থায় ড়্গমতা দখলের পথ রম্নদ্ধ হয়।

    নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আর্থিক ড়্গমতা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিচার বিভাগের জন্য প্রবর্তন করা হয়েছে স্বতন্ত্র বেতন স্কেল।

     বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম মহামান্য রাষ্ট্রপতি সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সার্চ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠন করেন। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে লোকবল নিয়োগ ও আর্থিক ড়্গমতা নির্বাচন কমিশনকে দেয়া হয়েছে।

     ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সংসদ উপ-নির্বাচন, সিটি করপোরেশন ও মেয়র নির্বাচনসহ ৫ হাজার ৮০৩টি স্থানীয় সরকারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচিত হয়েছে ৬৪ হাজার ২৩ জনপ্রতিনিধি। স্থানীয় সরকার এবং জাতীয় সংসদের উপনির্বাচনসমূহে নিশ্চিত করা হয়েছে জনগণের ভোটাধিকার। প্রমাণিত হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অবাধ নিরপেড়্গ সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন সম্ভব।

     ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও পৌর কর্তৃপড়্গের ড়্গমতা ও দায়িত্ব বৃদ্ধি করা হয়েছে।

   গঠন করা হয়েছে কার্যকর স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন।

ষ  সংবিধানে ড়্গুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সম-অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। বৈষম্যমূলক অর্পিত সম্পত্তি আইন সংশোধন করা হয়েছে।

    প্রণয়ন করা হয়েছে তথ্য অধিকার আইন এবং গঠন করা হয়েছে তথ্য অধিকার কমিশন।

    বিএনপি-জামাত জোটের পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রত্যড়্গ মদতে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নস্যাৎ ও জঙ্গিবাদের উত্থানের ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ সরকারের পাঁচ বছর জঙ্গিবাদীদের কঠোর হসেত্ম দমন করা হয়েছে। সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের কলঙ্ক তিলক মোচন করে বাংলাদেশ এখন দড়্গিণ এশিয়ায় সবচেয়ে নিরাপদ ও শানিত্মপূর্ণ জনপদ।

ষ  প্রবাসী বাঙালিদের জাতি গঠন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের নিমিত্তে ৩টি  অনাবাসী ব্যাংক স্থাপিত হয়েছে।

    দলীয়করণের ঊর্ধ্বে দড়্গ ও গণমুখী জনপ্রশাসন গড়ে তোলার লড়্গ্যে বহুমুখী সংস্কারমূলক পদড়্গেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ই-গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠার লড়্গ্যে বিভাগ, জেলা-উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কম্পিউটার সরবরাহ এবং ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান করা হয়েছে। জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও মেধার ভিত্তিতে সব নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসরগ্রহণের বয়স দুই বছর বাড়িয়ে ৫৯ করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসরগ্রহণের বয়স বাড়িয়ে করা হয়েছে ৬০ বছর। ঘোষণা করা হয়েছে ২০ শতাংশ মহার্ঘ্য ভাতা। সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত মহিলাদের মাতৃত্বকালীন ছুটি চার মাস থেকে বাড়িয়ে ছয় মাসে উন্নীত করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন কমিশন গঠন করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকার রাজস্ব খাতে ৪ লাখ ২৭ হাজারের বেশি পদ সৃষ্টি করেছে এবং ১ লাখ ১৮ হাজারের বেশি পদ স্থায়ী করেছে। চাকরিরত অবস্থায় দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করলে ২০ হাজার টাকার স্থলে ৫ লাখ টাকা এবং আহত হলে ২ লাখ টাকা অনুদান প্রদানের সিদ্ধানত্ম হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য ১৫০ শয্যাবিশিষ্ট সরকারি কর্মচারী আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছে।

ষ  বেতন, ভাতা, আবাসন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিসহ দেশের পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসমূহকে আধুনিক ও দড়্গ করে গড়ে তোলার বহুমুখী পদড়্গেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

    প্রতিশ্রম্নতি অনুযায়ী রংপুরে নতুন বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বিভাগীয় শহর রংপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিলস্না ও গাজীপুরকে সিটি করপোরেশন ঘোষণা করে সেসব করপোরেশনের নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়েছে। ময়মনসিংহকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হয়েছে।

অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো ছাড়াও অন্