17-Mon-Dec-2018 07:40am

Position  1
notNot Done

নোরা, তুমি যাবে কোথায়

zakir

2018-01-31 08:46:58

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

উপন্যাসের নয়, নাটকের নায়িকা সে। একশ’ বিশ বছর আগে (১৮৭৯) ইবসেনের এই নায়িকাকে আমরা দেখেছি ঘর ছেড়ে হয়ে যাচ্ছে গভীর রাতে। নাটকের সমাপ্তি একটি শব্দ দিয়ে। নিচে দরজা খোলার শব্দ শোনা গেলো। নোরার বেরিয়ে যাওয়ার শব্দ। একাকী গেলো চলে গভীর রাতে। সেই শব্দ সারা ইউরোপে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছে। নানা ভাষায় অনূদিত ও মঞ্চস্থ হয়েছে ওই নাটক, হেনরিখ ইবসেনের ‘পুতুলের সংসার।’ বার্নাড শ’ বলেছেন ওই ধ্বনি ওয়াটারলুর কামানের আওয়াজের চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। মেয়েদের গৃহত্যাগ নতুন কি! জীবনে ঘটে, সাহিত্যে ঘটে। ইবসেনের ওই নাটক যখন লেখা হয় তার তিন বছর আগে টলস্টয় তাঁর উপন্যাস ‘আন্না কারেনিনা’ লিখেছেন, সেই উপন্যাসেও নায়িকা আন্না ঘর ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু দু’য়ের মধ্যে ব্যবধান একেবারেই মৌলিক।
 আন্না সুন্দরী, উচ্চবিত্ত, বহুগুনে গুণান্বিত। নোরার সৌন্দর্য সম্পর্কে লেখক কিছুই বলেন না, সে একেবারেই মধ্যবিত্ত এবং অনেক যে গুণ তার, তাও নয়। প্রেম নয়, প্রেমের কারণে গৃহত্যাগ করেনি নোরা, পালিয়ে যায়নি কারো হাত ধরে। প্রচ্ছন্ন প্রেমিক একজন আছে বটে নাটকে। ড. র্যাংক। সে-বেচারা অত্যন্ত অসুস্থ, মৃত্যুপথযাত্রী। সে মারাই যাবে এবং তার আসন্ন মৃত্যু নাটকের ঘটনাপ্রবাহের ওপর প্রভাব ফেলে; কিন্তু র্যাংকের হাত ধরে নোরা বের হয়ে যাচ্ছে এ কল্পনা অবাস্তব। না, প্রেমে নয়, নিজের ভিতরে ব্যক্তিত্বের যে-জাগরণ ঘটেছে তারই তাড়নায় বের হয়ে গেছে নোরা। গোপনে নয়, প্রকাশ্যে, আলাপ-আলোচনা করে। রাত-দুপুরে স্বামীকে বলছে, তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে, আট বছর এক সঙ্গে আছি আমরা; কিন্তু গভীর কোনো কথা হয়নি, আজ হবে। তখন নোরার স্বামী, ব্যাংকের ম্যানেজার হেলমার, একটু আগেই যে ভয়ানক হম্বিতম্বি করছিল, ঠগ প্রতারক জোচ্চর বলছিল নোরাকে, বাপ তুলে গাল পাড়ছিল, বলছিল, ঘর থেকে বের করে দেবে না ঠিকই, নোরা অবশ্যই থাকবে ওই গৃহে, কিন্তু সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব পাবে না, সেই মারমুখো স্বামীটি ভয়ে সিটিয়ে গেছে। স্বামী-স্ত্রী বসেছে তারা টেবিলের দু’পাশে। অবিস্মরণীয় দৃশ্য সেটি, নাট্যসাহিত্যের জন্য সম্পূর্ণ নতুন।
সেই দৃশ্যে ঘটনা তেমন নেই, আড়ম্বরের একান্ত অভাব, স্বামী পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করেছে, ওদিকে স্ত্রী যে ভয়ানক উত্তেজিত তা নয়, শান্ত তার গলা, অত্যন্ত যুক্তিসহ তার বক্তব্য। এই যে গৃহধর্ম পালন-এ তার কাছে পুতুল খেলা, তার পিতা তাকে পুতুল করে রেখেছিল কৈশোরে, স্বামী পুতুল করলো বয়সকালে, এখন সে আর এখানে থাকবে না, নিজেকে খুঁজতে বের হয়ে যাবে। ভঙ্গিতে কোনো নৃশংসতা নেই, আক্রমণও নেই, কিন্তু এমন দৃঢ়, অপ্রত্যাশিত ও যুক্তিযুক্ত তার কথাগুলো যে নাটকের সেই শেষ পর্যাযে নাটকীয় ক্রিয়া থেকে গেছে, কেবল চলছে আলোচনা দু’জনের। কিন্তু নাটকীয়তা ব্যাহত হচ্ছে না, নাটক বরঞ্চ জমে উঠেছে। এবং উত্তেজনা থাকলে পাগলামি কিংবা উচ্ছৃঙ্খলা বলে যাকে উড়িয়ে দেওয়া যেত শান্ত কথোপকথন বলে তাকে বিবেচনা না করে উপায় থাকছে না। নিরীহ বলেই এ আরো বেশি বিপজ্জনক।
স্বামী হেলমার নানা যুক্তি দিয়েছে। প্রত্যাশিত যুক্তির সবগুলোই দিয়েছে হেলমার। যেগুলো দেয়নি সেগুলোও নোরার অজানা নয়, তার পরিবেশ ও পরিস্থিতি সেগুলো বলছে তাকে। স্বামীরা তো ওই রকমই হয়, নোরা ধরে নিতে পারে। দেখছে তো চতুর্দিকে। নিজেদের তারা কর্তা মনে করে, তারাই শাসন করে। স্বেচ্ছাচার চালাবে, স্ত্রী তা মেনে নেবে। তাছাড়া নোরার সংসারে তো তখন সর্বেমাত্র সচ্ছলতা দেখা দিয়েছে। সন্তানদের দেখবার জন্য আয়া আছে। কাজ করবার মানুষও রয়েছে ঘরে। সাজানো-গোছানো ঘর-গৃহস্থালী। নোরার যে ঋণ ছিল বাজারে তাও শোধ হয়ে এসেছে। সামনেই নতুন বছর, ব্যাংকে ম্যানেজারের চাকরি পেয়েছে হেলমার, নববর্ষে নতুন চাকরিতে যোগ দেবে, তখন অভাব বলতে আর কিছুই থাকবে না। প্রভাব-প্রতিপত্তি অনেক যাবে বেড়ে। ক্রগস্টার্ডের হাতে যে দলিল ছিল যাতে নোরা তার পিতার সই জাল করেছিল, নোরাকে ক্রগস্টার্ড সেটা ফেরত দিয়ে আছে এবং হেলমার সেটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরোই করেনি শুধু, টুকরোগুলো পুড়িয়েও ফেলেছে। তবু কেন ঘর ছাড়লো নোরা? ছাড়লো কোনো পাগলামিতে নয়, ছাড়লো মুক্তির খোঁজে।
ইউরোপে একেবার রেনেসান্স এসেছিল। সেই অভ্যুদয় মানবতাকে সবচেয়ে বড়বিষয় করে তুললো- এ আমরা জানি। জানা আছে আমাদের যে, ঈশ্বরের জায়গায় মানুষ চলে এলো তখন, মূল্যবোধের কেন্দ্রে। তারপর বুর্জোয়া বিকাশ ঘটেছে ইউরোপে, ব্যক্তি স্বাধীনতা স্পৃহা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছে। নোরা সেই বোধেরই প্রতিনিধি। তার জগৎ ঈশ্বরকেন্দ্রিক নয়, মনুষ্যকেন্দ্রিক। এই ইহজাগতিক পৃথিবীতে নারী যে পুতুল হয়ে রয়েছে এ-সত্য ধরা পড়ে গেছে নোরার কাছে। পুতুল খেলা সে আর খেলবে না। পুরাতন সাজসজ্জা মানায় না তাকে, পরেছে বাইরে যাবার পোষাক, সেই পোষাক গায়ে, ব্যাগ হাতে দরজা খুলে অন্ধকারের মধ্যে বের হয়ে গেলো সে, মুক্তির খোঁজে। আত্মহত্যা করলো না, যেমনটা আন্না করেছে, টলস্টয়ের উপন্যাসে। আত্মসমর্পণ করলো না, যেমন লক্ষ লক্ষ মেয়েরা করেছে। উন্মাদ হয়ে গেলো না, যেমন অনেকে হয়। সে গেলো বের হয়ে। সংসার ছেড়ে।
নারীর এই হীন অবস্থা চিরকাল ছিল না। এক সময়ে, সেই আদিকালে, মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ছিল বাস্তব সত্য। তখন মেয়েরাই কর্তৃত্ব করতো পুরুষের ওপর। পরে যখন থেকে দাস-ব্যবস্থা এলো তখন থেকেই মেয়েরা নেমে গেলো সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে। এঙ্গেলসের সেই উক্তিটি যেমন বহুল-প্রচরিত তেমনি সত্যও বটে, মাতৃঅধিকার উচ্ছেদ নারী জাতির এক বিশ্ব-ঐতিহাসিক পরাজয়। পুরুষ গৃহ স্বামীর কর্তৃত্বও গ্রহণ করলো, নারী হলো পদানত, শৃঙ্খলিত, পুরুষের লালসার দাস, সন্তান সৃষ্টির যন্ত্র। সভ্যতা এগিয়েছে, উৎপাদন সম্পর্কে দাস প্রথার, পরে সামন্তবাদ এলো, আরো পরে এলো পুঁজিবাদ- যে পুঁজিবাদের অধীনস্থ মানুষ নোরা, অধীন তার স্বামী হেলমার। হ্যাঁ, হেলমারও! হেলমার দুর্বৃত্ত নয়, সে সাধারণ আর-পাঁচটা স্বামীর মতোই। আর-পাঁচজন যা বলতো, উদ্বিগ্ন হয়ে সেই কথাগুলোই বললো সে নোরাকে, নোরা যাতে নিবৃত্ত হয়, গৃহত্যাগ না করে। ধর্মের কথা, সমাজ কি বলবে সে-কথা, বই-এ কি লেখা আছে সব সে-কথা-সবই বললো সে একের পর এক। কিন্তু কোনোটাতেই কাজ হয়নি। শেষে বলেছে, ‘নারী হিসেবে তোমার কর্তব্য রয়েছে স্বামী ও সন্তানের প্রতি।’ নোরার জবাব, ‘প্রায় সমান পবিত্র আর একটি কর্তব্য রয়েছে আমার।’
সেটা কি? কার প্রতি? ‘আমার নিজের প্রতি’- নোরা বলেছে। নিজের প্রতি এই কর্তব্যপালন করতে গিয়েই ঘর ছাড়তে হবে তাকে। সে মুক্তি চায়। হেলমার তো বলেছিলই, কোনো পুরুষই তার নিজের সম্মান বিসর্জন দিতে সম্মত হবে না, এমনকি যাকে সে ভালোবাসে তার জন্যও নয়। নোরার জবাবটা রূঢ় নয় কিন্তু অবিসংবাদিত সত্য, “লক্ষ লক্ষ মেয়ে কিন্তু ঠিক তাই করেছে।’ -হ্যাঁ, করেছে, ভালোবাসার মানুষের জন্য সম্মান বিসর্জন দিয়েছে। নোরা নিজেও তো ঠিক তাই করছিল, এতদিন ধরে। ক্রগস্টার্ডের কাছ থেকে সে টাকা ধার নিয়েছে নিজের প্রয়োজনে নয়, স্বামীর জীবন রক্ষার জন্য। মানসম্মানের পরোয়া করেনি। পিতার সই জাল করেছে। মনে হয়নি কোনো অপরাধ করেছে। সেই টাকা দিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছে স্বামী হেলমারের। তার ওপর দাঁড়িয়েই না আজ হেলমারে অত হম্বিতম্বি। এখন চোখ খুলে গেছে নোরার। ওই যে তার স্বামী তাকে গানের পাখি, দুষ্ট কাঠবিড়ালি এসব বলে আদর সোহাগ করতো তা যে কর্তৃত্বের প্রকাশ ভিন্ন অন্য কিছু নয়, বুঝেছে সে। এখন সন্তানের প্রতি মায়াও তাকে ধরে রাখতে পারবে না। ‘আমোদে ছিলাম সংসারে, কিন্তু সুখে ছিলাম না’- বলছে নোরা। স্বামীকে তো সেই চেনেই না, ভালোবাসবে কি করে?
এই নোরাকে সমাজই-বা সহ্য করে কি করে? সে যদি উচ্ছৃঙ্খল হতো তাহলে তাকে উপেক্ষা করা যেতো, নয়তো শাস্তি দেওয়া চলতো, কিন্তু সে তো উচ্ছৃঙ্খল নয়, সে যে বিদ্রোহী। বিপদ সেইখানেই। নোরা বুর্জোয়া বিবাহকে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে, মাতৃত্বকে অস্বীকার করছে, ঘর কন্নার মোহ তো গেছেই চুকে। এই মেয়েকে এখন ফের পুতুল বানানো যাবে কি করে? কিভাবে আদর করার নাম করে খাঁচার পাখি করা যাবে পুনরায়? ওয়াটারলুর কামানের চেয়ে কম ভয়ঙ্কর নয় নোরার ঠাণ্ডা কথাগুলো।
না, ‘অগ্রসর’ পুঁজিবাদী সমাজ নোরার গৃহত্যাগকে স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিল না। জার্মানীতে যখন অভিনয়ের আয়োজন হলো ‘পুতুলের সংসার’-এর তখন যে-অভিনেত্রী নায়িকার ভূমিকায় নামবেন তিনি কিছুতেই রাজী হলেন না ওভাবে ঘর ছেড়ে যেতে। বলা হলো, নাটকের শেষটা বদলাতে হবে। জার্মান মঞ্চের জন্য শেষে ইবসেন নিজেই বদলে দিয়েছিলেন তাঁর নাটকের পরিণতি। তাঁর ভয় ছিল অন্যের হস্তক্ষেপে নাটকের আরো মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়ে যাবে। ওই জার্মান রূপান্তরে দেখা যাচ্ছে হেলমার নোরাকে জোর করে তাদের ঘুমন্ত সন্তান তিনটির কাছে নিয়ে যাচ্ছে, আর তাদেরকে দেখে নোরার ভেতরকার সুপ্ত মাতৃত্ব জেগে উঠলো, মা নোরা তার হাতের ব্যাগটা ফেলে দিয়ে ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল। তাতে অবশ্য নাটকেরও বসে পড়বার কথা। কিন্তু ওই যে বললাম, ওটি না করে উপায় ছিল না, সমাজ প্রস্তুত ছিল না নাটকের ভেতরে ইবসেন-পরিকল্পিত পরিণতিকে গ্রহণ করতে।
 
ইবসেন তাঁর এ-নাটকের জন্য যে-খসড়া তৈরি করেছিলেন তাতে একে বলা হয়েছিল আধুনিক জীবনের নাটক। আধুনিক জীবনের ট্র্যাজেডিই বলা যাবে, যদিও এতে কোনো মৃত্যু নেই, ভয়াবহ কোনো ঘটনাও নেই। আধুনিক বুর্জোয়া দাম্পত্য জীবনের অন্তঃসার শূন্যতাকে তিনি উন্মোচিত করে দিয়েছেন বটে। খসড়াতে লিখেছিলেন ইবসেন, ‘বিপর্যয়টি এগিয়ে আসছে, অপ্রতিরোধ্য, অনিবার্য। হতাশা, প্রতিরোধ, পরাজয়।’ নোরার গৃহত্যাগ ওভাবেই গড়ে উঠেছে- নাটকের ভেতরে থেকেই। তবে লেখার আগে হয়তো তিনি নোরার পরাজয় দেখেছিলেন, জয়টি দেখেননি। লিখতে গিয়ে দেখলেন আগে না-দেখুন, নাটকের ভেতরে কিন্তু নোরার পক্ষে হেলমারের ঘর ছেড়ে চলে যাওয়া অনিবার্য ছিল। একেবারেই।
নোরা একটি বিশেষ নাটকের চরিত্র। সেই নাটকের ঘটনার পরস্পরা, ঘাত-প্রতিঘাত অন্য চরিত্রের, বিশেষ করে তার স্বামীর সঙ্গে তার সম্পর্ক- এ সব দ্বারাই নোরা নিয়ন্ত্রিত। ইংল্যান্ডে ‘পুতুলের সংসার’ মঞ্চস্থ হয়েছে রচনার দশ বছর পরে। যতদিন চলার কথা ছিল প্রথমবার তার চেয়ে কম নয়, বেশি সময় ধরেই চলেছে; চার সপ্তাহ একনাগাড়ে। এই অভিনয়ে নোরার ভূমিকা যিনি নিয়েছিলেন সেই অভিনেত্রী, জেনেট এচার্চ-বলেছেন নাটকের ঘটনা প্রবাহে নোরার গৃহত্যাগ ছিল অপরিহার্য। সে কি করে বসবাস করে হেলমারের মতো অসম্ভব একজন স্বামীর সঙ্গে? হ্যাঁ, এখানেও ওই কথাই, এ একটি নাটকের ঘটনা, একে সেভাবেই দেখা সঙ্গত। তার বাইরে নেওয়া উচিত নয়। ইবসেন নিজেও নোরার গৃহত্যাগের তাৎপর্যকে কমিয়ে আনতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন না, নোরার মতো সব স্ত্রীকেই যে ঘর ছেড়ে চলে যেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। এও বলেছেন তিনি, মেয়েদের অধিকার বলতে কি বোঝায় তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। পাঠক হিসাবে এটা আমাদের জানা আছে যে, ইবসেন বিপ্লবে আস্থা খুইয়েছিলেন, ফরাসী বিপ্লবের পরিণতি স্মরণ করে। তিনি বরঞ্চ বিশ্বাস করতেন মনের মধ্যে বিপ্লবী চেতনা সৃষ্টিতে।
কিন্তু তবু নাট্যকার, অভিনেত্রী যেই যা বলুন না কেন, নোরা একটি বিশেষ নাটকের একটি চরিত্র থাকেনি, বিশেষকে ছাড়িয়ে নির্বিশেষ হয়ে উঠেছে, সে বুর্জোয়া সমাজের একটি নারীকন্ঠে পরিণত হয়েছে, সে-কন্ঠ যে-কোনো স্ত্রীর হতে পারতো, যদি তারা গলা উঁচু করতো। ইংল্যান্ডের নাট্য-সমালোচকরদের কেউ কেউ যে নোরাকে বোকা, আত্মপ্রেমিক, ঝগরাটে, দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে গালমন্দ করেছেন তা খুবই স্বাভাবিক, যেমন স্বাভাবিক ছিল এই ঘটনা যে, চীনে মাও-পত্মী (পরে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রধান সংগঠক) নোরাকে বলবেন, একজন বিদ্রোহিনী, নারী-মুক্তির প্রশ্নকে যে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে। স্মরণীয় যে, তরুণ বয়সে মাও-পত্মী যখন সাংহাইয়ে অভিনেত্রী ছিলেন তখন তিনি নোরার চরিত্রে অভিনয় করতে পছন্দ করতেন। চরিত্রটি ছিল তাঁর প্রিয়। প্রশ্নটি অবশ্যই দৃষ্টিভঙ্গির।
যে-ইংরেজ অভিনেত্রীর কথা উপরে উল্লেখ করেছি তিনিও মনে করেছেন সন্তান ত্যাগ করা কঠিন কাজ ছিল নোরার পক্ষে। তা ছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কুমু যে বলেছে ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসে, ‘এমন কিছু আছে যা ছেলের জন্যও খোয়ানো যায় না’ সেটা নোরারও বক্তব্য বটে। ‘যোগাযোগ‘ গ্রন্থাকারে বের হয়েছে ১৯২৯ সালে, নিজের প্রতি কর্তব্য সম্বন্ধে কুমুর বক্তব্যে নোরার বক্তব্যের ছায়া পড়েছে কিনা আমরা জানি না, তবে কুমুর যে-কথা সে-কথা নোরারও। কুমু বলে, ‘আমি তাদের বড় বউ, তার কি কোন মানে আছে, আমি যদি কুমু না হই’। এটা নোরারও বক্তব্য। হুবহু। কিন্তু মস্ত বড় ব্যবধান রয়ে গেছে দু’জনের মধ্যে। নোরা তিন সন্তান রেখে চলে যাচ্ছে, দেখি আমরা, ওদিক কুমুকে দেখি নিজেকে সন্তানসম্ভবা জেনে স্বামীর গৃহে ফিরে যাচ্ছে। তার ভাই বিপ্রদাস কুমুকে প্রায় ঠেলেঠুলে দিচ্ছে পাঠিয়ে। বুঝতে অসুবিধা হয় না নোরা অসাধারণ কোন দিক দিয়ে, কেমন সে সাহসী ও অনমনীয়। যে নতুন চেতনা সে পেয়েছে তার নিজের মধ্যে সে-চেতনার স্থান সংকুলান হেলমারের ক্ষুদ্র গৃহে হবার নয়, তা ওই গৃহ যতই বড় কিংবা স্বচ্ছল হোক।
ইংরেজ অভিনেত্রী আরো বলেছিলেন যে, ওই নাটক থেকে শিক্ষণীয় বিষয় আছে দু’টি। একটি পুরুষদের জন্য, অপরটি মেয়েদের। পুরুষরা পেতে পারে এই জ্ঞান যে, স্ত্রী কি ভাবছে, কি অনুভব করছে তা উপেক্ষা করা মোটেই সমীচীন নয়। আর মেয়েরা? মেয়েরা শিখবে এটা যে, বিয়ের ব্যাপারে ঝটপট কিছু করতে  নেই। ঝাঁপ দিতে নেই অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে। নোরার বিয়েটা, বলা বাহুল্য, বড় ঝটপট হয়েছিল। প্রায় প্রথম দর্শনে প্রেমের মতো। কিন্তু যদি তা না হতো, অথবা হেলমারকে না করে অন্য কাউকে যদি বিয়ে করতো নোরা, স্বামী হিসাবে সেই লোকটি কি ভিন্ন রকমের আচরণ করতো? নোরাকে পুতুল বানাতে কি দ্বিধা করতো সে? মোটই না।
বিয়ের পর আট বছর একত্রে থেকেছে তারা, আগে কখনো ঝগড়া করেছে বলে মনে হয় না, এ-নাটকের শুরুতে দেখি উচ্ছল, প্রায় নৃত্যপরায়ণা নোরা ঘর  সাজাচ্ছে। বড়দিন এসেছে। খুশির সময়। সবকিছু এখন ভালোর দিকে। কিন্তু যে তিন দিনের ঘটনা নিয়ে নাটক তার ভেতর এমন সব ঘটনা ঘটে গেলো নোরার জীবনে যে, সে সবকিছুকে নতুনভাবে বিচার করতে শিখলো, স্বামী তখন আর স্বামী নয়, একটি অপরিচিত পুরুষ। আট বছরেও যাকে সে চেনে নি, আর কত বছরে চিনতো? হেলমার কোনো ব্যতিক্রম নয়। সে সাধারণ, সে তা-ই করেছে যা অন্যেরা করে। সে-জন্যই নোরা নাটকের ভেতরে আবদ্ধ থাকে না, বের হয়ে আসে। সে তো কেবল একজন হেলমারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত নয়, তার দ্বন্দ্ব গোটা ব্যবস্থার সঙ্গে। ‘আমাকে দেখতে হবে কে ঠিক- জগৎ নাকি আমি’, নোরা বলেছে তার স্বামীকে। নোরা মুখোমুখি সমগ্র পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার, সেখানে সে তার ব্যক্তি পরিচয়কে ছাড়িয়ে যায়, হেলমারের মতোই।

নোরা যখন ঘর ছাড়ছে প্রায় সেই সময়েই (১৮৭৩) বঙ্কিমচন্দ্রের সূর্য্যমুখী গৃহত্যাগ করেছিল। সূর্য্যমুখী ‘বিষবৃক্ষের’ নায়িকা, নাকি বলব দুই নায়িকার একজন? সূর্য্যমুখী জানতো না সে যাবে কোথায়। কোন অরণ্যে কিংবা জনপদে। তার সমাজে সূর্য্যমুখীর যাবার কোনো জায়গা ছিলো না। তবে জানতো সে যে, যেতে হবে, নিজের সংসারে তার আর ঠাঁই নেই। সেখানে কুন্দনন্দিনী এসে গেছে। স্বামী নগেন্দ্রনাথ কুন্দনন্দিনীকে বিয়ে করেছে। কুন্দনন্দিনী এক সময় পুতুল ছিল সূর্য্যমুখীর হাতে। এখন সে পুতুলটি মানুষ হয়ে নগেন্দ্রনাথকে অধিকার করে নিয়েছে। সূর্য্যমুখীর এ এক বিরাট পরাজয়। আশ্রিতাকে সে কি করে সপত্মী হিসেবে গ্রহণ করে? কি করে পূজনীয় ও অনিন্দ্য স্বামীকে ভাগাভাগি করে নেয় অপর একজন নারীর সঙ্গে? সূর্য্যমুখী তাই ঘর ছেড়েছে। সূর্য্যমুখীর কোনো সন্তান ছিল না, নোরার ছিল একটি নয়, তিনটি, ছোট ছোট পুতুলের মতো, নোরা যাদেরকে অত্যন্ত ভালোবাসে।
নোরার পরিস্থিতিতে সূর্য্যমুখী যে সংসার ছেড়ে পথে বের হয়ে পড়তো সেটা মোটেই নয়। হেলমার নগেন্দ্রনাথ নয়, মোটেই না। অন্য নারীকে বিয়ে করা দূরের কথা, হেলমার অন্য কোনো মেয়ের প্রতি আসক্তও নয়। হেলমার নোরাকে গভীরভাবে ভালোবাসে, যদিও সে-ভালোবাসা বুর্জোয়াদের ভালোবাসা, ভালোবাসার পাত্র সেখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিশেষ। সে কর্তব্যপরায়ণ, প্রাণবন্ত, অসুখে পড়েছিল অতিরিক্ত পরিশ্রম করে। তাকে দুর্বৃত্ত বলি কি করে? না, নোরাকে সে বাধ্য করেনি, পালিয়ে যেতে, তাছাড়া নোরা তো পালিয়ে যায়নি, সে গেছে প্রকাশ্যে, আলাপ করে জানিয়ে দিয়ে। তার ব্যাপার সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ভিন্ন যে আবারও বুঝি যখন দেখি সূর্য্যমুখী ফেরত চলে এসেছে। কাশীর দিকে চলে গিয়েছিল, সেখানে আশ্রয় দিয়েছে তাকে একজন ব্রহ্মচারী। স্বামী নগেন্দ্রনাথ স্ত্রী হারিয়ে প্রকৃতস্থ ছিল না। ওদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী কুন্দনন্দিনী আত্মহত্যা করলো। ফলে স্বামী-স্ত্রীর পুনর্মিলনে কোনো অন্তরায় রইল না। সূর্যমুখী উনবিংশ শতাব্দীর। বিংশ শতাব্দীর কুমুকেও তো ফিরে যেতে হয়েছে স্বামীর ঘরে।
কুমুর ব্যক্তিত্ব সূর্যমুখীর তুলনায় স্বতন্ত্র। কুমুর মধ্যে আত্মসম্মানের যে-বোধ দেখি তা সূর্য্যমুখীদের সমসাময়িক নয়, পরবর্তী। কিন্তু কুমু তো নোরা নয়। কুমু সমগ্র নারী সমাজের প্রতিনিধি নয়, তার ট্র্যাজেডি ব্যক্তিগত এবং সেই সূত্রে পারিবারিক ও শ্রেণীগত। স্বামী মধুসূদন মানুষ নয়। জন্তুবিশেষ, যেমন দেখতে শুনতে, তেমনি স্বভাবচরিত্রে। গুড়ি মেরে এগোয়। বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কুমু কোনো প্রশ্ন তোলে না। ঘটনাক্রমে পতিত হয়েছে সে অপাত্রে, বিপদ তার সেখানেই। সূর্য্যমুখীর গৃহত্যাগ যেমন, গৃহে প্রত্যাবর্তনও তেমনি- আরো বেশি পরিমাণে, আসলে একেবারেই, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ঘটনা। ঢেউ উঠেছিল, মিলিয়ে গেছে, জলাশয়টি এখন শান্ত। কুমুও মিলে গেছে রাজবাড়িতে, রাজপুত্রের মাতা হয়ে।
তুলনায় টলস্টয়ের আন্নার যে-আত্মহত্যা তার সামাজিক তাৎপর্য গভীরতর। আন্না জানিয়ে গেলো যে, তার মতো প্রাণবন্তু, গুণান্বিতা ও আন্তরিক মানুষের জীবনে চরিতার্থতা দেবার ক্ষমতা তার সমাজের নেই। সমাজ আপাত-সভ্য কিন্তু আসলে হিংস্র ও বর্বর। নীরবে আন্না তাই প্রশ্ন তোলে, এবং সমাজের আসল ছবিকেও তুলে ধরে, প্রাণদানের মধ্য দিয়ে। কিন্তু আন্না তো বিদ্রোহ করে না, নোরা যেমন করেছে। নোরার কাজের সামাজিক তাৎপর্য তাই অনেক বেশি গভীর ও  সুদূরপ্রসারী, কামান গর্জনের চেয়েও বিপজ্জনক।
 
সূর্য্যমুখীর প্রত্যাবর্তন, কুমুর আত্মসমর্পণ, এমন কি আন্নার আত্মহত্যাও সমাজকে বড় রকমের কোনো ধাক্কা দেবে না। সূর্য্যমুখী ও কুমুর ক্ষেত্রে তো আঘাতের প্রশ্নই ওঠে না, তাদের দু’জনের পরিণতি সমাজকে বরঞ্চ আরো অধিক পরিমাণে দাম্ভিক ও অনমনীয়ই করে তুলবে। জয় হয়েছে প্রতিষ্ঠিতের এবং পুরুষের। দেখো, ঘর ছেড়ো না, ছেড়ে যাবে কোথায়, আবার তো ফিরে আসতেই হবে পোষা পাখিটির মতো, মিছিমিছি সম্পর্ক খারাপ-করা-ভঙ্গি যেন এই রকমেরই। অবশ্য সূর্য্যমুখীর ক্ষেত্রে এটাও লক্ষ্য করবার বিষয় যে, সে গৃহত্যাগ করেছিল বলেই কুন্দনন্দিনী আত্মহত্যা করলো। কই নগেন্দ্রনাথের তো কিছুই হলো না? এক নারী কারণ হলো অপর নারীর মৃত্যুর, প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা এতই শক্তিশালী। কুমু হয়তো ফেরত যেতো না, যদি-না ইতিমধ্যে তার মা হবার ব্যাপারটা ঘটে যেতো। স্বামীর মধুসূদনের শক্তি ওইখানেই, সে জোর করে হলেও কুমুকে তার সন্তানের জননী করতে পেরেছে এবং তারই টানে নিয়ে এসেছে কুমুদিনীকে, ভ্রাতৃনিবাসের আশ্রয় থেকে উৎপাটিত করে। এই যে মাতৃত্বের পবিত্রদায়িত্ব ও কর্তব্যের ধারনা, এও তো সমাজেরই সৃষ্টি। সমাজ পুরুষশাসিত, সমাজ নারী নির্যাতক। নোরা এই ব্যবস্থাটাকে মানে না; সে ব্যক্তি বটে, কিন্তু তার বিদ্রোহ নারীর বিদ্রোহ, সমাজের বিরুদ্ধে। কেননা সে যা করছে বলে-কয়ে করছে, মঞ্চের ওপরে চেয়ারে বসে কেবল স্বামীকে শোনাচ্ছে না সে তার কথা, গোটা ব্যবস্থাকেই শোনাচ্ছে। যে-জন্য অমন চাঞ্চল্য সৃষ্টি করলো সে তার কর্তব্য পালন দ্বারা।
রবীন্দ্রনাথের ‘স্ত্রীর পত্র’ ‘যোগাযোগ’-এর আগে লেখা, ১৯১৪তে। এই ছোট গল্পের নায়িকা মৃণাল ও কুমুর মতোই, আত্মসচেতন। স্বামীকে লিখছে সে তার প্রথম ও (আশা করা যায়) শেষ চিঠিতে যে, সে তার সাতাশ নম্বর মাখন বড়ালের গলির মেজ বউ নয়, সে কেবলই মৃণাল। কুমুকে ছাড়িয়ে যায় সে। সে গৃহত্যাগ করছে, এখন আছে কাশীতে, সে আর ফিরে যাবে না অন্ধকার ওই গলিতে। আত্মহত্যাও করবে না মৃণাল। ওই পুরোনো ঠাট্টাটি করে, মরে বাঁচবে না, বাঁচার মধ্যেই বাঁচবে সে। কিন্তু তবু গৃহত্যাগী নোরার সঙ্গে গৃহত্যাগী মৃণালের বিস্তর পার্থক্য। নোরা মাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে সম্মত হয়। মৃণাল কিন্তু মা হতে চেয়েছিল এবং তার সন্তানটি আতুরঘরেই মারা গেছে বলেই আজ সে বলতে পারছে ওই সংসারে বন্দী হবার জন্য আর সে ফিরবে না। তার চিঠির ভাষায়, ‘আমার মেয়েটি জন্ম নিয়েই মারা গেলো। আমাকে সে সঙ্গে যাবার জন্য ডাক দিলেছিল। সে যদি বেঁচে থাকতো তাহলে সেই আমার জীবনের যা কিছু সত্য, সমস্ত এনে দিতো, তখন তোমাদের মেঝো বউ থেকে একেবারে মা হয়ে বসতুম। মা যে এক সংসারের মধ্যে থেকেও বিশ্ব-সংসারের। মা হবার দুখঃটুকুই পেলুম, কিন্তু মা হবার মুক্তিটুকু পেলুম না।’ বোঝা যায় মৃণাল ইউরোপীয় নয়, একেবারে বাঙালি এবং একদিন দিয়ে এগিয়েছে তো অন্যদিকে দিয়ে পিছিয়ে রয়েছে। কুমু বলেছিল, ‘এমন কিছু আছে যা ছেলের জন্য খোয়ানো যায় না।’ মৃণাল তা বলবে না, কিন্তু কুমু যা পারেনি মৃণাল আবার তাই পেরেছে, মৃণাল বলতে পেরেছে সে আর ঘরে ফিরে যাবে না। তবে সন্তান নেই বলেই বলতে পারলো, সন্তান থাকলে তাকেও বন্দী থাকতে হতো, মেনে নিতে হতো বন্দীদশাকে-হয়তো বা মুক্তি ভেবে। মাতৃত্বের মোহ এমনিভাবে প্রোথিক করা হয়েছে মেয়েদের সম্বিতে।
মৃণালের জীবনে ঘটে গেছে আরো একটি বড় ঘটনা। বিন্দুর মৃত্যৃ। মৃণালের শ্বশুরবাড়িতে আশ্রিতা এই মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। তাকে বিয়ে দেয়া হয়েছিল এক পাগলের সাথে; জোর করে পাঠানো হয়েছে তাকে স্বামীর কাছে। শেষ পর্যন্ত সে মুক্তি খুঁজে পেয়েছে মৃত্যুর মধ্যে। কাপড়ে আগুন লাগিয়ে পুড়ে মরেছে বিন্দু। মৃণাল বলছে, ‘আমি বিন্দুকে দেখেছি। সংসারের মাঝখানে মেয়ে মানুষের পরিচয়টা যে কি তা আমি পেয়েছি। আর আমার দরকার নেই।’ না, নোরার জন্য কোনো মৃত্যুর প্রয়োজন দেখা দেয়নি, জীবনই তাকে শিখিয়েছিল জীবন কি। অনেক রকম ভয়-ভীতি অভাব-অনটনের বেড়া ঠেলে যখন সে সবেমাত্র পা দিয়েছে সচ্ছলতার এলাকায় তখনই তাকে সংসার ছেড়ে বের হয়ে যেতে হলো অনিশ্চয়তার পথে।

কিন্তু নোরা এখন কোথায় যাবে? এ- প্রশ্নটা নোরার আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই উঠেছে। কোথায় যাবে? কি হবে তার পরিণতি? চীনের লেখক লু সূনের এ প্রশ্ন তাঁর আগেও বার বার করেছে দর্শক, পাঠক ও সামাজিক মানুষেরা।
আত্মহত্যা করবে না, যেমন আন্না করেছিল। তাহলে? রবীন্দ্রনাথের মৃণাল কি করবে তার একটা জবাব মৃণাল নিজেই দেবার চেষ্টা করেছে, ‘আমার এই অনাদৃত রূপ যার চোখে ভালো লেগেছে সেই সুন্দর সমস্ত আকাশ দিয়ে আমাকে চেয়ে দেখেছেন। এইবার মরেছে মেজো বউ। আবার তোমাদের গলিকে আমি আর ভয় করিনে।
আমার সম্মুখে আজ নীল সমুদ্র; আমার মাথার উপরে আষাঢ়ের মেঘপুঞ্জ। গলির বিপক্ষে সমুদ্র ও আকাশ। মুক্তির উদার প্রতিশ্রুতি।’ কিন্তু মৃণালের এই কথাতে মোটেই স্পষ্ট হচ্ছে না সে এখন কি করবে। হয়তো ধর্মের পথে যাবে, হয়তো কাশীর তীর্থাশ্রমে একটি আশ্রয়ের ব্যবস্থা হয়ে যাবে তার জন্য। হিন্দুঘরের বিধবা মেয়েদের যেমন হয়, হতে পারে। কিন্তু তাতে কি মিলবে চরিতার্থতা? মৃণাল বাঙালি মেয়ে, তার চরিতার্থতা যদি ধর্মের পথে চলে যায়, তবে আমাদের বলবার কিছু থাকবে না; তবু ওটিও যে আত্মহত্যা এক প্রকারের, তা তো মানতে হবে। আত্মহত্যা নাহোক গলিতে আটকাপড়া তো বটেই, একগলি ছেড়ে আরেক গলিতে, ধর্মের গলিতে।
কিন্তু নোরা? নোরা তো ধর্মে আস্থা রাখে না, মৃণাল যেমন রাখে। সন্তান কি টানবে তাকে, যেমন মৃণালকে পারতো টানতে, কিংবা কুমুকে টেনেছে? ওই যে ইংরেজ মহিলা, নোরা চরিত্রে অভিনেত্রী, তিনি মনে করেন নোরা আবার ফিরে আসবে, সন্তানদের জন্য। আসবে কিন্তু থাকতে পারবে না, স্বামীর কারনে, তিনি ভেবেছেন।
নোরার স্বামীকে তাহলে কি একজন দুর্বৃত্ত বলবো? মোটেই না। হেলমার শিকারী নয়, সেও একজন শিকার, ওই একই সমাজ ব্যবস্থার। সেও পুতুল বটে, একটু বড় মাপের পুতুল, এই যা। নইলে সেও তো পরিশ্রম করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল; প্রায় মরণাপন্ন অবস্থা হয়েছিল তার। টাকা কোথা থেকে এসেছে- খোঁজ করেনি, নইলে যে-সত্যের সন্ধান পেতো তা তাকে স্বস্তি দিতো না। দেখতে পেতো, যে-নোরাকে সে পুতুল মনে করে সে-ই বরঞ্চ বাঁচিয়েছে তাকে, টাকা ধার করে এনে। সমাজকে হেলমার ভয় করে, জনমতকে উপেক্ষা করবে এমন সাহসের কণামাত্র নেই- যদিও ঘরের বউয়ের ওপর আস্ফালন করে সে থেকে থেকে। বস্তুত ইবসেনের ওই নাটকে কেউই দুর্বৃত্ত নয়। ক্রগস্টাডও নয়। যে-ক্রগস্টাডও নোরার ওপর জুলুম করছে, সই জালের ঘটনা ফাঁস করে দেবার হুমকি দিচ্ছে, সে নিজেও একজন ভুক্তভোগী ভিন্ন অন্যকিছু নয়। সামান্য অপরাধে তার চাকরি গেছে চলে, নোরার অপরাধের মতোই ছোট্ট সেই অপরাধ। কিন্তু এখন তার সন্তানেরা বড় হচ্ছে, তাদের চোখে এখন সে নিজের মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সই প্রয়োজনেই চাকরিটা ফেরত পাওয়া দরকার তার, কিন্তু ফেরত পাচ্ছে না। হেলমারই দিচ্ছে না ফেরত। তার স্বামীর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে অনুরোধ জানিনেছে ক্রগস্টাড নোরার কাছে। ক্রগস্টাডের অনুরোধ নোরা যখন শুনলো না, তকনই হুমকি-দেওয়া। কিন্তু হুমকিদাতা যে হুমকিপ্রাপ্তের মতোই অসহায় তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। না, কেউই দুর্বৃত্ত নয়, অথচ সবাই প্রায় অপরাধী, পরস্পরের চোখে এবং সমাজের চোখে।
কে এদেরকে অপরাধী করলো? যে করলো আসল অপরাধী সে-ই। দুর্বৃত্তহীন একটি পুতুল পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা। তার হাতের টানেই নৃত্য এই সব পুতুলের, কেউ বড় কেউ ছোট। নাটকে শুরু থেকেই টাকার কথা। তারপর টাকা, টাকা, কেবিল টাকা। আপন পিতা সম্পর্কে নোরা খুব উঁচু ধারণা রাখে, কিন্তু সে-ভদ্রলোকও টাকার ব্যাপারে সম্পূর্ণ যে সৎ ছিলেন তা নয়। হেলমার জানে সেটা, ওই পিতার কাগজপত্র পরীক্ষা করার দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই নোরার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হেলমারের পরে বিবাহ। নোরা সেই জাল করেছে, তার বাবার। বাধ্য হয়ে করেছে। বাবা তখন মৃত্যুশয্যায়, ওদিকে তৎক্ষণাৎ টাকা না-পেলে স্বামীর জীবন-সংশয়। বাবার কাছে গিয়ে যে বলবে নোরা, ‘তোমার সই চাই, হেলমারকে বাঁচানোর জন্য’, সে-সাহস হয়নি তার। স্বভাতই। পিতার মৃত্যুশয্যা পিতাকে কি করে বলে ‘তুমি আমার স্বামীকে বাঁচাও? ঋণের সুদ ও মূল শোধ করতে গিয়ে নানা রকম কষ্ট করতে হয় নোরাকে, সেলাই করে, নকলনবিশী করে, তবুও সংকুলার হয় না, স্বামীর কাছে হাত পাতে, স্বামীভাবে স্ত্রী অপচয় করছে। নোরা স্বপ্ন দেখে কোনো বৃদ্ধ প্রেমে পড়েছে তার; প্রেমে পড়ে উইল করে টাকা রেখে যাচ্ছে- নোরার জন্য ঠিক, হেলমার-পত্মীর জন্য। ওদিকে তার বান্ধবীর সঙ্গে দেখা যখন নোরার তখন সেই বিধবা বান্ধবী মিসেস লিন্ডেকে চিনতেই পারে না সে। জীবন লিন্ডেকে দলে-মুচড়ে দিয়েছে। মিসেস লিন্ডে এক সময়ে ভালোবাসতো ক্রগস্টাডকে, কিন্তু বিয়ে করেছিল অন্য পুরুষকে। টাকার জন্য। তার বিধবা মা শয্যাশায়ী, দুটি ভাই তার ওপর নির্ভরশীল, তার পক্ষে দরিদ্র ক্রগস্টাডকে বিয়ে করা সম্ভব। প্রেম ব্যর্থ হয়ে যায় অর্থের কারণে। এখন বিধবা মিসেস লিন্ডে দেখতে পাচ্ছে স্বামীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসাপাতি সব গেছে চলে, এখন সে চাকরি খুঁজছে ব্যস্ত হয়ে।
ক্রগস্টাডকে হঠাৎ করে মনে হতে পারে সাইলকের মতো। জুলুমবাজ। কিন্তু সে অনেক দূরে সাইলকের জগৎ থেকে। ক্রগস্টাড প্রতিহিংসাপরায়ণ নয়, সে অন্যের ক্ষতি চায় না, কেবল নিজের ভালো চায়। সাইলক হলো পুঁজি সংগ্রহের আদিম প্রক্রিয়ার প্রতিনিধি, ক্রগস্টাড পুঁজিবাদী ব্যবস্থার হাতে বন্দী পুরুষ। শেকস্পীয়রের ওই  নাটকে-‘দি মার্চেন্ট অব ভেসিন’-এ-প্রেম আছে, গান রয়েছে, সেখানে চাঁদ ওঠে আকাশে, মানুষ যেমন শত্রুতা করে মানুষের সঙ্গে তেমনি আবার মিলিতও হয়- ভালোবাসার সম্পর্কে। নোরার জগতে না-আছে আলো, না-আছে প্রাণবন্ত প্রেম। সব কিছুই স্তিমিত এখানে। গদ্যের জগৎ এটা, কবিতা গেছে পালিয়ে, যদিও নাট্যকার আর্থার মিলার বলেছেন যে, ইবসেনের এই নাটক একটি কবিতার মতো, মানুষের অগ্রগতির একটি নতুন স্তরের দ্যোতক এক কবিতা। সেটা ঠিক, কেবল সংলাপ বা ঘটনা নেই, এখানে কবিতাও রয়েছে। ভিন্ন ধরনের। কবিতায় যেমন প্রতীক থাকে, এ নাটকও প্রতীকের জন্যই উজ্জ্বল। নোরার বিদ্রোহ সেই উজ্জ্বলতার প্রধান উৎস।
কিন্তু নোরা এখন করবে কি? আপাতত কি করবে জানি আমরা। রাতের বাকি অংশ কাটাবে সে বান্ধবী মিসেস লিন্ডের ঘরে। সকালে যাবে বাবার বাড়িতে। কিন্তু তারপর ফিরে যাবে কি সে স্বামীর গৃহে? যেতে পারে। নোরা বলেছে, সে ফেরত যেতে পারে, যদি অলৌকিক একটি ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনাটি কি তা ব্যাখ্যা  করে বলেনি সে হেলমারকে। কিন্তু আমরা অনুমান করতে পারি। আমাদের অনুমান সেই অলৌকিক ঘটনাটি হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অবস্থানের রদবদল। স্বামী হেলমার যদি অধীনে চলে যায় স্ত্রী নোরার তবেই নোরা ফেরত আসতে পারে। নোরাকে পুতুল করে রাখা হয়েছিল এতকাল, এবার নোরা রাখবে পুতুল করে-তার স্বামীকে। একই আদর্শ স্বামী-স্ত্রীর, সমানভাবে আদর্শবাদী তারা উভয়েই। প্রকৃত প্রস্তাবে আদর্শটা তাদের ব্যক্তিগত নয়। এটি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার আদর্শ, যে-ব্যবস্থা প্রেম-ভালোবাসা বোঝে না, বোঝে কেবল ব্যক্তিগত সম্পত্তি। পুতুলে পরিণত করা আর ব্যক্তিগত সম্পত্তি করে তোলা একই ব্যাপার আসলে। নোরা যে-আদর্শের  বিরুদ্ধে লড়ছে সেটাই আবার নোরার প্রকৃত আদর্শ। এই বক্রাঘাতই বাস্তবতা। পুঁজিবাদ ব্যাপ্ত চতুর্দিকে, নোরা তুমি যাবে কোথায়?
তা অলৌকিক ঘটনার স্বপ্ন নোরা আগেও দেখেছে। ওই যে বৃদ্ধ প্রেমিক উইল করে টাকা দিয়ে মরে যাবে, আর কিছু চাইবে না- এটা স্বপ্ন  একটা। আরেকটা স্বপ্ন স্বামী তার খুব বড় হবে, প্রকৃত বীর পুরুষ হবে। কিন্তু সব কিছুই তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি- বৃদ্ধ পরিচয়হীন প্রেমিক যেমন প্রতিদিনের পরিচিত সবল স্বামীটিও তেমনি। সবাই তার পুতুল হবে। নোরা টাকা ধার করেছে স্বামীকে না জানিয়ে। কেন করলো? উদ্দেশ্যে যে কেবল স্বামীকে বাঁচানো তা নয়, উদ্দেশ্য স্বামীর ওপর কর্তৃত্ব করাও, স্বামীর অজান্তে। স্বামী খুব বিজ্ঞ মনে করে নিজেকে, কিন্তু জানে না, আদতে কতটা ছেলে মানুষ সে।  জানে না কে তাকে বাঁচিয়েছে এবং কিভাবে। একেবারেই ছেলে মানুষ, নইলে কোন সাহসে জালিয়াত-জোচ্চোর  বলে সে তার স্ত্রীকে, যখন প্রকৃত সত্য এই যে, বুদ্ধি করে বাবার সই নোরা জাল করেছিল বলেই হেলমার এখন ব্যাংকের ম্যানেজার হয়েছে, নইলে হয়তো মারা যেতো অসুখেই। নাটকের অভ্যন্তরে আমাদের দেখা হয় ডা. র্যাংকের সাথে, সে মারা যাবে, কিন্তু রোগটা তার নিজরে দোষে হয়নি, হয়েছে বংশানুক্রমের ধারাতে। রোগ কি পরোয়া করে রোগীর সুবিধা-অসুবিধার, পছন্দ-অপছন্দের? অসুস্থ আসলে সবাই। ডা. র্যাংক আক্রান্ত দৈহিক রোগে, চিকিৎসক নিজেই অসুস্থ এক্ষেত্রে। অন্যদের রোগটা চরিত্রের। মূল অসুখ সমাজের, তার নাম পুঁজিবাদ; নোরাকে লড়তে হবে এই পুঁজিবাদের বিরুদ্ধেই।
নোরা আরো একটি অলৌকিক ঘটনার স্বপ্ন দেখতো। তার স্বামীর বলবে, ‘সব দোষ আমার, আমিই অপরাধী।’ কিন্তু নোরার ভয় ও সেটাই, স্বামী যদ