19-Wed-Dec-2018 08:51pm

Position  1
notNot Done

পলাতকা এমা

zakir

2018-01-31 12:00:32

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

এমা, তুমি পালাবে কোথায়?- এই প্রশ্নটি গুস্তাভ ফ্লবেয়ারের নায়িকা এমা জিজ্ঞাসা করেনি। জিজ্ঞাসা করলে দেখতো জায়গা নেই পালাবার, সেটা দেখলে বেঁচে যেতো, না দেখে মারা পড়েছে। বেচারা! এমা বোভারী আসলে সুখ চেয়েছিল। বোঝেনি তার সমাজে সুখ একটা দোকানদারি, যখন বুঝলো তখন দেরি হয়ে গেছে। তখন আর পথ খোলা নেই ফিরবার কিংবা পালাবার, তাই তাকে আত্মহত্যা করতে হলো। ফিরতে নয়, পালাতেই চেয়েছিল এই মেয়েটি। উন্নত নয় চেয়েছে ভিন্নতর জীবন। সে-জীবন সম্ভব নয় পলায়ন ভিন্ন।
কিন্তু পালাবে কোথায়? পালাবার আগ্রহ আছে, রয়েছে তীব্র আকাঙ্খা, কিন্তু জায়গা নেই পালাবার, বাস্তবতা তো এটাই। বুদ্ধিমান মানুষেরা এটা বোঝা, স্বপ্নকে রাথে স্বপ্নের জায়গায়, বাস্তবকে বাস্তবের, মিলিয়ে ফেলে না এই দু’টিকে, তাই তাদের বিপদ হয় না। এমা সেটা পারেনি। স্বপ্নকে বাস্তবিক করে তুলতে চেয়েছে, সেই অসম্ভব কাজটা করতে গিয়ে নিজেই শেষ হয়ে গেলো। অতিসংক্ষেপে এমা বোভারীর কাহিনী এটাই। গুস্তাভ ফ্লবেয়ার (১৮২১-৮০) অসামান্য যত্নে এই সামান্য মেয়েটির কাহিনী লিখেছেন তাঁর উপন্যাসে। নায়িকার নামেই নামকরণ তাঁর লেখার। উপন্যাসটি এমা বোভারীর জীবন কাহিনী। পালাতে গিয়ে এমা যে আটকে পড়ছে, এটা পাঠক বোঝে, এমা বোঝে না, বুঝলো একেবারে শেষ মুহুর্তে, আত্মসমর্পণ করতে পারতো, করলো না, ‘হত্যা করলো নিজেকে, নিজের হাতে। যে-কারণে আত্মসমর্পণ অসম্ভব ছিল, সে-কারণেই বড় সে, নইলে খুবই সামান্য মেয়ে, তাকে ব্যভিচারিণী বলা কঠিন নয়, যদি ভেতরের খবর না-জানা থাকে। ভেতরে কেবল ইন্দ্রিয়সুখপরায়নতাই ছিল না এমার, ছিল অসম্মতিও, বলতে পারি বিদ্রোহ। ওইখানেই বড় সে, নইলে খুবই সামান্য।
 এমার সামাজিক জীবনটা সংকীর্ণ, পারিবারিক জীবন অকিঞ্চিৎকার। উঁচু স্বপ্ন, নিচু গৃহ, তাই ভেবেছিল ঘর ছেড়ে পালাবে। একঘেঁয়েমি ও সামান্যতায় ক্লান্ত এই কল্পনাবিলাসী চিরকিশোরী মেয়েটি মনে করেছিল পালাবার উপায় আছে, আশা করেছিল উদ্ধারকারী রাজপুত্র পাওয়া যাবে, রাজপুত্র না-হোক অন্তত সহযাত্রী তো পাবে। পায়নি, পাবার উপায় ছিল না, আত্মহত্যা করেই মরতে হলো তাকে, অথবা বাঁচতে। যদি প্রশ্ন করতো, দেখতো যাচাই করে, তাহলে বুঝতে পারতো যাকে সে পথ মনে করেছে সে হলো কানাগলি, যে-পুরুষকে রাজপুত্র মনে হয়েছিল সে আসলে সম্ভোগবন্দী সুযোগসন্ধানী, যে-যুবককে আশা করেছিল সহযাত্রী হবে সে জন্মভীতু। এরা সুযোগ নিয়েছে, এমার পলায়নপরতার। এমাকে নিয়ে পালাবে কি নিজেরাই পালিয়ে গেছে। বাস্তববাদী হলে এমা তার সমাজের আর পাঁচটি মেয়ের মতো বাঁচতো না বাঁচুক অন্তত টিকে যেতো। তবে নায়িকা হতো না; এমা যেমন হয়েছে। জীবন এমনই জটিল; বড় কিছু পেতে হলে কঠিন কিছু দিতে হয়।
এমা বোভারী মফস্বলের প্রাণী। ফ্লবেয়ার তাঁর এই উপন্যাসে সে-কথাটা ভুলতে নিষেধ করেছেন আমাদেরকে; তাঁর এই রচনার দ্বিতীয় নাম হচ্ছে, মফস্বলের জীবন। গ্রাম, প্রায়-নির্বোধ এক ডাক্তারের স্ত্রী সে, তার জীবন চিলেকোঠার মতো; দক্ষিণে যার জানালা খোলা, ভেতরে নির্বেদ। নিশ্চুপ অন্ধকারে বিরক্তির মাকড়সা জাল বোনে তার অরক্ষিত হৃদয়ের কোণাঘুঞ্চিতে, এই উপন্যাসে জানালার দেখা আমরা বার বার পাই। জানালা আসে প্রতীকরূপে, আসে গবাক্ষ হিসাবে। মফস্বলের মেয়েরা জানালা পথে আকাশ দেখে, জনচলাচল দেখে। এমাও দেখতো। কিন্তু এমা বোভারী ওইখানে থাকতে চাইলো না, সে দরজা খুঁজলো, পালাবার দরজা। গোপনে শুরু করলো ব্যভিচার। ভাবলো তাতেই পাবে মুক্তি। এ-কাজ নিশ্চয়ই আরো অনেকে করে, কিন্তু তারা ধরা পড়ে না। এমা পড়লো। সমাজের হাতে নয় নিজের বিবেকের হাতেও নয়, ধরা পড়লো অর্থনৈতিক শৃঙ্খলের হাতে। ঋনের দায়ে আসামি হয়েছে, একেবারে দেউলিয়া হয়ে গেছে। কিন্তু নৈতিকভাবে নয়, অর্থনৈতিকভাবেই শুধু, নৈতিক বিচারে নিজেকে সে অপরাধী মনে করেনি, শেষ মুহূর্তেও নয়, শেষ মুহূর্তেই তো তার যথার্থ পলায়ন, সমস্ত ব্যর্থতা ও বেদনার হাত থেকে।
স্বামীর উপার্জন সামান্য, এমার নিজের কোনো আয় নেই, কিন্তু খরচ করে সে দু’হাতে, টাকা ধার নেয় কুসুদজীবীর কাছ থেকে, শোধ করতে অপরাগ হলে নোটিশ আসে আদালত থেকে সমস্ত অস্থাবর সম্পত্তি নিলাম হয়ে যাবে, দেনার দায়ে। এমা তখন প্রায় উন্মাদিনী, টাকার খোঁজে বের হয়ে দেখে কেউ দেয় না। না প্রেমিক, না ব্যবসায়ী, না অন্য কেউ। পারতো, আত্মসমর্পণ করতে পারতো স্বামীর কাছে, স্বামী তাতে ভেঙে পড়তো, তাকে জড়িয়ে ধরে ভেউ ভেউ করে কাঁদতো, হয়তো গালমন্দও করতো, তবু উপায় একটা হতোই, কেননা স্বামীর কাছে এমা ছিল স্বর্গের দূত, অলৌকিক আশীর্বাদ। কিন্তু যে-স্বামীকে সে মনে প্রাণে ঘৃণা ও অবজ্ঞা করে তার কাছে নত হবে কী করে? অন্য যে কারো কাছে হাত পাততে প্রস্তুত ছিল এমা বোভারি, এক স্বামীর কাছে ছাড়া। সাহসী এমা সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটা দিলো জীবন-সায়াহ্নে। এবার সত্যি সত্যি পালালো। চলে গেলো সেখানে যেখানে ব্যর্থতা নেই, বঞ্চনা নেই, প্রতারক পুরুষেরা নেই। এমা বোভারী ধিক্কার দিয়ে গেছে পুরুষতন্ত্রকে, তার সময়ে যে-পুরুষতন্ত্র রূপ নিয়েছিল পুঁজিবাদের। পুরুষই তাকে স্বপ্ন দেখিয়েছে এবং সেই স্বপ্ন অর্জন করতে চাওয়ার অপরাধে শাস্তি দিয়েছে। এমার প্রতিপক্ষ কোনো নারী নয়, একাকী কোনো পুরুষ নয়, তার প্রতিপক্ষ একটি বিশেষ আর্থ-সামাজিক সংগঠন যাকে সামাজিক বিপ্লবের সাহায্যে ভেঙে ফেলা যায়, কিন্তু যা থেকে ব্যক্তিগতভাবে পলায়ন প্রায় অসম্ভব, বিশেষ করে সে-ব্যক্তি যদি হয় নারী।
 ‘মাদাম বোভারী’ ফ্লবেয়ারের প্রথম উপন্যাস, পাঁচ বছরের নিরবচ্ছিন্ন শ্রমে লিখিত। প্রথম যখন পত্রিকায় বের হয় তখনি চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে, আদালতে অভিযুক্ত হয়েছিল অশ্লীলতা ও  ধর্মবিরুদ্ধতার অভিযোগে, সে-অভিযোগ টেকেনি যদিও, কিন্তু আরেকটি অভিযোগ রয়েই গেছে, এমনকি তাঁদেরও কেউ কেউ করেছেন যাঁরা এ-বইয়ের অসামান্য শিল্পগুণে  আকৃষ্ট হয়েছেন। বলেছেন, এর নায়িকা খুবই সামান্য মেয়ে, ফ্লবেয়ার তাঁর শিল্পমণীষার অপচয় ঘটিয়েছেন, দান করেছেন অপাত্রে। এ বিষয়ে ঔপন্যাসিক নিজে যে অবহিত ছিলেন না তা নয়, সজাগ ছিলেন তিনিও, তাঁরও আশঙ্কা ছিল যে, রচনাটি যদি সুন্দর ও হয় তবু এর বিষয়বস্তুটি অসুন্দরই রয়ে যাবে।
তা ঠিক। ফ্লবেয়ার যে-ছবিটি দিচ্ছেন সেটি ঊনবিংশ শতাব্দীর ফরাসী দেশে পেটি বুর্জোয়াদের জীবন যাপনের, সেখানে সৌন্দর্যের বড়ই অভাব। সে দেশের একটি সামাজিক বিপ্লব ঘটেছিল, ১৭৮৯তে, যার ঘোষিত লক্ষ্য ছিল সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা। সাম্য ও মৈত্রী আসেনি, স্বাধীনতা এসেছিল, তাও বুর্জোয়াদের। রাষ্ট্রক্ষমতা চলে গেলো তাদের হাতে, তারাই অনুকরণীয় হলো। ওপরে বুর্জোয়া, নিচে পেটি বুর্জোয়া, পেটি বুর্জোয়ারা বড় পুঁজির মালিক নয়, তারা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, ছোটখাটো খামারে মালিক। মফস্বলের পেটি বুর্জোয়াদের নিয়ে এই উপন্যাস, এতে পরকীয় প্রেম আছে, কিন্তু সে-প্রেম-এর আসল ব্যাপার নয়, আসল ব্যাপার বিবাহ, এমা বোভারী ওই সমাজের একজন বিবাহিত মহিলা। তার স্বপ্নের কোনো অসাধারণত্ব নেই, যেমন অসামান্যতা নেই তার কথোপকথনে।
এমা পেটি বুর্জোয়াদের প্রতিনিধি, কিন্তু তাই বলে নায়িকা হবার জন্য অনুপযুক্ত নয়। ফ্লবেয়ার তাকে অগ্রহণযোগ্য তো মনে করেনইনি, উপরন্তু বলেছিলেন, ‘আমিই মাদাম বোভারী, অন্তত আমি সে-রকমই মনে করি।’ ঠাট্টা করে বললেন কি? না, তা নয়। ওই কাহিনীর পেছনে রক্তমাংসে কোনো নারী আছে কিনা পাঠকের এই উৎসুক গোয়েন্দাগিরিকে নিবৃত্ত করবার জন্য যে বলেছিলেন এমনও নয়। বলার কারণ অন্য, সে তাঁর সহানুভূতি। ফ্লবেয়ার অন্য অনেক ঔপন্যাসিকের তুলনায় অধিক নিস্পৃহ। টলস্টয়ের তুলনাতেও। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ যে, তিনি ভাবাবেগকে প্রশ্রয় দেন না, নৈর্ব্যক্তিকতায় পাছে টোল পড়ে তাই দূর থেকে দেখেন। আমিই মাদাম বোভারী এই দাবিটা করতে গিয়ে যোগ করেছিলেন, ‘এই মুহূর্তে ওই হতভাগিনীর কম পক্ষে বিশ জন ভগ্নি ফরাসী দেশের গ্রামে গ্রামে ক্রন্দন করছে।’ ফ্লবেয়ারের আপন বোন মারা গিয়েছিল সন্তান জন্ম দেবার অল্প পরে। বিবাহিত অন্য মেয়েদের দুঃখও তিনি জানতেন। এমা একাকিনী নয়, সে অনেকের একজন; মফস্বলবাসিনী পেটি বুর্জোয়া স্ত্রীদের প্রতিনিধি। ওই সমাজে বিবাহ কেমন প্রাণঘাতী হতে পারে ফ্লবেয়ার তা জানতেন। নিজে তিনি বিয়ে করেননি। ভয়ে। কিন্তু কেবল প্রতিনিধি পরিচয়ে নয়, একক হিসেবেও এমাকে ফ্লবেয়ার আপনজন মনে করেছেন। এর একটি বিশেষ কারণ ছিল।
 
সেটা এই যে, এমার মধ্যে যেমন আরো অনেক আছে, ফ্লবেয়ারের নিজের মধ্যেও তেমনি একজন এমা রয়েছে। তিনিও এই সমাজেরই লোক, যে শহরে এমা গিয়েছে প্রথমে লেখাপড়া শিখবে বলে ও পরে পরকীয় প্রেমের প্রয়োজনে সেখানেই ফ্লবেয়ারের জন্ম, তাঁর শৈশবও ওই শহরেই কেটেছে। তিনিও এমার মতোই রোমান্টিক। উপন্যাসে এমার ডাল কুকুরের ছবি আছে। কুকুরটি হলুদ প্রজাপতির পেছনে ছোটাছুটি করতো, ধরতে চাইতো। সারমেয়টির জন্য এ ছিল খেলা, প্রজাপতির জন্য মৃত্যুর শঙ্কা। এই বিবরণ রূপক হিসেবে এমার সাথে তার পরিবেশের সম্পর্কের প্রতীক হলেও হতে পারে, ফ্লবেয়ারের নিজের দৃষ্টিতে এটিকে তাঁর সঙ্গে তাঁর নিজের পরিবেশের সম্পর্কের প্রতীক বললে অত্যুক্তি করা হবে না। ওই প্রজাপতিটির পক্ষে ঘাতক কুকুরটিকে যেমন ঘৃণা করবার কথা, ফ্লবেয়ার তেমনিভাবে বুর্জোয়াদেরকে ঘৃণা করতেন, তা তাদের পরিধানে পেটিকোটই থাকুক কিংবা কোট। তফাৎ অবশ্যই ছিল। বড় তফাৎ তিনি হলেন শিল্পী, তাঁর মুক্তি শিল্পকর্মে; এমা একজন স্বল্পশিক্ষিতা গৃহবধূ, সে মুক্তি খুঁজেছে তথাকথিত প্রেমে। এমার রোমান্টিকতা তরলমতি বালিকার ভাবালুতা মাত্র, আর ফ্লবেয়ার তার অন্তর্গত রোমান্টিকতা সম্পর্কে খুবই সচেতন ছিলেন, তাকে তিনি দমন করেছেন, উপন্যাসটি যে লিখেছেন কবির হাতে নয়, চিকিৎসাবিদের বৈজ্ঞানিক হাতে। কিন্তু এমাকে তিনি পরির দেখতে পেয়েছেন, নিজেকে দেখেই।
এমার যে গুণ নেই তা নয়। ব্যক্তিত্ব আছে, গুণও রয়েছে। তার সঙ্গে অন্য পাঁচটি নর-নারীর ব্যবধান যেমন পরিমাণগত, তেমনি গুণগতও বটে। স্বামী তো অবশ্যই, প্রেমিক দু’জনও তাকে স্বর্গীয় বলে ডাকতো। স্বামী বিশ্বাস করতো যে, এমাকে পেয়ে তার আর কিছু চাইবার বাকি নেই। তার স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে এমার মৃত্যুর পরে, এমার লুকিয়ে-রাখা কাগজপত্র পড়ে। তার জন্য তখন আর দাঁড়াবার কোনো জায়গা রইলো না। চার্লস বোভারী বৈষয়িকভাবে ইতিমধ্যেই দেউলিয়া হয়ে গেছে, এবার হলো মানসিকভাবে। বেচারা আগেও কেঁদেছে, কিন্তু এবার যে-কান্না তাতে আর কোনো সান্তনা নেই। সামলে উঠতে পারেনি, ক’দিন পরেই মারা গেছে। ওদিকে এমাকে যে দেখে সে-ই ফিরে তাকায় কনভেন্টে-পড়া মেয়ে; গান বাজনা ছবি আঁকা সূচিকর্ম-সবই জানে। পারে নাচতেও। ইয়নভিলের একমাত্র ঔষধালয়ের জগতাভিজ্ঞ মালিক বাড়িয়ে বলেনি যখন বলেছে যে, ইনি জেলা শাসকর্তার স্ত্রী হলে নিতান্ত বেমামান হতেন না। তদুপরি এমা হচ্ছে স্বাপ্নিক। তার স্বপ্নের বিষয়বস্তু অবশ্য খুবই সামান্য, ভাবে বড় শহরে থাকবে, তার স্বামী হবে সিংহের মতো প্রবল অথচ মেষশাবকের মতো নরম, কল্পনা করে সে বাস করছে দূর সমুদ্রের দূরবর্তী কোনো দ্বীপে, সঙ্গে আছে প্রেমিক। আত্মনির্ভর নয় সে; স্বয়ংসম্পূর্ণ কখনোই হবে না, ওইখানে প্রকৃতিগত তফাৎ তার, ফ্লবেয়ারের সঙ্গে। এমা কেবলি ছটফট করে, একেবারেই অস্থির, খাঁটি পেটি বুর্জোয়া সেদিকে থেকে; বোঝা যায় সে নিতান্তই বন্দী। প্রায়ই সে কাঁদে, নির্জনে। ফ্লবেয়ারও কাঁদতেন, লিখতে না পারলে। সেই কান্না ভিন্নতর। তবু এমা নায়িকা হবার যোগ্য বটে, একাধারে সে প্রতিনিধি এবং ব্যতিক্রম। ফ্লবেয়ার তাঁর নিজের রোমান্টিকতাকে শক্ত হতে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। ভয় পেয়েছেন, পাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়। খ্যাতিমান চিকিৎসকের পুত্র তিনি, এমাকে, সেভাবেই দেখেছেন, চিকিৎসা করবেন বলে নয়, যথার্থরূপে উপস্থিত করবেন বলে। তাঁর গদ্যরীতি পুরোপুরি গদ্য লক্ষণাক্রান্ত, তাঁর বাস্তবতাবোধ ভুবনবিখ্যাত, কিন্তু তিনি যখন উপমা ব্যবহার করেন কিংবা সাহায্য নেন প্রতীকের, ভাষার মধ্যে প্রবহমান রাখেন সঙ্গীতের গতিময়তা, বোঝা যায় তখন তিনি দু’দিকেরই, বিজ্ঞানের যেমন কাব্যেরও তেমনি। ভারসাম্য রেখে চলেন। তাঁর এমা তা করতে পারেনি, সে-হতভাগিনী ঝুঁকে পড়েছিল স্বপ্নের দিকে। সেজন্যই বিপদ হয়েছে। আকাশে উড়তে গিয়ে ডানা ভেঙে পড়ে গেছে কর্দমে। মারা গেছে। ফ্লবেয়ার মাদাম বোভারীকে বোঝেন, এমা কাউকে বোঝে না, নিজেকেও না।

উপন্যাসের কাহিনীটি সাদামাটা। এমা রুঁয় ফরাসী দেশের এক সচ্ছল কৃষকের একমাত্র কন্যা। মেয়েটির একটি ভাই ছিল, মারা গেছে, তাই সে পিতামাতার একমাত্র জীবিত সন্তান। বাবা-মা তাকে ভর্তি করে দিয়েছে জেলা শহরের এক কনভেন্টে। তের বছর বয়সে। সেখানে ক্যাথলিক সন্ন্যাসিনীরা থাকে। তারাই শিক্ষিকা। এই আবাসটি পিউটিানদের নয়, ক্যাথলিকদের। খৃস্ট ধর্মের এই দুই ধারার মধ্যে পার্থক্যটা বড়, সামান্য নয়। পিউরিটানদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে নয়, ব্যক্তিগত বিবেকই প্রধান; ক্যাথলিকদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে মূল্য আছে। তাদের গীর্জা সুসজ্জিত, মূর্তিশোভিত, ছায়াছন্ন। ইন্দ্রিয়কে একই সঙ্গে সজাগ ও সম্মোহিত করে।
এমার নিজের মধ্যে একটা ইন্দ্রিয়বাদিতা ছিল। তার ঠোঁট দুটো লক্ষ্য করবার মতো, অনেক সময় ঠোঁট দুটো সে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে। সন্ন্যাসিনীদের মঠে আধ্যাত্মিকতার তুলনায় ইন্দ্রিয়বাদিতাই বেশি করে টেনেছে তাকে। গীর্জার ভেতরে সঙ্গীত, সুগন্ধি, ধূপধুনা, ফুল, যীশুর মূর্তি, কাচের রঙ-সবকিছু তাকে উৎসাহিত করেছে একটি অস্পষ্ট সৌন্দর্যলোকের কথা ভাবতে। প্রার্থনা ও ধর্মানুশীলনের মধ্যে বিবাহ, অলৌকিক প্রেম, পরিপূর্ণ নিবেদন এসব উপমা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলতো। ছাত্রী হিসেবে সে ছিল চটপটে, পুরস্কার পেতো-নিয়মিত, কিন্তু তার আগ্রহ ছিল না নিয়মানুবর্তিতায়। প্রতিমাসে একবার একজন অবিবাহিতা প্রাচীনা আসতেন ওই কনভেন্টে। থাকতেন এক সপ্তাহ, তাঁর কাজ ছিল মেয়েদের জামাকাপড় সেলাই করে দেয়া। অভিজাত বংশের মনে হতো তাঁকে। অবসর সময়ে গান গেয়ে শোনাতেন। প্রেমের গান, প্রাচীন কালের। সঙ্গে আনতেন হাল্কা ধরনের উপন্যাস। তাতে প্রেম ও প্রেমিকদের ছড়াছড়ি, সুন্দরী নায়িকাদের কাতর তৎপরতা। সেসব বই মেয়েদেরকে তিনি পড়তে দিতেন। ছাত্রী জীবনে এমার ভাবালুতা তাই ক্রমাগত উস্কানি পেয়েছে। পরিবার বলতে ছিলেন বাবা ও মা। তা মা মারা গেলেন ওই সময়েই। এমা যখন ঘরে ফিরেছে সংসারে তখন সে এবং তার বাবা, এই দুটি প্রাণী। বাবা স্বল্পশিক্ষিত কৃষক, কৃষিজীবনে এমার ভীষণ অনীহা। হালের পশুর হাম্বা রব, মাঠের সার, ফসল এসব দেখে আরো বিরক্ত হয়েছে। ঘরে ফিরে কনভেন্টের কথা মনে পড়েছে, যেমন কনভেন্টে থাকতে মনে পড়তো ঘরের কথা। অস্থির লাগে। ভেতরে তার বস্তুর অভাব, শ্রমীজীবদের সঙ্গে মিশতে পারে না, ওপরতলায় উঠবে যে সে-উপায় নেই। তার সঙ্গের ছাত্রী ধনী ঘরের মেয়েদের নিশ্চয়ই ভালো ভালো বিয়ে হয়েছে, সে তাদের চেয়ে খাটো নয়, অথচ পড়ে আছে এখানে। সে তো ভিন্ন জীবনের দাবিদার।
ওদিকে এমার অজান্তে একটি যুবক প্রস্তুত হচ্ছিল তাকে বিয়ে করবার জন্য। ওই তরুণের কথা দিয়েই উপন্যাসের শুরু। খুবই সামান্য সে। তাকে মনে রাখা কঠিন, তার সহপাঠীরা অনেকেই তাকে মনে রাখেনি। এমা যে-শহর পড়েছে, চার্লস বোভারীর লেখাপড়াও সেখানেই, আবাসিক স্কুলে। বোভারী শব্দটির বুৎপত্তি পাওয়া যাবে ল্যাটিন অভিধানে, মূল শব্দটির অর্থ গাভী, গাভী নয় ষাঁড়। চার্লসের পিতা অবশ্য অন্য স্বভাবের, কিন্তু চার্লস নিজে গাভীর মতোই। শান্ত, প্রায়-নির্বোধ এবং নিরীহ।
চার্লসের মা তাতে ভর্তি করে দিয়েছিলেন মেডিকেল কলেজে। প্রথমবার পাস করতে পারেনি, পরের বছর খুব করে প্রশ্নোত্তর মুখস্থ করে কোনোমতে পাস করলো এবং চাকরি পেলো চিকিৎসক হিসেবে, পাশের ছোট্ট গ্রাম্য শহরে। মা-ই দিয়েছেন যোগাড় করে। একটি স্ত্রীও যোগাড় করে দিলেন তিনিই। ৪৫ বছর বয়ষ্কা একজন রুগ্না বিধবার স্বামী হয়ে গেলো তরুণ চার্লস বোভারী। চৌদ্দ মাসের মধ্যেই অবশ্য ওই বিবাহিত জীবনের অবসান ঘটেছে, চার্লস তার স্ত্রীকে হারিয়েছে। অব্যাহতি পেয়েছে বলা যায়। মহিলা দুঃসহ হয়ে উঠেছিল, বোভারী পরিবারে জন্য। যে-টাকার জন্য তাকে আনা সে-টাকা পাওয়া যায়নি, উকিল সাহেব হাতিয়ে নিয়ে চম্পট দিয়েছে। ওই স্ত্রী আবার কর্তৃত্বপরায়ণও ছিল। এই চার্লসের সঙ্গে এমার পরিচয় এমাদের বাড়িতে। সেখানে চার্লস গিয়েছিল চিকিৎসক হিসেবে, এমার পিতার চোট-খাওয়া পা সারাতে। চার্লসের প্রথম স্ত্রী তখনো জীবিত। রোগী সেরে উঠলো, কিন্তু চার্লসের যাতায়াত থামে না; ওই বাড়িতে এক যুবতী কন্যা আছে শুনে স্ত্রীর হৈচৈও থামে না।
 সে-যাই হোক, চার্লসের রুগ্না স্ত্রী পরলোকে গমন করে চার্লসকে অব্যাহতি দিয়ে গেলো। এবার চার্লসের ইচ্ছা এমাকে বিয়ে করে। এমার বাবারও সেটাই চান। মেয়েটি সংসারের কোনো কাজে লাগে না, সর্বক্ষণ বিষন্ন থাকে, বিয়ে হয়ে গেলে বাঁচেন। এমা রাজি হলো। ভেবেছে নিশ্চয়ই যে মন্দ কী, এর চেয়ে ভালো পাত্র কোথাই বা পাওয়া যাবে? বিয়ের পরপরই বুঝেছে এমা যে, কাজটা ঠিক হয়নি। চেয়েছিল অনুষ্ঠান হবে মধ্যরাতে, মশাল জ্বালিয়ে, গল্প-উপন্যাসে যেমনটা হয়। কিন্তু বিয়ে হলো দিনের বেলায়, গ্রাম্য আত্মীয়স্বজন নিয়ে, খুবই সাদা মাটাভাবে। তারপর স্বামী গৃহে যাত্রা এবং আরো বড় রকমের আশাভঙ্গ হওয়া। ছোট্ট পুরনোবাড়ি। অগোছোলাে। শোবার ঘরে চার্লসের প্রথম স্ত্রীর বিবাহে-ব্যবহৃত ফুলের তোড়া। শুকনো। হাত দিলে কাঁটা ফোটে। এমা চেষ্টা করেছিল মনোযোগ দিতে, সংসার কর্মে; কিন্তু মন বসে না। এমা বোভারী স্বপ্ন দেখে রাজকুমারের, অথচ পেয়েছে সে এমন একজন পাড়াগেঁয়ে ডাক্তারকে যে অভিপ্রত্যুষে ঘোড়ায় চেপে বের হয়ে যায, বিগত রাত্রিতে স্ত্রী-সঙ্গসুখের স্মৃতিকে রোমান্থিত করতে করতে; ফেরে সেই মধ্যরাতে, রোগী দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে। ঘামে ভেজা থাকে তার শরীর, ঘুমায় যখন তখন নাক ডাকে।
এর মধ্যে ব্যতিক্রম ঘটলো একদিন। ধনাঢ্য এক জমিদার তার মুখের ফোঁড়ার চিকিৎসা করিয়েছিলেন চার্লসকে দিয়ে, সেই সূত্রে পরিবারের সঙ্গে পরিচয়, এমাকে দেখে মনে হয়েছে তাঁর যে, এ-মেয়ে বেমানান হবে না তাঁর বাড়ির নাচের অনুষ্ঠানে। তদুপরি ভদ্রলোকের ছিল রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ, যে জন্য তিনি জনসংযোগে নেমেছিলেন। জমিদারের কুঠিতে মধ্যরাতের উৎসবে অভ্যাগত চার্লসকে কারো চোখে পড়েনি, এমাকে যে চোখে পড়েছে তাও নয়, তবে এমা
নেচেছে সানন্দে এবং মনে হয়েছে তার যে, এই জগতে বেমানান নয় সে মোটেই।
ফেরার পথে এমা বোভারীর মন খারাপ। কোথায় যাচ্ছে ফিরে? প্রতীক্ষায় থেকেছে আবার কবে নিমন্ত্রণ আসে; কিন্তু আসেনি। চার্লস এসব বোঝে না, সে শরীর বোঝে, মন বোঝে না, স্ত্রীর স্বাস্থ্যহানি ঘটছে দেখে ঠিক করলো হাওয়াবদল আবশ্যক। খোঁজ খবর নিয়ে পাশেরই  আরেক গ্রাম্য শহর ইয়নভিলে চলে যাবে ঠিক করলো।
ইয়নভিল আগের শহরটির চেয়ে ভিন্ন নয়। রাস্তা একটাই। ওখানকার লোকের মুখের ভাষার মতোই ক্ষেতের কৃষিও বৈশিষ্ট্যহীন। অনুর্বর। প্রধান ব্যক্তিদের একজন হচ্ছে ওষুধের দোকানদার, যার সঙ্গে যোগাযোগ করে চালর্স এসেছে এখানে। লোকটির সদন ছিল না, তবু সে নিজেই চিকিৎসা করতো, কিন্তু সরকারি দপ্তরের ধমক খেয়ে এখন সংযত হয়েছে। আগের শহরে চার্লস বোভারীর যে পসার ছিল, সেটা  গুটিয়ে এসে এখানে নতুন রোগী পাওয়া সহজ হলো না। ইতিমধ্যে এমা সন্তান সম্ভবা হয়েছে এবং সবকিছু তার কাছে ভীষণ একঘেয়ে মনে হচ্ছে। স্বামী আরো স্থূল হচ্ছে, তার গাল ফুলছে, চোখ যাচ্ছে বসে।
এখানে এক যুবকের সঙ্গে এমার পরিচয়। ছেলেটি প্রধান উকিলের শিক্ষানবীশ মুহুরি। এমার প্রতি তার আকর্ষণ আছে, কিন্তু সাহস নেই সেটা প্রকাশের। এমাও এগোয় না, তবে সে ওকে দূর থেকে দেখে; কাছে পেলে খুশি হয়। স্বামী ধরে নিয়েছে স্ত্রী সুখেই আছে, যে-ধরে নেয়াটা অপমানজনক ঠেকে স্ত্রীর কাছে। এমা গীর্জায় গিয়েছিল একদিন, পুরোহিতকে বলেছে, আমি সুস্থ নই। লোকটার চিকিৎসা করবার কথা এমার মনের, সে ভেবে বসলো অসুখটা এমার দেহের, পরামর্শ দেয় বাসায় ফিরে চা খাবার, নয়তো এক গ্লাস সরবত। এমা ভাবে প্যরিসের কথা। মুহুরির সঙ্গে গল্প করে দূরপাল্লার সেই শহরের। গান গায়। কিন্তু আবার ছেড়ে দেয়, কাকে শোনাবে? ছবি আঁকে, কিন্তু কার জন্য? সেলাই করে, কতক্ষণ আর করা যায়। সর্বক্ষণ নিজের কথাই ভাবে সে। ভাবে এবং ক্লান্ত হয়।
 আশা করেছিল তার একটি পুত্র সন্তান হবে, ভবিষ্যতে যে শোধ নেবে মায়ের বর্তমান ব্যর্থতার। কিন্তু জন্ম হলো কন্যার। খবরটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে এমা অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। মেয়ের নাম দিয়েছে ব্রেত, নামটি শুনেছিল সে জমিদার বাড়ির সেই নিত্যানুষ্ঠানে, কিন্তু সন্তানকে তার সুন্দরী মনে হয়নি, বরঞ্চ ঠেকেছে ভীষণ কুৎসিৎ। উকিলের হুমরিটির সঙ্গে আলাপ চলতো বইপত্র নিয়ে, কিন্তু সেও একদিন চলে গেলো প্যারিসে, আইন পড়বে বলে। এমার নিঃসঙ্গতা আরো বাড়ে। সে বড়াই করে নিজের সততা নিয়ে, লেবু দিয়ে আঙুল ঘষে, কাশ্মীরী কাপড়ের জামা কেনে, বিদেশি ভাষা শেখে, কঠিন কঠিন বই পড়ে, চুলের বিন্যাস বদলায়, কিন্তু সবকিছুই সাময়িক, এবং তাৎক্ষণিক, মোটেই স্থায়ী নয়। এমা কাঁদে। স্বামীও কাঁদে, না-বুঝে। এর মধ্যে একদিন এক ভদ্রলোক এসে হাজির, এক রোগীকে নিয়ে। পাশের গ্রামে থাকে, অবস্থা ভালো, জায়গাজমি আছে, অবিবাহিত, বয়স ৩৪। রমণীমোহন। তবে নিষ্ঠুর। এমাকে তার চোখে লেগেছে। সুন্দর দাঁত, কালো চোখ, হাল্কা পা, কাঠামোটা প্যারিসের মেয়েদের মতো। এমাকে সে বিবস্ত্র করলো। মনে মনে। ওই মোটা নির্বোধ লোকটা এ-মেয়েকে পেলো কোথায়? যেভাবেই পাক, যুবতী যে ডাঙার মাছের মতো হাঁপাচ্ছে তা বোঝা যায়। একে হস্তগত করা চাই। তা না হয় গেলো, কিন্তু পরে অব্যাহতি পাওয়া যাবে তো? ভদ্রলোকের তখন সম্পর্ক চলছে একজন অভিনেত্রীর  সঙ্গে, যাকে বিরক্তিকর মনে হচ্ছে। ঠিক করলো এমার দিকে সে হাত বাড়াবে।
সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। সেটা পাওয়া গেলো। ওই এলাকার বার্ষিক কৃষি প্রদর্শনী সেবার বসেছে ইয়নভিলে। হৈহৈরৈরৈ ব্যাপার! এ উৎসবে পশু, পশুপালক, কৃষক সবাইকে পুরস্কার দেওয়া হবে। বিচারকদের একজন হচ্ছে রদলফ, ওই দক্ষ শিকারি। সে ঠিক করেছে সুযোগটা নেবে। তাই নিলো, সরাসরি এমাকে থামালো, পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলো তাকে পুর ভবনের দোতলায়। সেখানে চেয়ার নিয়ে বসেছে তারা দু’জন। নিচে পুরস্কার দেওয়া হবে। বিচারকদের একজন হচ্ছে রদলফ, ওই দক্ষ শিকারি। নিচে পুরস্কার ঘোষণা ও সরকারি লোকদের আন্তরিকতাহীন বাকবিস্তার চলছে, আর দোতলায় কথার ফুলঝরি ফোটায় রদলফ। ভাগ্যের কথা বলে, করে প্রেমের বয়ান। উদ্দেশ্য একই, প্রতারণা।
রদলফ পাকা খেলোয়াড়। ছয় সপ্তাহ সময় দিলো পরিপক্ক হতে। ধরে ফেলেছে সে কোথায় এমার দুর্বলতা, কোনখানে তার হাহাকার। পরিকল্পনা মতো এসে হাজির হয়েছে। স্বামী রদলফকে বলেছে এমার স্বাস্থ্যভঙ্গের কথা, রদলফ বলেছে ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতে বের হলে উপকার হবে, স্বামী লুফে নিয়েছে প্রস্তাব। ঘোড়া রদলফই দিলো, এবং এমাকে। নায়িকা ও সঙ্গী বের হলো ভ্রমণে। নিয়ে গেছে বনে, সুযোগ তৈরি করেছে এমন যাতে এমার পক্ষে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনে অসম্মত হবার উপায় থাকেনি।
ভ্রমণ শেষে এমা ফিরলো উল্লসিত হয়ে। বহু উপন্যাসে অবৈধ প্রেমের বর্ণনা পড়েছে সে। নিজেকে মনে হয়েছে ওই নায়িকাদের বান্ধবী। অবিশ্বাস্য বাপার। ‘আমি একজন প্রেমিক পেয়েছি, প্রেমিক পেয়েছি’, এমা বলতে থাকে, মনে মনে। এরপরে এমা আর কোনো দ্বিধা রাখেনি। প্রেমিকের সঙ্গে মিলিত হয়েছে ঘনঘন। চিঠির আদানপ্রদান চলেছে। মিলন ঘটেছে স্বামীর গৃহেই। পরে, খুব সকালে, স্বামী জাগবার আগে, এমা ছুটে গেছে দায়িতের কাছে, ঘুম থেকে তুলেছে তাকে এবং ফিরে এসেছে কম্পিত দ্রুত পদক্ষেপে।
এক সময়ে রদলফ দেখে বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। এমার যা দেবার ইতিমধ্যেই দিয়ে ফেলেছে, এখন আচরণ করছে নির্বোধের মতো। এমারও মনে হচ্ছিল কাজটা ক্লান্তিকর হয়ে উঠছে, ঠিক হচ্ছে কিনা তাও সন্দেহ। বাবার কাছ থেকে চিঠি এসেছে, দুর্বল ভাষায় কিন্তু বড় খাঁটি অনুভূতি, গৃহস্থবাড়িতে ঝোপঝাড়ের ভেতর থেকে যেমন মুরগির ডাক শোনা যায় তেমনি বেজে উঠেছে শুভেচ্ছা। এমা ভাবছিল ক্ষান্ত হবে।
কিন্তু এই সময়ে ঘটে গেলো মারাত্মক এক ঘটনা। কেউ মরলো না বটে, কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটিকে গলা টিপে-মেরে রেখে গেলো। ব্যাপারটার জন্য চার্লস বোভারী দায়ী নয়, কিন্তু সব দায়-দায়িত্ব গিয়ে পড়লো তারই দুর্বল কাঁধে, বিশেষ করে এমার দৃষ্টিতে। ঘটনাটা এই যে, ইয়নভিলের একমাত্র সরাইখানাটিতে একজন কর্মচারী ছিল, যার একটি পা বাঁকা। ওই পা নিয়ে তার কোনো অভিযোগ ছিল না, কিন্তু ওষুধওয়ালা ব্যস্ত বাগিশ হোমের মনে হলো ওর পাটা সারানো দরকার, সারাবে চার্লস; তাতে ডাক্তারের পসার বাড়বে, ওষুধওয়ালার বাড়বে বিক্রি,  ইয়নভিল চলে যাবে চিকিৎসাশাস্ত্রের ইতিহাস এবং সে-কৃতিত্বের অংশ হোমের ভাগ্যেও জুটে যাবে, কেননা চিন্তাটা তার মাথাতেই এসেছে প্রথম। এসেছে পত্রিকায় একটি লেখা পড়ে, সে-লেখায় বাঁকা পা-সারানোর এক নতুন শল্যচিকিৎসার বিবরণ ছিল।
 না, চার্লস বোভারি রাজি ছিল না। একেবারেই নয়। সে তার নিজের দৌড় জানে। ভাবতেই ভড়কে গেছে। কিন্তু ওষুধয়ালা ছাড়ে না, তার সঙ্গে যোগ দিলো স্ত্রী এমা। এমার লোভ হয়েছে তার স্বামী খ্যাতবান হবে, নানা মহলে আলোচিত হবে, নাম বেরুবে কাগজে, একডাকে চিনবে সবাই, সারা দেশে। চার্লস যেমনটা আশঙ্কা করেছিল তেমনটাই ঘটলো। ঘটা করে কাটাছেঁড়া করা হলো তাতে সমস্ত শহর অংশ নিলো, উত্তেজিতভাবে। রোগী তার যন্ত্রণা সহ্য করতে বাধ্য হলো, কান্নাকাটি সত্ত্বেও। কিন্তু ক’দিন পরেই দেখা গেলো ছেলেটির  চীৎকার থামে না।  জেলা শহর থেকে চিকিৎসক এলো। সে বললো পায়ে পচন ধরেছে, কেটে বাদ দিতে হবে। তাই করা হলো। পা-কাটার দিন আতঙ্কিত চার্লস ঘরের ভেতরে বসে ছিল, অপরাধের সমস্ত বোঝা ও গ্লানি মাথায় নিয়ে। রোগীর আর্তচীৎকারে সারা শহর বিদীর্ণ হয়েছে, বুক ফেটে গেছে চার্লসেরও। স্ত্রীর কাছে অশ্রুসিক্ত স্বামী সান্তনা আশা করেছিল, কিন্তু হাত দিয়ে স্ত্রীকে স্পর্শ করা মাত্র স্ত্রী বিদ্যুতের মতো জ্বলে উঠেছে। ঘৃণায়। সে-রাতে রদলফ যখন এলো এমা তখন ঝাঁপিয়ে পড়লো তার বুকে। আক্ষরিত অর্থেই। এরপরে এমা আর কোনো সঙ্কোচ রাখেনি। কার জন্য সৎ থাকবে? ওই অপদার্থ স্বামীর জন্য? ঘৃণার সঙ্গে মিলেছে এসে প্রতিহিংসাপরায়ণতা, রদলফের কাছে এমা উজাড় করে দিতে চেয়েছে নিজেকে। আঁকড়ে ধরেছে তাকে উদ্ধারকর্তা হিসেবে। বলেছে চলো আমরা পালাই। সন্তানের কী হবে? রদলফ জানতে চেয়েছে, স্বভাবতই। সরলা এমা বলেছে, কেন, সঙ্গে নেবো। রদলফ গেছে ভয় পেয়ে। এতসব দায়িত্ব সে কেন নিতে যাবে? রাত জেগে এক চিঠি লিখলো সে এমাকে, মিথ্যা ও মিষ্টি সব কথা দিয়ে, তারপরে যেদিন এমাকে নিয়ে পালানোর কথা সেদিন নিজেই গেলো পালিয়ে। চিঠি পড়ে স্বাভাবিক থাকা কঠিন হয়েছিলো এমার পক্ষে। সর্বক্ষণ কাঁদে, কখনো মূর্ছা যায়। একটানা ৪৩ দিন ধরে জ্বরে ভুগেছে, প্রলাপ বকেছে। সেরে উঠেছে খুব ধীরে ধীরে। চার্লস নীরবে যত্ন করেছে তার স্ত্রী, অন্যসব দায়-দায়িত্ব ভুলে।
পরামর্শটা আবারো ওষুধওয়ালা হোমেই দিয়েছিল। মাদামকে শহরে নিয়ে যান, রঙ্গমঞ্চে নাটক দেখান, ওঁর বিনোদন দরকার, চার্লসকে বলেছে সে। বিপন্ন চার্লস স্ত্রীর জন্য যা দরকার সবকিছু করতে প্রস্তুত। স্ত্রীকে নিয়ে ছুটলো জেলা শহরে, যেখানে সে পড়াশোনা করেছে বটে কিন্তু কোনো দিন রঙ্গালয়ে ঢোকেনি। মঞ্চের নাটক দেখতে গিয়ে ওই দিন মঞ্চের বাইরে আরেকটি নাটকীয় ঘটনা ঘটে গেছে, যার তাৎপর্য তখন বোঝা যায়নি, টের পাওয়া গেছে পরে। চার্লস বোভারীর সঙ্গে সেই যে নবীন যুবক, উকিলের মুহুরি-নাম যার লেও- তার দেখা রঙ্গালয়ের বারান্দায়। তিন বছর প্যারিসে লেখাপড়া করে লেও এসেছে জেলা শহরে, চাকরি করছে, জ্ঞান বেড়েছে ততোধিক। এমার প্রেমে আগেই পড়েছিল সে, এবার ঠিক করল, আর দ্বিধা নয়, হস্তগত করবে। সুযোগটা স্বামীই করে দিলো। মঞ্চের নাটকটি দেখা শেষ হয়নি দেখে স্ত্রীকে রেখে সে চলে গেলো ইয়নভিলে। লেও সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে। বিষন্ন ও পরিত্যক্ত এমার প্রথমে কিছু দ্বিধা ছিল, পরে আর থাকেনি। তারা প্রেমিক-প্রেমিকায় পরিণত হয়েছে। এরপর নানা অজুহাত ও সুযোগ তৈরি করে এমা আসে শহরে । ঘনগন লেও’র সঙ্গে মিলিত হয় হোটেলে। একবার তো এক নাগাড়ে তিনদিন ছিল। এমার যেন মধুচন্দ্রিমা। দ্বিতীয় মধুচন্দ্রিমা, কিন্তু প্রথমটির চেয়ে অনেক মধুর।
ইয়নভিলের আরেকজন ব্যবসায়ী আছে, নাম তার ল্যর্য; বাইরে অত্যন্ত বিনয়ী, ভেতরে অত্যন্ত নিষ্ঠুর, প্রকাশ্যে তার ব্যবসা কাপড়-জামার, অপ্রকাশ্যে সুদের। এর কাছ থেকে এমা আগে থেকেই জিনিসপত্র কিনতো, নিজের জন্য, রদলফের জন্য। দোকানে না থাকলে দোকানদার শহর থেকে এনে দিতো। টাকা না থাকলে ধার দিতো। উকিলের মুহুরি লেও’র সঙ্গে প্রেমের তৎপরতায় এমার খরচপাতি গেছিলো বেড়ে। শহরে গিয়ে থাকতে হয়, উপহার কিনে দিতে হয় লেওকে, টাকার হিসাব করলে চলে না। চড়া সুদে ধার-করা চলতে থাকলো। এমা ধার করে, কিন্তু শোধ দিতে পারে না। সুদের অঙ্ক বেড়ে ওঠে। এক সময়ে ব্যাপারটা আদালতে উঠলো হুকুম হলো জিনিসপত্র ক্রোকের, তারপরে নিলামের।
ক্ রোক ও নিলামের খবর এমা জানে, তার স্বামী কিছুই জানে না। স্বামীকে জানানো যাবে না। এমা এখন কার কাছে যায়? প্রথমে গেলো যার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছে সেই ল্যর্যর কাছেই, অনুনয় করলো। ল্যর্য প্রায় তাড়িয়ে দিলো এমাকে। গেলো তরুণ প্রেমিক লেও’র কাছে। সে লোকতো প্রায় পালিয়ে বাঁচলো। গেছে সরকারি তহশিলদারের কাছে। লোকটা বুঝেই না এমার কথা। এমা গিয়েছে প্রধান উকিলের কাছে। উত্তেজিত উকিলের মতলব এই সুযোগে ধর্ষণ করবে, এমাকে। পথহারা এমা এবার গেছে তার সাবেক প্রেমিক রদলফের দ্বারে। আশা ছিল রদলফ সাড়া দেবে। দিলো না। ফিরতি পথে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো। অন্ধকারে সিদ্ধান্ত নিয়ে ওষুধওয়ালার আলোকিত দোকানে এসেছে, সেখান থেকে আর্সেনিকের বিষ টেনে নিয়ে খেয়ে ফেলেছে।
এভাবেই পালাতে পারলো, শেষ পর্যন্ত। তার মৃত্যুর পরে স্বামী চার্লস বোভারীও মারা গেছে। শোকে মুহ্যমান ছিল, টাকা পয়সা কিছুই নেই হাতে, তবু হয়তো বাঁচতো যদি না আবিষ্কার করতো সেই অতিনিষ্ঠুর সত্য যে, জীবিত অবস্থায় এমা তাকে ভালোবাসতো না, গোপনে প্রেম করতো অন্যের সঙ্গে। ঘরে অল্পস্বল্প যা ছিল তা দিয়ে কোনো মতে কন্যা সন্তনটিকে দাদির কাছে পাঠানো গিয়েছিল। দাদি মারা গেলেন সে-বছরই। চার্লস বোভারীর নিরাশ্রয় মেয়েকে তাদের এক দরিদ্র আত্মীয় লাগিয়ে দিলো এক কাপড়ের কলে।
চার্লস বোভারীর মৃত্যুর পরে পরপর তিনজন ডাক্তার এসেছিল ইয়নভিলে, ওষুধওয়ালার আক্রমণের মুখে তাদের একজনও টিকতে পারেনি। ওষুধওয়ালা নিজেই এখন চিকিৎসক। তার পসার খুব ভালো। রাষ্ট্র তাকে পদক দিয়েছে- অতিশয় সম্মানযোগ্যদের একজন হিসেবে।

এমা বোভারীর চারপাশের মানুষগুলো খুবই সামান্য। ফ্লবেয়ার তাদেরকে দূরে দাঁড়িয়ে দেখেছেন। তবে জনাথন সুইফটের দৃষ্টিতে নয়; সে দৃষ্টিতে দেখলে এইসব লিলিপুটদের কাহিনী বিষয়বস্তু হতো ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের। তাঁর চোখে মোহ ছিল না, এটা যেমন সত্য, তেমনি সহানুভূতি যে ছিল, এটাও সত্য; যে জন্য কাহিনীটি পরিহাসের নয়, করুণার। মানুষগুলো সকলেই ছোটখাটো, বিশেষ করে নৈতিকভাবে, সবকিছুই এখানে দোকানদারিতে পরিণত হতে চায়, সর্বত্র ছায়া পড়ে হয় প্রতারণার নয় অন্ধত্বের; এদের মধ্যে এমা বোভারীই কিছুটা উঁচুতে। অনেকটা নয়, অল্পই। ওই অল্পের জন্যই নায়িকা সে। তার কাহিনী ট্রাজেডির। আম