17-Mon-Dec-2018 07:44am

Position  1
notNot Done

ত্রিভুজের প্রথম বাহু

zakir

2018-01-31 12:19:04

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

তিন বাহু না হলে ত্রিভুজ হয় না, তিনপক্ষ ছাড়া নরনারীর সম্পর্কে জটিলতা জমাট বাধে না। মাঝখানে মেয়েটি, দুই দিকে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পুরুষ। সব সময়ে যে এমন হবে তাও নয়, প্রথম বাহুটি পুরুষ হতে পারে, তাকে নিয়ে দুই নারীর দ্বন্দ্ব, সেও কম যায় না। কিন্তু বিবাহ সত্ত্বেও বিবাহতিরিক্ত যে-প্রেম সেখানে বিবাহিত নারীই প্রথম বাহু হয়ে দাঁড়ায়, তার একদিকে স্বামী, অন্যদিকে প্রেমিক। তিনটি বড় উপন্যাস, তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মুখপাত্র, এই রকমের ত্রিভুজ নিয়ে গড়ে উঠেছে। ন্যাথানিয়েল হথর্ন, গুস্তাভ ফ্লবেয়র এবং লিও টলস্টয় এই তিনজনই ঔপন্যাসিক বটে কিন্তু এক রকমের লেখক নন, একই সংস্কৃতির প্রতিনিধি নন। হথর্ন যে-অর্থে আমেরিকান, ফ্লবেয়র সেই অর্থেই ইউরোপীয়, এবং টলস্টয় রাশিয়ার। ঊনবিংশ শতাব্দীতে লিখেছেন তাঁরা, এক রকমের উপন্যাস লেখেননি, সাহিত্যিক ও নৈতিক আদর্শ দুটোই ছিল স্বতন্ত্র। কিন্তু তিনজনের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস-হথর্নের ‘দি স্কারলেট লেটার,’ ফ্লবেয়রের ‘মাদাম বোভারী’ এবং টলস্টয়ের ‘আন্না কারেনিনা’ নরনারী সম্পর্কের এই ত্রিভুজ নিয়েই লেখা। এবং তিনটি উপন্যাসেই গুরুত্ব ত্রিভুজের প্রথম বাহুর, এক্ষেত্রে বিবাহিত স্ত্রীর ওপর গিয়ে পড়েছে।
ন্যাথানিয়েল হর্থনের (১৮০৪-৬৪) উপন্যাসটি লেখা হয়েছে এই তিনটির মধ্যে প্রথমে ১৮৫০-এ। হথর্নের ‘স্কারলেট লেটারের নায়িকা হেস্টার প্রীন, ফ্লবেয়র ও টলস্টয়েল নায়িকার মতোই পরকীয় প্রেমের পথে পা বাড়িয়েছিল এবং সে কাজ করতে গিয়ে দুর্ভোগ ভোগ করেছে অসম্ভব। কিন্তু ফ্লবেয়রের মাদাম বোভারী এবং টলস্টয়ের আন্না কারেনিনা থেকে একেবারেই আলাদা এই মেয়ে। তাদের মতোই নায়িকা বটে, এবং সাধারণ নয়, কিন্তু সেটা সম্পূর্ণ নিজের মতো করে। তিনজন নায়িকার প্রত্যেকেই বিবাহিত জীবনে অসুখী ছিল। যে-জন্য তাদের প্রেমিকের কাছে যাওয়া, কিন্তুু হেস্টরের ব্যাপারটা ভিন্ন প্রকারের বটে।
তার স্থলন ঘটেছে উপন্যাসের কাহিনী শুরু হবার আগেই। কাহিনীর শুরুতে আমরা দেখি হেস্টার বের হয়ে আসছে কারাগার থেকে। সেখানে সে আটক ছিল ব্যভিচারের দায়ে। মুক্তি পাবে, কিন্তু চিহ্নিত রয়ে যাবে দাগী আসামি হিসাবে। কেননা নিজের বুকের ওপর লাল রঙে লেখা ইংরেজী ‘এ’ অক্ষরটি বহন করতে হবে তাকে, বাকি জীবন। ‘এ’ মানে হচ্ছে এডালটারি, বিবাহিত মহিলার ব্যভিচার। জামার ওপর অক্ষরটি সেলাই করে নিয়েছে সে, নিজের হাতে। কারাগার থেকে বের করে এনে হেস্টারকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল বাজারের মাঝখানে। শত শত মানুষের মাঝ খানে। আশা করা হয়েছিল যে, সে তার দুষ্কর্মের সহকর্মীর নামটি প্রকাশ করে দেবে। হেস্টার প্রীনের বুকের ওপর কেবল যে লাল অক্ষর আছে তা নয়, রয়েছে একটি কন্যা সন্তানও। তিন-চার মাস বয়স, জন্ম তার ওই কারাগারেই। হেস্টারকে বলতে হবে এই সন্তানের পিতা কোন ব্যক্তি। সে যদি সেটা বলে তাহলে তার শাস্তির পরিমাণটি কিছুটা হলেও কমে যাবে। এটা অকিঞ্চিতকর প্রলোভন নয়। কিন্তু একদা যে-নারী ব্যভিচারের প্রলুব্ধ হয়েছিল সে এই প্রলোভনে সাড়া দিচ্ছে না। উল্টো বলছে, কে তার সহযোগী সেটা জানাবে না। কিছুতেই নয়। একাই বহন করবে দু’জনেরই শাস্তি। তাছাড়া তার যে এডালট্রেস, অর্থাৎ ব্যভিচারিণী, পরিচয় কারো সাধ্য সেই সেটা মুছে ফেলে।
পাপ করেছে, তাই শাস্তি পাবে, বক্তব্য তার এটাই। কেবল অক্ষর নয়, বুকে তার শিশু সন্তান। পুত্র নয়, কন্যা। হেস্টারের জন্য এই সন্তানটি পাপের পরিণতি। একে সে অবশ্যই আদর করে, সবচেয়ে আপন জন হিসাবে জানে, কিন্তু এ-যে তার পতনের স্মারক ও শাস্তি সেটাও ভোলে না। শিশুটিও তা ভুলতে দেয় না। দুষ্টুমি করে, আর সেসব দুষ্টুমি হেস্টারকে ভাবতে বাধ্য করে যে, শিশুটির পক্ষে ওটাই স্বাভাবিক, কেননা তার জন্ম তো পাপেই। কন্যার নাম দিয়েছে পার্ল। বাইবেলে এ নাম পাওয়া যাবে। মা হেস্টারের কাছে পার্ল মুক্তার মতোই মূল্যবান, আর যে-শামুকের ভেতরে প্রাকৃতিক মুক্তার জন্ম হয় সে-শামুকের পক্ষে মুক্তাকে ধারণ করা যেমন পীড়াদায়ক, হেস্টারের পক্ষেও পার্লকে মানুষ-করা তেমনি কষ্টকর বৈকি।
হেস্টার নিজেও প্রকৃতির মতোই। সহজ, স্বাভাবিক, প্রাণবন্ত। দীর্ঘাঙ্গী এই মেয়েটি অত্যন্ত সুশ্রী, খুবই আকর্ষণীয়া। কিন্তু তার ভেতর ওই যে পাপের বোধ সেটি তার আদর্শিক বশ্যতার নির্দশন। হেস্টারের বসবাস পিউরিটান সংস্কৃতিতে। মধ্য-ঊনবিংশ শতাব্দীর আমেরিকাতে লেখা হলেও হেস্টার প্রীনের কাহিনী এরও দু’শ বছর আগের, সপ্তদশ শতাব্দীর। পিউরিটানরা ক্যাথলিকদের চেয়ে গোঁড়া, আসলেই তারা মৌলবাদী, ধর্মের আনুষ্ঠানিকতায় আস্থা তাদের কম, বিশ্বাস করে পাপ-পুণ্যের ব্যক্তিগত মূল্যায়নে এবং এও মনে করে যে পাপের পথ পরিহার করতে হলে যেমন উপদেশ প্রয়োজন তেমনি আবশ্যক শাস্তির। ক্যাথলিকদের সঙ্গে তাদের বিরোধ ছিল অনিবার্য, যার দরুন ইংল্যান্ডে তারা নির্যাতিত হচ্ছিল, নির্যাতিদের একটি দল জাহাজে করে চলে এসেছিল নতুন পৃথিবী আমেরিকাতে। তারা এসে নামে সমুদ্রতীরের বস্টনে এবং সেখানে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন ও ধর্মচর্চার অভিপ্রায়ে একটি উপনিবেশ গড়ে তোলে। হেস্টার প্রীনও ইংল্যান্ড থেকেই এসেছে; এখন এই শহরে থাকে। এই নব্য বসবাস স্থাপনকারীদের অর্থনৈতিক জীবন সচ্ছল, সমুদ্রপথে ব্যবসা-বাণিজ্য চলে, কৃষির জন্য মাঠও পড়ে রয়েছে উন্মুক্ত। বস্টন শহরে ধর্ম খুবই সক্রিয়। তার পতনের জন্য হেস্টারকে কারাবাস ও লাল অক্ষরে লেখা বুকের ওপর পাপাচারের স্বারকচিহ্ন বহন করার শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আরো কঠিন হতে পারতো, এমনিক মৃত্যুদণ্ডও অসম্ভব ছিল না। কিন্তু হেস্টারের বয়স, এটি তার প্রথম বিচ্যুতি, তার স্বামী নেই, শোনা মতে স্বামী সমুদ্রে ডুবে মারা গেছে, হেস্টারের জন্য প্রলোভন ছিল, পতনের এসব দিক বিবেচনা করে শাস্তিটা নরম ধরনেরই দেওয়া হয়েছিল।
প্রকাশ্য বাজারে মঞ্চের ওপর তাকে একে দাঁড় করানো হয়েছিল। তার পাপের সহযোগী কে সেই পুরুষের নাম সে বলুক। হেস্টার বলেনি। রোদের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটানা দাঁড়িয়ে থেকেছে, তবু নাম বলেনি। পরে অবশ্য তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু লাল অক্ষর তাকে বহন করতেই হবে, এবং থাকবে সে একঘরে হয়ে। হেস্টারের পক্ষে কারাগার ছিল কবরের মতো অন্ধকার ও সঙ্কীর্ণ। সেখান থেকে বের হয়ে আসাটা কবর থেকে মুক্তিই বটে। পুনরুত্থান। যীশুর মতোই, মৃত্যুর পরে যিনি একবার ফিরে এসেছিলেন, পৃথিবীতে। পার্থক্য অবশ্যই আছে, যীশু পাপী ছিলেন না, তাঁর শাস্তিদাতারাই বরঞ্চ পাপ করেছিল, হেস্টারের ব্যাপারটা একেবারেই উল্টো। তবু পুনরুত্থানটা সত্য। হেস্টার পাপী হতে পারে, কিন্তু যীশুর মতোই সে পরোপকারী।
 দুই. হেস্টার প্রীনের গল্পটা প্রায় একরৈখিক। উপন্যাসে যেমনটা হয়, ঘটনা নয়, চরিত্রই বড়। তবে ঘটনায় চমৎকারিত্ব রয়েছে, তারা আরো সুন্দর হয়েছে বর্ণনার কারণে। ত্রিভুজের তিনটি বাহু পরস্পরকে প্রত্যক্ষে যতটা নয়, পরোক্ষে তার চেয়ে বেশি প্রভাবিত করে। শেষ পর্যন্ত পুরুষ দু’টির মৃত্যু ঘটে, হেস্টার বেঁচে থাকে। আসলে হেস্টার তাদের ওপর নির্ভরশীল ছিল না, বরঞ্চ তারা উভয়েই নির্ভরশীল হেস্টারের ওপর।
হেস্টার প্রীনের পূর্ব-ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না। জানার দরকারও নেই। তার জন্ম ইংল্যান্ডের এক গ্রামে। সপ্তদশ শতাব্দীর পিউরিটান তারা। পরিবারটি সম্ভ্রান্ত কিন্তু দরিদ্র। হেস্টারের বিয়ে হয়েছিল একজন বয়স্ক বিদ্যানের সঙ্গে। উপন্যাসে এই স্বামীর নাম রজার চিলিংওয়ার্থ। সেটা তার আসল না নয়, এই নাম সে গ্রহণ করেছে আসল পরিচয়টাকে অন্তরালে রাখতে। চিলিংওয়ার্থ নামটির মতোই লোকটি নিজেও শীতল এবং মানুষকে সে শীতল করে দিতে পারে, বিশেষ করে তাদেরকে, যাদের সঙ্গে তার সম্পর্কটা শত্রুতার। সেকালের ইংল্যান্ডে জ্ঞানী ব্যক্তিদের বিশেষ উৎসাহ ছিল আলকেমিতে। আলকেমি ওইকালের রসায়ন শাস্ত্র। আলকেমির আগ্রহ ছিল দুটি, অন্যধাতুকে মূল্যবান স্বর্ণে পরিণত করণ এবং সর্বরোগ হরণের একটি চিকিৎসা আবিষ্কার।
চিলিংওয়ার্থের কেবল যে বয়স বেশি তা নয়, দেখতেও সে অপ্রীতিকর। একে তো ছোটখাটো, তদুপরি একটি ঘাড় উঁচু অপরটির তুলনায়। তার সময় কাটে অধ্যায়েন, উদ্দীপনা যা কিছু বুদ্ধিবৃত্তিকে কেন্দ্র করেই। এর পাশে সুশ্রী হেস্টারকে মানাবে কেন? কেবল চেহারায় নয়, ভেতরের প্রবণতাতেও তারা ভিন্ন। হেস্টার মোটেই শীতল নয়, তার ভেতরে আবেগ কাঁপে থরথর করে। তার প্রতীক হিসাবে গোলাপফুল বেমানান নয়।
মেয়েটি বিয়েতে রাজি হয়েছিল জ্ঞানী ব্যক্তিটির কথোপকথন শুনে। ঠিক হয়েছিল থাকবে তারা ইউরোপে। সেখানেই ছিল। এমস্টারডাম শহরে। কিন্তু সেখানে তাদের থাকা হয়নি। নতুন পৃথিবী আমেরিকা ইউরোপকে তখন ডাকাডাকি করছে। সেই ডাকে বিশেষভাবে সাড়া দিয়েছে পিউরিটানরা; সাড়া দিয়েছে হেস্টার এবং তার স্বামীও। হেস্টার এসে পৌঁছলো ঠিকই, কিন্তু চিলিংওয়ার্থ পৌঁছলো না। সে রওনা দিয়েছে কিছু পরে, জরুরী কাজ সেরে; পথিমধ্যে তার জাহাজ গেছে ডুবে, সে উঠেছে গিয়ে আমেরিকারই আরেক অংশে, আদিবাসীদের মধ্যে। আদিবাসীদের ভেতর সে বন্দী অবস্থাতেই ছিল বলতে গেলে, কিন্তু সময়টাকে কাজে লাগিয়েছে তাদের কাছ থেকে যাদুবিদ্যা ও ভেষজ চিকিৎসা পদ্ধতি শিখে নেবার কাজে।
বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে গীর্জা থেকে বের হবার সময়েই টের পাওয়া গিয়েছিল যে এ-বিয়ে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। বয়সে পার্থক্য, হৃদয় ও মনের গঠনের ভিন্নতা দূরত্বটাকে পরে আরো স্পষ্ট করেছে। হেস্টার তার স্বামীকে ভালোবাসতে পারেনি। স্বামী আশা করেছিল স্ত্রীর কাছ থেকে উষ্ণতা পাবে। নিজের জীবনের শীতলতা ও নিঃসঙ্গতা বিষয়ে স্বামী সজাগ ছিল, দিনের শেষে গৃহকোণে ফিরে এলে স্ত্রীর সান্নিধ্য তার জীবনের অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দেবে এমনটাই ছিল তার প্রত্যাশা। ইউরোপে বসবাস করলে এই বিবাহের পরিণতি কি হতো আমরা জানি না, বস্টনে এসে যদি স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে থাকতো তবে পতন অসম্ভব হতো বলে আমরা অনুমান করতে পারি, কিন্তু স্বামী হারিয়ে যাওয়ায় বিয়ের কোনো অস্তিত্বই রইলো না। স্বামীকে ভালোবাসেনি, এবং স্বামী হারিয়ে গিয়ে তাকে মুক্তি দিয়ে গেছে, ইতিমধ্যে পরিচয় ঘটেছে ত্রিভুজের দ্বিতীয় বাহু আর্থার ডিমসডেলের সঙ্গে।  ডিমসডেল খুবই উজ্জ্বল এক যুবক। অক্সফোর্ডে শিক্ষিত। যদিও পেশায় সে ধর্মযাজক কিন্তু স্মরণ রাখতে হবে যে, ওই সমাজে ধর্মযাজকদের স্থান এখনকার মতো নয়, ছিল তা উঁচুতে, যেমন সম্মানে তেমনি ক্ষমতায়। বস্টনে তখন দৈহিক স্বাস্থ্যের জন্য তেমন কোনো চিকিৎসক ছিল না, কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ছিল, এবং তাদের মধ্যে ডিমসডেল হয়তো বা উজ্জ্বলমতই ছিল। অবিবাহিত। এতে সন্দেহ নেই শহরের বিবাহযোগ্য কন্যাদের অনেকেই সাগ্রহে সম্মতি দিত ডিমসডেল যদি তাদের কারো ব্যাপারে উৎসাহ দেখাতো। কিন্তু তার বিয়ে করা হয়নি, তার আগেই ঘটে গেছে ঘটনা। হেস্টার ও ডিমসডেল প্রেমে পড়েছে পরস্পরের।
এই পতন অত্যন্ত করুণ এক পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে ওই যুবক-যুবতীকে। যে-স্বাভাবিক আকর্ষণ তাদেরকে মিলিত করেছে তারই স্বাভাবিক পরিণতিতে সন্তানসম্ভবা হয়েছে হেস্টার। তখন তার তথাকথিত ব্যভিচার আর লুকানো থাকেনি। অপকর্মে তার সহযোগী কে ছিল আদালত সেটা জানতে চেয়েছে। হেস্টার তা জানায়নি। তখনো না, কোনোদিনই না। শাস্তি যা পাবার সে-ই পেয়েছে। একাকী বহন করেছে দু’জনেরই বোঝা।
কারাগারে যেতে হয়েছে যুবতী হেস্টারকে। সেখানে তার একটি কন্যা সন্তান জন্ম নিলো। সেটাও একটা দায়িত্ব বটে। এ রায় আদালত দেয়নি, প্রকৃতিই দিয়েছে। আদালতে দেওয়া শাস্তির মধ্যে ছিল পরনের কাপড়ের ওপর রক্ত বর্ণে ‘এ’ অক্ষরটি  লিখে রাখতে হবে তাকে। ঠিক বুকের ওপর থাকবে ওই ছাপ। সারা জীবনের শাস্তি এটা। লোকে যাতে জানতে পারে তার অপরাধ হচ্ছে এডালটারি, যার প্রথম অক্ষর ওই ‘এ’, যে-কথাটা আমরা শুরুতে বলেছি।
সন্তানের নাম রেখেছে সে পার্ল। পার্লের বয়স যখন তিন কি চার মাস হেস্টার তখন মুক্তি পেলো কারাগার থেকে। মুক্তির আগে হেস্টারকে এনে হাজির করা হয়েছিল জনসমক্ষে। ওই নতুন শহরে পিউরিটানরা কয়েকটি জরুরী স্থাপনা গড়েছিল। যেমন বাজার, গীর্জা, জেলখানা। বাজারের মধ্যখানে একটি ফাঁসিকাষ্ঠও ছিল, তার নীচে প্রয়োজনীয় একটি মঞ্চ। সবগুলো স্থাপনাই সভ্যতার জন্য অত্যাবশ্যকীয়। ওই মঞ্চের ওপর অত্যন্ত ভারি পায়ে হেঁটে এসেছে হেস্টার, যেন দলিত করছিল সে তার নিজের বুকের ব্যথা, পা ফেলে ফেলে। চারদিকে তখন শত শত মানুষ। স্কুলের ছেলেমেয়েরাও এসেছে; এই উপলক্ষে স্কুলগুলোতে অর্ধদিবস ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। মেয়েরা এসেছে বিপুল হারে। সব চেয়ে কঠিন মন্তব্যগুলো মেয়েরাই করেছে।
এই ভিড়ে হেস্টার একাকী দাঁড়িয়ে। বুকের তার লাল অক্ষর, কোলে সন্তান, সন্তানকে দিয়ে অক্ষরটা ঢেকে দেবার একটা বৃথা চেষ্টা করেছিল সে। পরে নিবৃত্ত হয়েছে। কিন্তু সেই যে মা ও সন্তানের একত্রছবি তার মধ্যে দেখবার একটা বিষয় ছিল। পিউরিটানদের ওই কঠিন সমাজে যদি কোনো সংবেদনশীল ক্যাথলিক থাকতো তাহলে সে হয়তো দেখতে পেতো যে মূর্তিটি যীশুকে কোলে-নেয়া মাতা মেরীর। সে-মাতাও কুমারী ছিলেন। এ ইঙ্গিতটা অপর কারো নয়, ঔপন্যাসিকের নিজেরই দেওয়া। কিন্তু ওভাবে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একজন বালিকা বধু ছাড়া কেউ কোনো সহানুভূতি জানায়নি। এমনিক পরিহাসও করেনি। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়েছি। পরিহাস করলে বরঞ্চ সে খুশী হতো, নিশ্চল পাথুরে চোখে তার দিকে ওভাবে তাকিয়ে না থেকে। এই সময়ে বয়স্ক এক ব্যক্তি মঞ্চের কাছে এসে উপস্থিত; লোকটি উস্কোখুসকো, আদিবাসীদের একজন এসেছে তার সঙ্গে, কিন্তু সে যে তাদের কেউ না সেটা বোঝা যায়, সে যেই এই শহরে নতুন আগন্তুক তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। হেস্টারকে দেখা মাত্র সে চিনেছে, যেমন হেস্টার চিনেছে তাকে। এই ব্যক্তিই হেস্টারের সেই হারিয়ে যাওয়া স্বামী, ত্রিভুজের দ্বিতীয় বাহু বটে। বুদ্ধিমান লোকটি এক লহমায় বুঝে নিয়েছে ঘটনাটা কি। আঙুল উঁচিয়ে সাবধান করে দিয়েছে হেস্টারকে, যেন হেস্টার তার স্বামীর পরিচয় ফাঁস না করে দেয়। তখন থেকেই লোকটির নতুন গোপনীয়তা শুরু, যেটির অবসান হয়নি তার মৃত্যুর পরেও।
হেস্টার বুঝেছে তার জন্য আরেকটি মূর্তিমান শাস্তি এসেছে, সমুদ্র ফুঁড়ে। অন্য সবকিছু ভুলে মাথার মধ্যে তার এখন এই নতুন দুশ্চিন্তা। পাদ্রীরা যখন চাপাচাপি করছে, প্ররোচিতই করতে চাইছে হেস্টারকে তার পতনের  জন্য দায়ী পুরুষটির  পরিচয় প্রকাশ করে দিতে, তখন ওই আগন্তুকও তার কন্ঠ মিলিয়েছে তাদের সঙ্গে। চীৎকার করে বলেছে, ‘বলো, বলে দাও কে ওই সন্তানের পিতা।’
হেস্টার জবাব দিয়েছে, এই শিশুর পিতা স্বর্গে থাকে। মর্তে এর কোনো পিতার প্রয়োজন নেই। বলেছে, যীশুর ও পিতার প্রয়োজন ছিল না, যীশু ছিলেন ঈশ্বরের সন্তান। কিন্তু পার্লের পিতা ঐশ্বরিক হবে কি করে? সে তো রক্তমাংসের এক দুর্বৃত্ত। ম্যাজিস্ট্রেট বলে, পাদ্রী বলে, হেস্টারের স্বামী বলে, হেস্টার অপরাধীর নাম প্রকাশ করুক। সে-ব্যক্তি নিশ্চয়ই এখানেই আছে, এই জনপদে।
সেখানেই সে ছিল, কিন্তু তাদের কতটা যে কাছে সেটা তাদের পক্ষে অনুমান করা সম্ভব ছিল না। কেননা লোকটি অর্থাৎ ডিমসডেল তো ওই পাদ্রীদেরই একজন। যে-বারান্দাটিতে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র ও ধর্মের অভিভাবকেরা চীৎকার করে হেস্টারকে প্রলোভনের নামে শাসাচ্ছিল, অথবা শাসনের সঙ্গে প্রলোভনকে দিচ্ছিল মিশিয়ে, আর্থার ডিমসডেল তার কতর্ব্য পালনের প্রয়োজনে সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। কেবল তাই নয়, এমন ঘটনাও তো বটে, যে অপরাধী নিজেই অপরাধের ভুক্তভোগীকে চাপ দেয় অপরাধীর নাম বলতে, ঘটলো তা এক্ষেত্রেও। হেস্টারের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের দায়িত্ব পড়লো গিয়ে ডিমসডেলেরই কাঁধে। হেস্টারকে একবার যে-ব্যক্তি প্রলুব্ধ করেছিল পতনে, এবার বুঝি প্রলুব্ধ করতে চাইলো সে উত্থানে। বললো, ‘বলো, বলে দাও লোকটি কে, বললে তুমি তার উপকারই করবে। পাপ করা এবং সেই পাপ লুকানো এক সঙ্গে এই দুই ভার বহন করার দায়িত্ব থেকে তুমি তাকে মুক্তি দেবে।’
এই প্রলোভনে সাড়া দেয়নি হেস্টার। ফিরে গিয়েছে সে কারাগারে, শিশু সন্তানকে এবং নিজের ব্যভিচারিণী পরিচয়ের জ্বলন্ত সাক্ষ্যটিকে সঙ্গে নিয়ে। গিয়ে দেখে মুক্তি তার সুদূরপরাহত। কেননা কারাগারে তার স্বামী এসে হাজির। স্বামীর পরিচয়ে নয়, এসেছে সে চিকিৎসক হিসাবে। কারারক্ষকেরা ভয় পেয়ে গিয়েছিল হেস্টার ও সন্তানের অবস্থা দেখে। সন্তানটি অত্যন্ত অসুস্থ এবং হেস্টারের মানসিক ও শারীরিক অবস্থা এমন যে সেবিপজ্জনক কিছু একটা করে ফেলতে পারে। অতএব চিকিৎসকের প্রয়োজন ছিল।
 হেস্টারের সাবেক স্বামী রোগী দু’টিকে ওষুধ দিয়েছে যত্ন করে। শিশুটি ওষুধ খেতে চায় না। লোকটি তাকে কোলে নিয়ে আদর ও যত্ন করে ওষুধ খাওয়ালো। বলতে গেলে তাকে বাঁচিয়ে তুললো। সে বলেছে, তার নতুন নাম রজার চিলিংওয়ার্থ। এখন থেকে ওই নামেই সে পরিচিত হবে। হেস্টার যেন কিছুতেই তার পরিচয় প্রকাশ না করে। হেস্টারের এখন দু’টি অতিরিক্ত দায়িত্ব, স্বামীর পরিচয় এবং প্রেমিকের পরিচয়-দু’টিকেই লুকিয়ে রাখা। নিজের ও সন্তানের ভার বহন করা তো রয়েছেই।
চিলিংওয়ার্থকে হেস্টার বলতে চেয়েছে যে, সে অন্যায় করেছে। চিলিংওয়ার্থ তাকে আশ্বাস দিতে চায়, বলে, অন্যায় একজনের নয় দু’জনেরই। আমাদের অদৃষ্টেই লেখা ছিল এই পরিণতি। কিন্তু আমাদের চেয়েও বড় অপরাধী হচ্ছে ওই দুর্বৃত্ত যে তোমার এই দশা করেছে। তার পরিচয়টা বলো। তাকে খুঁজে বের করা আমার জন্য খুবই দরকার।
কিন্তু অজ্ঞাত পরিচয় সেই ব্যক্তিকে তো হেস্টার কিছুতেই চিহ্নিত করবে না। ঔপন্যাসিক স্পষ্ট করে বলছেন না, কিন্তু অনুমান করতে বিঘ্ন নেই যে, এই অসম্মতির পেছনে অভিমান আছে, ভালোবাসাও আছে নিশ্চয়ই, আর রয়েছে পুরুষতন্ত্রসহ সমগ্র পৃথিবীকে চ্যালেঞ্জ করা। হেস্টার যে বিদ্রোহী এমন কথা প্রকাশ্যে সে কখনো বলেনি। সে সমাজের শাসনের কাছে অবনত। শান্ত নিরুপদ্রব। কিন্তু ভেতরে অনমনীয় রূপে বিদ্রোহী। কারামুক্ত হবার পর সাত বছর কাটালো সে একাকী। একমাত্র সঙ্গী ওই সন্তান। মাতাও সন্তান থাকে এখন সমুদ্রের ধারে, একটি পরিত্যক্ত গৃহে। জীবিকা অর্জন করে মানুষের জামাকাপড়ের ওপর সূতোর কাজ তুলে দিয়ে। কেবর জীবিকা নয়, ওই কাজ তাকে মুক্তিও দেয়। শিল্পীর মুক্তি। শিল্পী ও বিদ্রোহী এক হয়ে যায়, কেবল শিল্পী কিম্বা কেবল বিদ্রোহী বলে টিকে থাকা অসম্ভব হতো। নিজের আয় থেকে উদ্বৃত্ত যা থাকে দান করে দেয়। সেবা করে আর্তের। বিশেষ করে অসুস্থ ও মরণাপন্নের, কাজ করতে যায় মানুষের গৃহে, কাজ শেষ হয়ে গেলে আর থাকে না, নীরবে চলে আসে। যে-সমাজ তাকে শাস্তি দিয়েছে, একঘরে করে ছেড়েছে, স্থায়ীভাবে চিহ্নিত করেছে অপরাধী বলে, তার ওপর শান্ত এক প্রতিশোধ নিয়ে নিয়েছে বিদ্রোহী হেস্টার। ঘোষণা না দিয়ে। একাকী।
ওদিকে তার একদা-প্রেমিক আর্থার ডিমসডেলের যে-দুর্ভোগ সেটার তো কোনো অবধি নেই। তার বুকের ওপর চেপে বসেছে পাপের প্রজ্বলন্ত বোধ, সেই সঙ্গে পাপকে লুকানোর দুর্ভোগ এবং যৌথ পাপের সমস্ত বোঝা হেস্টারকে একাকী বহন করতে দেখার সুতীব্র অনুশোচনা। ডেমসডেল ধর্মযাজক, জনসমক্ষে তাকে নৈতিকতার বাণী ও উপদেশ প্রচার করতে হয়, অথচ নিজেকে সে জানে মস্ত বড় পাপী হিসাবে, কখনো কখনো এমন হয়েছে যে সে বলতে চেয়েছে নিজের অপরাধ ও সামান্যতার কথা, কিন্তু যতই বলে ততই লোকেভাবে অসামান্য মানুষ ইনি, বিনয়ে অতুলনীয়, এমন আচরণ তাঁকেই মানায়।
বাইরের লোকে বোঝে না, বুঝবেও না, কিন্তু ভেতরে তার যে রক্তক্ষরণ চলছে তাতে তার স্বাস্থ্যও যাচ্ছে ভেঙে। এই দুর্দশাটা আর কেউ না দেখুক, একজন কিন্তু ঠিকই লক্ষ্য করছে। সে-ব্যক্তিটি হচ্ছে রজার চিলিংওয়ার্থ। ক্ষ্যাপার মতে সে খুঁজছে তার শত্রুকে। তার পক্ষে ডেমসডেলকে লক্ষ্য না করে উপায় নেই। তদুপরি সে একজন চিকিৎসক এবং চিকিৎসক হিসাবে তার মর্যাদা সর্বত্র। চিলিংওয়ার্থ বললো, ‘ডিমসডেলের স্বাস্থ্য খারাপ হচ্ছে দিনকে দিন, তার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়া চাই। সুচিকিৎসার স্বার্থে ডিমসডেলের সঙ্গে থাকা দরকার।’ সে ব্যবস্থাই করা হলো।
একদিন ধরা পড়ে গেলো ডিমসডেল। বই পড়াতে পড়তে ক্লান্ত হয়ে ঘুঁমিয়ে পড়েছে সে তার চেয়ারে। ইতিপূর্বেই চিলিংওয়ার্থের সন্দেহ হয়েছিল, সন্দেহ যে অমূলক নয় সেটা সে বুঝলো ডিমসডেলের জামাটা সরিয়ে পাদ্রীর বুকের দিকে তাকিয়ে। জামাটা আলগা ছিল, চিলিংওয়ার্থ সেটা সরিয়ে দেখে ভেতরে ‘এ’ অক্ষরটি লেখা। কিভাবে অক্ষরটি ওখানে এসেছে ঔপন্যাসিক তা জানাননি। তিনি নিজেও জানেন, বলছেন না। হতে পারে নিজেই সে লিখেছে, বুক কেটে। অথবা হতে পারে পাপের অন্তর্গত জ্বালাতেই অক্ষরটা ফুটে বের হয়েছে, ভেতর থেকে।
ডিমসডেলের নিজের কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছিল এই আত্মপ্রতরণা। এই সাধু সেজে থাকা। এক রাতে সে বের হয়ে পড়েছে। শহরের সেই ফাঁসির মঞ্চে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, সাত বছর আগে হেস্টার যেখানে একদিন দাঁড়িয়েছিল, সকলের সামনে। ডিমসডেলের ইচ্ছা ছিল চীৎকার করে সারা শহরকে জানাবে তার পাপের কথা। জানাতোও বটে। কিন্তু পারলো না। সেই সময়ে অন্ধকার ঠেলে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে হেস্টার ও পার্ল। নগরের গভর্নর তখন মৃত্যুশয্যায়, তার সেবার জন্য গভর্নরের বাড়িতে গিয়েছিল হেস্টার, পার্লকে নিয়ে। ফেরার পথে উদ্ভ্রান্ত ডিমসেডেলের সঙ্গে তার সাক্ষাত। চিলিংওয়ার্থও সেই মুহূর্তে এসে হাজির। সে তো জেনে গেছে তার শত্রুকে। শত্রুকে সে চোখে চোখে রাখে। তাকে পালাতে দেবে না। মরতেও দেবে না। তিলে তিলে যন্ত্রণা দিয়ে দিয়ে সে তাকে শেষ করবে।
বহুদিন পরে হেস্টারের সঙ্গে ডিমসডেলের এই সাক্ষাৎকার। হেস্টার দেখলো কেমন ভেঙে পড়েছে প্রাণবন্ত সেই পুরুষ মানুষটি। তার করুণা হয়েছে। ঠিক করেছে কিছু একটা করতে হবে। বুঝেছে সে যে, চিলিংওয়ার্থ পিছু নিয়েছে ডিমসডেলের; বন্ধু সেজে যন্ত্রণা দিচ্ছে বেচারাকে। সমুদ্রের ধারে একদিন চিলিংওয়ার্থকে একা পেয়ে সে বললো, ‘ডিমসডেলকে তুমি মাফ করে দাও।’ কিন্তু চিলিংওয়ার্থ তো সে কথা শুনবে না। তার বক্তব্য একটাই, অন্যায় যখন করেছে তখন প্রাপ্য শাস্তি ডিমসডেলকে অবশ্যই পেতে হবে। কেউ তাকে রক্ষা করতে পারবে না।
হেস্টার দেখলো চিলিংওয়ার্থের কাছে তার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা আর সম্ভব নয়। ডিমসডেলকে জানাতেই হবে কার সঙ্গে সে বসবাস করছে। কোন ভীষণ প্রাণীর কাছে সে সুঁপে দিয়েছে নিজেকে।
চিলিংওয়ার্থ যে তার স্বামী এই খবরটা দেওয়ার জন্য হেস্টার গেছে শহরের প্রান্তবর্তী অরণ্যে। ওই-পথে ডিমসডেল সময় সময় যাতায়াত করে। সেদিন দ্বিপ্রহরে বনের ভেতর দেখা তাদের দু’জনের। ওখানেই মিলতো তারা, প্রেমময় দিনগুলোতে। চিলিংওয়ার্থের আসল পরিচয় জানালো সে ডিমসডেলকে। বললো, ‘এভাবে নিঃশেষ করে দিয়ো না তুমি নিজেকে। তুমি পালাও। ভয় নেই, তোমার সঙ্গে আমিও যাবো।’
বস্টনে তখন নানান দেশের জাহাজ আসে। বৈধ, অবৈধ। একটি জাহাজ সেই মুহূর্তে নোঙর- করা ছিল। হেস্টার ঠিক করলো ওই জাহাজের যাত্রী হয়ে পালাবে তারা তিনজন-মাতা, পিতা ও কন্যা। পুরাতন পৃথিবী থেকে নতুন পৃথিবীতে এসেছিল, চলে যাবে সেই পুরাতন পৃথিবীতেই।
সব ব্যবস্থা হেস্টাই করেছে। চারদিন পরে ছাড়বে জাহাজ। ক্যাপ্টেনের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে। চারদিন পরে শুরু হবে তাদের নতুন জীবন। কিন্তু সে-জীবন আর এলো না।
তৃতীয় দিনে পাদ্রী ডিমসডেলের একটি প্রার্থনা বক্তৃতা দেবার কথা। উপলক্ষটা হচ্ছে নতুন গভর্নরের অভিষেক। সেই বক্তৃতা ডিমসডেল দিয়েছে। সেটাই তার শ্রেষ্ঠ বক্তৃতা। শেষ বক্তৃতা তো বটেই। অভিষেক উপলক্ষে প্রকার এক মেলা বসেছে। সবাই এসেছে সেখানে, পার্লকে নিয়ে এসেছে হেস্টারও। সেই যে ফাঁসির  মঞ্চ সেখানে দাঁড়িয়েই হেস্টার মনোযোগ দিয়ে শুনছিল ডিমসডেলের বক্তৃতা। শুধু আওয়াজই শোনা গেছে, অর্থ বোঝা যায়নি।
বক্তৃতা শেষে ডিমসডেল চলে এসেছে মঞ্চে, হেস্টার ও পার্লের পাশে; হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়েছে তাদের। বলেছে, ‘দেখো, নগরবাসী সবাই দেখো, আমার বুকেও ওই একই চিহ্ন। আমিও একেই পাপের পাপী। ‘ব্যভিচারী’। বলতে বলতে দুর্বল, পীড়িত, ক্লান্ত মানুষটি ঢলে পড়ে গেছে নীচে। সেখানেই তার মৃত্যু। চিলিংওয়ার্থ ছুটে এসেছিল করছ কি করছ কি করে। শিকার পালিয়ে গেছে তার বিপদ। কিন্তু পারেনি, তার আগেই যা বলার বলে ফেলেছে ডিমসডেল।
চিলিংওয়ার্থও এর পরে আর বেশী দিন বাঁচেনি। মৃত্যুর পরে দেখা গেলো সে বিস্তর সম্পত্তি রেখে গেছে, আর সব সম্পত্তি দিয়ে গেছে হেস্টারের অবৈধ সন্তান পার্লকে। পার্ল বস্টনে থাকতে পারতো, তাকে বিয়ে করবার জন্য পাত্রের অভাব হতো না, সম্পত্তিপ্রাপ্তির কারণে। কিন্তু হেস্টার থাকেনি, সন্তানকে নিয়ে চলে গেছে ইউরোপে। সেখানে তাকে লেখাপড়া শিখিয়েছে। বিয়ে দিয়েছে। তারপর ফিরে এসেছে ওই বস্টনেই। এখন সেখানে তার নতুন জীবন। দুঃস্থজনেরা আসে পরামর্শ ও সাত্বনার জন্য। বিশেষভাবে আসে মেয়েরা। হেস্টার বোঝে, নর-নারীর সম্পর্ককে একটা নতুন ভিত্তিতে স্থাপন করা দরকার, তার জন্য নতুন বাণী প্রয়োজন। সে-বাণীর বাহক হিসাবে নিজেকেই সে যোগ্য মনে করতো যদি-না  তার জানা থাকতো যে, একদা সে পাপ করেছিল। কিন্তু এটা জানে সে নিশ্চয় করে যে, ওই নতুন বাণীর বাহক পুরুষ মানুষ হবে না, হবে একজন নারী।
তিন. কয়েকজন মানুষের কাহিনী, কিন্তু একটি সংস্কৃতিরও প্রতিচ্ছবি সেই সঙ্গে। নির্যাতিত হয়ে পিউরিটানরা পুরাতন পৃথিবী থেকে নতুন পৃথিবীতে এসেছে, সেখানে নগর গড়েছে, স্থাপন করেছে উপনিবেশ, কিন্তু তবু অরণ্য রয়েছে, প্রাকৃতিক অরণ্য তো বটেই, মানসিক অরণ্যও। রয়েছে মানুষের প্রবৃত্তি। আছে কুসংষ্কারও। রয়ে গেছে নিষ্ঠুরতা। পিউরিটানরা ব্যক্তির বিবেকে বিশ্বাস করে, কিন্তু ইউরোপে-ইংল্যান্ডে ব্যক্তির যে-স্বাধীনতাটুকু ছিল, পিউরিটানদের নতুন উপনিবেশে ততটাও থাকেনি। মূলতঃ মধ্যবিত্তের উপনিবেশ, সেই শ্রেণীর চরিত্রগত ভাবালুতা, দোদুল্যমানতা, অসহিষ্ণুতা সবই ছিল সপ্তদশ শতাব্দীর বস্টনে। এসব গিয়ে আঘাত করেছে হেস্টার প্রীনকে। কাকের মাংস কাকে খায় না, কিন্তু পেটি বুর্জোয়ার মাংস পেটি বুর্জোয়ারা বেশ পছন্দ করে। পাপের চেয়ে পাপীর ওপরই চোখ বেশি, পিউরিটানদের। আদি পিতা অ্যাডামের পতন যে স্ত্রী ঈভের পরামর্শেই ঘটেছিল সে-কাহিনী পিউরিটানরা ভোলেনি। নারীর প্রতি তাদের অবিশ্বাস রয়ে গেছে। নারী নিজে পাপ করে এবং পুরুষের জন্য পাপের পথ তৈরি করে দেয়। পিউরিটান সংস্কৃতিতে নারীর স্থান দ্বিতীয়। মেয়েরাও একে মেনে নিয়েছে। ওভাবেই তারা জন্মেছে, ওইভাবেই তারা মারা যাবে। মেয়েরা ডাইনী হয়, ডাইনী হলে তাদেরকে পুড়িয়ে মারাই সঙ্গত, এসব কথা পুরুষ বলে, মেয়েরাও বলে। কোনো নারীর বিচ্যুতি ঘটেছে এই সংবাদে মেয়েরাই ক্ষিপ্ত হয় বেশি। নিষ্ঠুর সব মন্তব্য করে, কঠিন শাস্তি দিতে চায়, যেমনটি ঘটেছে হেস্টারের ক্ষেত্রে। পেছনে হয়তো থাকে নিজেদের বঞ্চনার প্রতিশোধ গ্রহণের স্পৃহা। নিজে যে ওই পাপ থেকে দূরে, এটা প্রমানের আকাঙ্খাও থাকতে পারে, কে জানে। মেয়েদেরকে যারা হেয় প্রতিপন্ন করে তাদের একজনকে হাতের মুঠোয় পাওয়া গেছে, একে নির্মূল করো, ওই মনোভাবও কাজ করে থাকবে। অনেকের শাস্তি একের ওপর চাপানোর মনোভাব এটি, সন্দেহ কী!
হেস্টারের প্রতি নিষ্ঠুর মন্তব্য নিক্ষেপকারীদের ভিড়ে একটি মেয়েকেই শুধু মনে হয়েছিল সহানুভূতিশীল। সদ্য-বিবাহিত এক তরুণী। পরে, ডিমসডেলের মৃত্যু পূর্ব মুহূর্তে সমবেত মানুষের মধ্যে মেয়েদের সবাই ছিল যারা হেস্টারকে গালমন্দ করেছে, ছিল না শুধু ওই তরুণীটি। হেস্টারের চোখ তাকে খুঁজছিল, কিন্তু হেস্টার জানতো সে আর আসবে না, তার কাফনের কাপড় হেস্টার নিজেই সেলাই করে দিয়েছিল। ভালোরা বাঁচে না, তারা দুর্বল হয়ে থাকে। নিষ্ঠুরেরা রয়ে যায়, আরো নিষ্ঠুরতা করবে বলে।
‘স্কারলেট লেটারে’র মতো একটি উপন্যাস একজন আমেরিকান লেখকের পক্ষেই লেখা সম্ভব। আমেরিকায় সুগঠিত সমাজ নেই, ঐতিহ্যবাহী পরিবার নেই, এমন পারিবারিক জীবনও গড়ে ওঠেনি যাকে নিয়ে যথার্থ উপন্যাস লেখা যায়, এই ধরনের মতামত কেউ কেউ দিয়েছেন। দিয়েছেন ঔপন্যাসিকেরাও। কথাটা আংশিক সত্য। হ্যাঁ, আমেরিকাকে নিয়ে ইউরোপীয় উপন্যাস লেখা সম্ভব নয় একটা সত্য। মাদাম বোভারী কিম্বা আন্না কারেনিনাকে নায়িকা করতে হলে প্যারিস-পিটার্সবুর্গের প্রয়োজন, বস্টনে তাদেরকে পাওয়ার চেষ্টা অরণ্যে রোদন বৈ নয়। কিন্তু ভিন্ন রকমের উপন্যাস অবশ্যই লেখা যায়। প্রমাণ হথর্নের এই রচনা। প্রমাণ হারম্যান মেলভিলের লেখা ‘মবি ডিক’। প্রমাণ আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘দি ওল্ড ম্যান এন্ড দি সী’। তিনটিই অভিযানের কাহিনী। মেলভিল ও হেমিংওয়ের উপন্যাসে রয়েছে মংস শিকারের ঘটনা, হথর্ন বলছেন মৃত্যুর বলয় পার হয়ে জীবনের দিকে যাত্রার একটি কাহিনী। হেস্টার প্রীনের উপাখ্যান।
হেস্টার প্রীনের মধ্যে প্রকৃতির মতোই স্বাভাবিকতা আছে, আমরা বলেছি। মানব প্রকৃতির অবশ্যই, আরণ্যকে প্রকৃতিরও, যে অরণ্যে তার পতন ছিল অবশ্যম্ভাবী। তার ভেতরে রয়েছে ইন্দ্রিয়বাদিতা। পতনের পেছনে ওই ব্যাপারটার প্ররোচনা ছিল নিশ্চয়ই। হেস্টারের স্খলন অতীতের ঘটনা, কিভাবে সেটা ঘটেছে কেউ জানে না, ওরা দু’জন ছাড়া। দু’জনেই চায় যে-অধ্যায়টা তারা পার হয়ে এসেছে তাকে ভুলে যেতে, পারলে অবলুপ্ত করে দিতে, প্রয়োজনে চোখের জলে। কিন্তু সেই অতীত তো প্রবহমান রয়েছে বর্তমানের মধ্যে, কেবল প্রবহমান নয়, বর্তমানকে সে নিয়ন্ত্রণও করছে। ঔপন্যাসিক সেটাই দেখাচ্ছেন।
হেস্টারের ভেতর ইন্দ্রিয়বাদিতা ছিল, ওই অরণ্যের মতো। আবেগ ছিল, পাহাড়ি ঝর্ণার সঙ্গে তুলনীয়। খোলা আকাশের নীচে, বড় বড় গাছের ফাঁকে, আলোছায়ার খেলায়, ঝর্ণাতলার নির্জনে তারা শেষবারে মতো মিলিত হয়েছে, যেমন অতীতে মিলিত হয়েছিল, অনেকবার। হেস্টার তার মাথার কাপড় ফেলেছে সরিয়ে, বুকের ওপরে বসে-থাকা লাল অক্ষরটিকে টেনে ছিড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে ঝর্ণার পানিতে। তার যৌবন, সৌন্দর্যের দ্যুতি, তার নারীত্ব সবই আবার ফেরত এসেছে। বুঝি-বা স্থায়ী হবে। কিন্তু হয়নি। সেটা আর হবার নয়।
এই মেয়েটির উপযুক্ত বর পাওয়া দরকার ছিল, পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বর সে পায়নি। যার সাথে বিয়ে হয়েছে সে-লোকটি জ্ঞানী বটে এবং এটাও ঠিক যে দাম্পত্য জীবনের  উষ্ণতার জন্য তার আকাঙ্খাটা ছিল তীব্র, সে জন্যই সে বিয়ে করেছিল হেস্টারকে, বড় আশা নিয়ে, কিন্তু নিজে সে বেশ শীতল এবং মোটেই সুশ্রী নয় দেখতে, শীতের সঙ্গে বসন্তের এই পরিণয় সুখের হবার কথা ছিল না, না শীতের জন্য, না বসন্তের। তবু হয়তো টিকে যেতো, কোনমতে, যদি আনুকূল্য পেতো সমাজের, সহযোগিতা পেতো পরিবারের। কিন্তু পাবার সুযোগ ছিল না। ইংল্যান্ডের মানুষ তারা, থাকতো বিদেশে, এ্যামস্টারডামে; কিন্তু তারপরে যা ঘটলো সেটা তো চূড়ান্ত। স্বামী হারিয়ে গেলো সমুদ্র পার হতে গিয়ে। সবাই জানে ওই স্বামী আর ফিরে আসবে না। এলে এতদিনে নিশ্চয়ই আসতো। সঙ্গী হিসাবে হেস্টার এবার পেলো আর্থার ডিমসডেলকে। ডিমসডেল হেস্টারের জন্য উপযুক্ত পাত্র হতে পারতো, এর সঙ্গে বিয়ে হলে সুখের হতো দাম্পত্য জীবন, এমনটা মনে করবার কারণ রয়েছে। তারা আকৃষ্ট হয়েছে পরস্পরের প্রতি এবং এমনও নয় যে, পিউরিটান পাদ্রীদের জন্য বিবাহ নিষিদ্ধ। কিন্তু তারা বিয়ের পথে এগোয়নি। তার আগেই সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়েছে হেস্টার। হেস্টারের জন্য যথার্থ বিবাহ নেই, আছে নিশ্চিত দুর্ভোগ। হেস্টার-ডিমসডেলের সম্পর্কের ক্ষেত্রে