19-Wed-Dec-2018 02:31pm

Position  1
notNot Done

অমর একুশে গ্রন্থমেলার ইতিকথা

Zakir Hossain

2018-01-31 12:40:38

বদিউদ্দিন নাজির: কখনো 'গ্রন্থমেলা' কখনো 'বইমেলা'-এর সঙ্গে দেশের সংস্কৃতিমনা মানুষদের পরিচয় ঘটেছে গত শতাব্দীর ষাটের দশকে। এর সূত্রপাত গত শতাব্দীর মধ্য ষাটের দশকে তত্কালীন কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি চত্বরে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র আয়োজিত শিশু গ্রন্থমেলা দিয়ে। ১৯৬৭ সাল থেকে যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরিভিত্তিক গ্রন্থমেলা নাম দিয়ে যশোরের বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এক দিন করে বইয়ের প্রদর্শনী ও আলোচনাসভার ব্যবস্থা করত। কিন্তু 'বুকফেয়ার' বলতে যা বোঝায়, তার আদলে বড় পরিসরে জাতীয় স্তরে গ্রন্থমেলা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে। গ্রন্থমেলাটির আয়োজন হয়েছিল বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে, ২০ থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত। উদ্বোধন করেছিলেন বাংলাদেশের তত্কালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো মেলাপ্রাঙ্গণ যেমন মুখরিত রেখেছিল, পাশাপাশি তেমনই মেলবন্ধন ঘটেছিল লেখক-প্রকাশকসহ গ্রন্থপ্রেমী সংস্কৃতিসেবীদের। মেলায় অংশ নেয় সে সময়কার প্রায় সব উল্লেখযোগ্য প্রকাশক, ভারতের ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ঢাকায় অবস্থিত সোভিয়েত ব্লকের প্রায় সব দূতাবাস, ব্রিটিশ কাউন্সিল ও আমেরিকান দূতাবাস।

১৯৭৩ সালে সরদার জয়েনউদ্দীন ফ্রাঙ্কফুর্ট আন্তর্জাতিক গ্রন্থমেলায় সরকারিভাবে যোগদান শেষে ওই মেলার বিভিন্ন সুভেনির ও বিভিন্ন কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে আসেন। বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জাতীয় গ্রন্থমেলা ও গ্রন্থ প্রদর্শনীর জন্য বার্ষিক এক লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়। এ দুইয়ের সমন্বয়ে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় গ্রন্থমেলা সেগুনবাগিচায় আর্ট কাউন্সিল ভবনে অনুষ্ঠিত হয়। মেলা অনুষ্ঠিত হয় ১৪ এপ্রিল থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত। এতেও দেশের ১৯টি প্রকাশনাসংস্থা, ৬টি বিদেশি দূতাবাস ও সংস্থা যোগদান করে। অতঃপর বিকেন্দ্রীকরণের নীতি অনুসরণ করে জাতীয় গ্রন্থমেলা বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে সম্পন্ন হয়ে জেলা শহরেও আয়োজিত হতে থাকে। জাতীয় মেলা ক্রমাগত মফস্বল শহরে অনুষ্ঠিত হতে থাকায় সেটি একসময় বাংলাদেশের জাতীয় মিডিয়া ও ঢাকার বিদগ্ধ সমাজের দৃষ্টির বাইরে চলে যায়। ঝড়-বাদলের দিনে পয়লা বৈশাখে মেলা শুরু হওয়ায় ও মফস্বল শহরের বুকে 'ক্যাপাসিটি' অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় জাতীয় গ্রন্থমেলা তৃণমূল পর্যায়ে বইয়ের প্রচার-প্রসারে সহায়তা করা সত্ত্বেও আর্থিক বিচারে গুরুত্ব হারাতে শুরু করে। ঢাকায় বৃহত্ আকারে গ্রন্থমেলা আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা প্রকাশকমহলে অনুভূত হতে থাকে। এই সূত্র ধরে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে আয়োজিত একুশে গ্রন্থমেলার সূত্রপাত ঘটে।

বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে বেসরকারিভাবে বই বিক্রির সূত্রপাত ঘটে অনানুষ্ঠানিকভাবে। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলা একাডেমী বিশেষ মাত্রা পায়। মুক্তধারার শ্রী চিত্তরঞ্জন সাহা ওই উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধকালে কলকাতায় প্রকাশিত বিভিন্ন বইসহ কতিপয় সদ্যপ্রকাশিত বই বাংলা একাডেমীর মাঠে বিক্রির ব্যবস্থা করেন। ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমী মহান একুশে মেলা উপলক্ষে ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি বিশেষ হরাসকৃত মূল্যে নিজস্ব বই বিক্রির ব্যবস্থা করে, পাশাপাশি মুক্তধারা, স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স এবং দেখাদেখি আরও কেউ কেউ বাংলা একাডেমীর মাঠে নিজেদের বই বিক্রির ব্যবস্থা করেন। ১৯৭২ কিংবা ১৯৭৩ সালে এ জন্য কোনো স্টল তৈরি হয়নি। ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমী ১৪ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করে। বঙ্গবন্ধু ওই সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। ওই গণজমায়েতকে সামনে রেখে ঢাকার বিভিন্ন প্রকাশক বাংলা একাডেমীর পূর্বদিকের দেয়ালবরাবর নিজেদের পছন্দমতো জায়গায় যে-যার মতো কিছু স্টল নির্মাণ করে বই বিক্রির ব্যবস্থা করেন। বাংলা একাডেমীর এতে কোনো ভূমিকা ছিল না, শুধু অনানুষ্ঠানিকভাবে মাঠের জায়গা ব্যবহার করতে দেবার সম্মতিটুকু ছাড়া। ১৯৭৫ সালে বাংলা একাডেমী কিছুটা সহযোগিতার মনোভাব দেখায় এবং মাঠের কিছু জায়গা চুনের দাগ দিয়ে প্রকাশকদের জন্য নির্দিষ্ট করে দেয়। ওই জায়গায় যথারীতি প্রকাশকেরা যাঁর যাঁর মতো স্টল তৈরি করে বই বিক্রির ব্যবস্থা করেন। এ অবস্থা চলতে থাকে ১৯৭৮ সাল অবধি।

১৯৭৯ সালে মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহা, ইউপিএলের মহিউদ্দিন আহমেদ, আহমদ পাবলিশিং হাউজের হাজী মহিউদ্দিন আহমদ, স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্সের রুহুল আমীন নিজামী, নওরোজ কিতাবিস্তানের কাদির খান, খান ব্রাদার্সের ফিরোজ খান—কতিপয় প্রকাশক বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে বই বিক্রির আয়োজনকে আনুষ্ঠানিকভাবে বইমেলায় রূপান্তরিত করার জন্য জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের তত্কালীন পরিচালক ফজলে রাব্বির নিকট সনির্বন্ধ অনুরোধ রাখেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে একটি সভার আয়োজন করা হয়। বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক ড. আশরাফ সিদ্দিকী আমন্ত্রিত হয়ে ওই সভায় উপস্থিত হন। সভায় একুশে উপলক্ষে ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে বইমেলার সিদ্ধান্ত হয়। মেলার নামকরণ করা হয় একুশে গ্রন্থমেলা। মেলার মূল উদ্যোক্তা করা হয় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রকে এবং বাংলা একাডেমী ও প্রকাশকবৃন্দ সহযোগিতায় থাকেন। ওই মেলা শেষে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মাসিক 'বই' পত্রিকার এপ্রিল, ১৯৭৯ সংখ্যায় লেখা হয়:

'এ বছর একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে একুশ দিনের এক গ্রন্থমেলা অনুষ্ঠিত হলো।... এবার একুশে উপলক্ষে ঢাকায় গ্রন্থমেলা আয়োজকের মূল উদ্যোক্তা জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, সহযোগিতা করেছেন বাংলা একাডেমী এবং স্থানীয় প্রকাশকবৃন্দ। মেলা শুরু হয় ফেব্রুয়ারির ৭ তারিখে। এদিন সকাল দশটায় ছিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। মেলা উদ্বোধন করেন উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি জনাব আবদুস সাত্তার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর আবদুল হালিম চৌধুরী। রোজই দুপুর তিনটা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত লোকজন এসেছেন, স্টলগুলো ঘুরে ঘুরে দেখেছেন এবং প্রতি স্টলেই কমবেশি বই বিক্রয় হয়েছে।'

ফেব্রুয়ারি মাসেই নবপ্রবর্তিত জাতীয় গ্রন্থসপ্তাহ পালনের অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি জেলায় গ্রন্থমেলার কাজে সমন্বয়ের কাজের জন্য জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ১৯৮০ সালে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত গ্রন্থমেলা আয়োজনের উদ্যোগ নিতে অপারগ হয়, সে কারণে 'আরো বই পড়া, আরো বই পড়া' স্লোগানকে সামনে রেখে বাংলা একাডেমী নিজ উদ্যোগে ১ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলা একাডেমীতে একুশে গ্রন্থমেলার আয়োজন করে। ১ ফেব্রুয়ারি বিকেল পাঁচটায় গ্রন্থমেলার উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী শামসুল হুদা চৌধুরী।

মাসিক 'বই' পত্রিকার একুশের প্রতিবেদন:

'ঐ দিন ও তার পরের প্রতিটি দিনে মহানগরীর গ্রন্থপাগল নর-নারীর এক বন্যা যেন নেমে এসেছিল বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। ঢাকার উল্লেখযোগ্য সব প্রকাশনা সংস্থা এই মেলায় অংশগ্রহণ করে। মোট ৩০টি প্রতিষ্ঠানের স্টল মেলাকে মুখর করে রেখেছিল।... এই মেলায় কমিশন বাদে আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার বই/পত্রিকা বিক্রি হয়েছে।... বাংলা একাডেমীর বিক্রয়লব্ধ অর্থের পরিমাণ, ২,৫৬,৫৭৩.৬২ টাকা।

১৯৮১ সালের একুশে বইমেলার মেয়াদ ২১দিনের পরিবর্তে ১৪দিন করা হয়। ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে পক্ষকালব্যাপী গ্রন্থমেলার উদ্বোধন করে ক্রীড়া ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আমিরুল ইসলাম কালাম। দৈনিক সংবাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই মেলায় ৬৫ জন প্রকাশক স্টল খুলবে, তবে উদ্বোধনী দিনে সবাইকে পাওয়া যায়নি।'

১৯৮২ সালের বইমেলা শুরু হয় ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে। মেলার মেয়াদ পুনরায় বৃদ্ধি পেয়ে ২১ দিন হয়। মেলার উদ্যোক্তা বাংলা একাডেমী এবং সহযোগিতায় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি।

১৯৮২ সালের ৩১ ডিসেম্বর কাজী মুহম্মদ মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক হিসেবে যোগ দেন। তিনি একুশের বইমেলায় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সহযোগিতার প্রয়োজন অনুভব না করায় তাকে বাদ দেন, তবে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতিকে সঙ্গে রাখেন। ১৯৮৩ সালের একুশের বইমেলার আয়োজন সম্পন্ন হয় কিন্তু রাজনৈতিক আন্দোলনে শিক্ষাভবনের কাছে ছাত্রদের মিছিলে ট্রাক তুলে দেওয়ায় ও গুলিবর্ষণে ছাত্র নিহত হওয়ায় মেলা হতে পারেনি। এরপর বাংলা একাডেমী বইমেলার নতুন নামকরণ করে এবং মেলার জন্য বাংলা একাডেমী মাঠ সংস্কার করে। মেলার নামকরণ হয় 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা'। ১৯৮৪ সাল থেকে ওই নামেই বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে গ্রন্থমেলা বৃহত্ কলেবরে নবোদ্যমে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। সে থেকে প্রতিবারই অংশগ্রহণকারী প্রকাশকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইত্যবসরে এই মেলা দেশের একটি প্রধান সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। দেশের প্রকাশক ও পাঠকদের জন্য বাংলা একাডেমীর অমর একুশে গ্রন্থমেলা হয়ে উঠেছে মহামিলনতীর্থ। বলতে গেলে বাংলাদেশের সৃজনশীল গ্রন্থের প্রকাশনাই এখন অমর একুশের গ্রন্থমেলাভিত্তিক হয়ে উঠেছে।