19-Wed-Dec-2018 08:50pm

Position  1
notNot Done

আদি স্ত্রীর প্রথম বিচ্যুতি

Zakir Hossain

2018-01-31 12:51:08

 অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী


জগতে এই যে এত দুঃখ ও সংঘর্ষ এর ব্যাখ্যা কী? জাগতিক ব্যাখ্যা রয়েছে, ধর্মীয় ব্যাখ্যারও অভাব নেই। ধর্মগ্রন্থ বলবে, সবকিছুর মূলে রয়েছে আদি পিতা ও আদি মাতার প্রথম পাপ। ঈশ্বরের নিষেধ অমান্য করে তাঁরা জ্ঞানবৃক্ষের ফল ভক্ষণ করেছিলেন। তাতেই পতন এবং তারপরে এই পিতার সন্তান-সন্ততি আমরা বংশপরস্পরায় ক্রমাগত পাপ করেই চলেছি। নতুন দুর্ভোগ চাপছে পুরাতন দুর্ভোগের কাঁধে। আদিমাতা ঈভের অপরাধটিই ছিল বেশি, আদিপিতা অ্যাডামের তুলনায়। নইলে অ্যাডাম স্বেচ্ছায় ওই ভয়ঙ্কর কাজটি করতেন না। প্রশ্ন অবশ্য থাকে। সেটা হলো এই যে, ঈশ্বর তো সবই জানতেন, তাহলে তিনি হস্তক্ষেপ করলেন না কেন, নিবৃত্ত করলেন না কেন বিপথগামী ঈভকে। আর ভুল যখন করেই ফেলেছে তার ওই দুই প্রিয় সৃষ্টি, তখন করুণা কেন করলেন না, কেন দিলেন কঠিন অমন শাস্তি। জবাব আছে। সেটা হলো এই যে, ঈশ্বর মানুষকে ইতর প্রাণী করে রাখতে চাননি, তাই অ্যাডাম ও ঈভকে স্বাধীনতা দিয়েছেন; কিন্তু স্বাধীনতা মানে তো স্বেচ্ছাচার নয়। আর স্বেচ্ছাচার যদি কেউ করে তবে তাকে শাস্তি তো পেতেই হবে। নইলে উচ্ছৃঙ্খলতার শেষ কোথায়?
প্রশ্নটি কবি জন মিল্টনের (১৬০৮-৭৪) মনে কি ওঠে নি? নিশ্চয়ই উঠেছিল। ইংরেজি সাহিত্যের দ্বিতীয় মহত্তম কবি তিনি, অবস্থান শেকসপীয়রের পরেই। কেবল কাব্যের জন্য নয়, প্রশ্নের জন্যও বিখ্যাত তিনি। রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন। বিদ্রোহী নন, বিপ্লবীই ছিলেন এই মিল্টন, রাজার পরিবর্তন নয়, উচ্ছেদ চেয়েছিলেন রাজতন্ত্রের, দেখতে চেয়েছিলেন একটি সামাজিক বিপ্লব। কিন্তু প্রশ্নের জবাবও পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ওই প্রথাগত জবাবই। এই জবাব পাওয়াটা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা তাতে বোঝা যায় যে-রাজনীতিতে যিনি বিপ্লবী, ধর্মবিশ্বাসে তিনি প্রথাগত। ধর্মবিশ্বাস তাঁর সংস্কৃতির অন্তর্গত ছিল, যে-জন্য তিনি তাঁর প্রধান রচনার বিষয়বস্তুর খোঁজে অন্যকোথাও যাননি, বাইবেলের বাইরে। ‘প্যারাডাইজ লস্ট’ অ্যাডাম ও ঈভের কাহিনী নিয়েই লেখা।
মিল্টন ছিলেন পিউরিটান। তিনি খৃষ্টধর্মের আদি বিশুদ্ধতায় বিশ্বাস করতেন। মানুষকে দেখতেন পতিত প্রাণী হিসেবে। পতনের চিহ্নগুলো নিত্য দেখতে পেতেন চোখের সামনে। রাজতন্ত্রের স্বৈরাচার, সামাজিক মানুষদের অনাচার, এসব দেখেছেন বলেই না ক্রমওয়েলের বিপ্লবে যোগ দিয়েছিলেন, সে-বিপ্লবের পক্ষে লিখে নিজের দুর্বল চোখ দু’টির শক্তি নিঃশেষ করেছিলেন এবং বিপ্লবী শক্তির পরাজয়ের পরে প্রতিবপ্লবীদের রাজত্বকালে অন্ধ-প্রায় নিঃসঙ্গ ও অত্যন্ত বিপন্ন জীবন যাপন করেও তার শ্রেষ্ঠ তিনটি রচনা রচিত করেছেন। মুখে মুখে।
 হ্যাঁ, মানুষের পতন কেন ঘটেছে তার ব্যাখ্যা মিল্টন ধর্মীয়ভাবেই করেছেন। তবে ওই কাঠামোর মধ্যে থেকে নতুনত্বও এনেছেন, নইলে মৌলিক লেখক হলেন কী করে? এটা তো স্পষ্টই যে জন মিল্টনের নৈতিকতা খৃষ্টধর্মীয় হলেও তার সৌন্দর্যদৃষ্টিটি ছিল খৃষ্টপূর্বীয়। সেখানে অখৃষ্টান গ্রীকদের প্রভাব অত্যন্ত প্রবল। সে-জন্যই মহাকাব্য লিখতে পেরেছেন। তাঁর মহাকাব্য ‘প্যারাডাইজ লস্ট’ নানাদিক দিয়েই গ্রীক আদলে তৈরি। আদিমাতা ঈভের নিরাবরণ সৌন্দর্যের বর্ণনা যখন দেন তিনি, তখন তাঁকে পিউরিটান মনে হয় না, মনে হয় পেগান। ঈভ অবশ্যই গ্রীকদের হেলেন নন। কিন্তু অনিন্দ্যসুন্দরী বটে। ফুলের ওপর ঝুঁকে পড়েন তখন ঈভ তখন ঘোরতর শত্রু যে স্যাটান তারও মনে হয় যে সবচেয়ে সুন্দর ফুলটিকে দেখছে। ঈভের আলুলায়িত কেশরাজি নেমে এসেছে সরু কোমর পর্যন্ত। কোথাও কোনো অপূর্ণতা নেই। ঈভ-বিষয়ে মিল্টনের আরেকটি নিজস্বতার জায়গা এখানে যে, এই নায়িকাকে তিনি একজন স্ত্রী হিসেবে উপস্থিত করেছেন। তেমনিভাবে অ্যাডামের পতনও একজন স্বামীরই পতন। এই স্বামী তাঁর স্ত্রীকে ভালোবাসেন, তাঁর দায়িত্ব নেন, কিন্তু তাঁকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন না। স্ত্রীর বুদ্ধিতেই ডুবলেন ওই স্বামী বেচারা। এবং ভবিষ্যতের সব মানুষকে ডুবিয়ে রেখে গেছেন। মিল্টন এভাবেই দেখেছেন আদি পিতা-মাতার পতনের ঘটনাকে।
মিল্টনকে নারী-বিদ্বেষী না বলে উপায় নেই। পিউরিটানরা মেয়েদেরকে পুরুষের সমান সমান মনে করেনি। তাঁদের দৃষ্টিতে অ্যাডামের পাপ ঈভের পথ ধরেই এসেছে। নইলে স্যাটানের পক্ষে সম্ভব ছিল না অ্যাডামকে বিচ্যুত করে। মিল্টনও তা-ই মনে করেন। কিন্তু এই সাধারণ জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল কবির একটি ব্যক্তিগত বিষয়। পারিবারিক অশান্তি। মিল্টনের দাম্পত্য জীবন সুখের হয়নি। চৌত্রিশ বছর বয়সে মিল্টন যে-মেয়েটিকে বিয়ে করেন তাঁর সঙ্গে কবির দূরত্ব ছিল যেমন বয়সের, তেমনি রাজনৈতিক বিশ্বাসের। বিয়ের সময় মেরি পাওয়েলের বয়স মিল্টনের বয়সের অর্ধেক। তদুপরি মেরী পাওয়েলের পরিবার ছিল রাজার পক্ষে। মিল্টন যখন বিপ্লবের জন্য সর্বস্ব নিয়োজিত করতে প্রস্তুত, কাজ করছেন রাতদিন, মেরী পাওয়েলের রাজভক্ত পরিবার তখন অপেক্ষা করছে কখন রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয় তার জন্য।
স্ত্রী মেরীর অনেকটা সময় কাটতো পিতৃগহে, পরে স্বামীগৃহে ফিরে এসেছেন বটে কিন্তু শত্রুপক্ষের ওই কন্যার সঙ্গে মিল্টনের দূরত্বটা ঘোঁচেনি। মেরী পাওয়েলের অকালমৃত্যু ঘটে। এরপর মিল্টন যাকে বিয়ে করেন তিনিও মারা গেলেন বৈবাহিক জীবনের সাত বছরের মাথায়। আবার বিয়ে করেছিলেন তিনি। তিনবার বিয়ে করলেন, কিন্তু কোনো বারই স্ত্রী সম্পর্কে উচ্চধারণা পোষণ করতে পারলেন না। তাঁর একমাত্র নাটক ‘স্যামসন অ্যাগনিস্টিস’-এ নায়ক স্যামসন যেমন স্ত্রী ডেলিলার ওপর অত্যন্ত রুষ্ট ছিলেন, অতটা না হলেও মিল্টন যথেষ্ট বিরূপ ছিলেন তাঁর স্ত্রীদের প্রতি। বিশেষ করে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে তো বনিবনাই হয়নি। এবং সেই বিদ্বেষ যেমন স্যামসন-ডেলিলার সম্পর্কে লিখবার সময়ে তেমনি অ্যাডাম-ঈভের দাম্পত্য জীবনকে চিত্রিত করবার ক্ষেত্রেও কার্যকর ছিল।
দুই .ঈভের জন্ম হয়েছে অ্যাডামের বুকের পাঁজর থেকে। এই জন্ম-বৃত্তান্তই বলে দিচ্ছে যে তারা সমান সমান নন। হওয়ার কোনো উপায়ই নেই। অ্যাডাম করেন চিন্তা, তাঁর রয়েছে সাহস। অন্যদিকে ঈভের গুণ হচ্ছে কোমলতা। তাঁর মধ্যে রয়েছে অ্যাডামকে আকর্ষণ করবার ক্ষমতা। অ্যাডাম হচ্ছেন শুধু ঈশ্বরের জন্য, আর ঈভ হচ্ছেন অ্যাডামের ভেতর যে-ঈশ্বরটি রয়েছেন তাঁর জন্য। ব্যাপারটা খুবই স্পষ্ট। মিল্টন কোনো অস্পষ্টতা রাখেননি, এই ব্যাপারে। নিষিদ্ধ ফলজনিত পতনের পর কবি সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন যে ঈভকে নষ্ট করেছে স্যাটান, আর অ্যাডামকে নষ্ট করলেন ঈভ। ঈভ অ্যাডামের সঙ্গী নন শুধু, ঈভ হচ্ছেন অ্যাডামের স্ত্রী। বিবাহিতা স্ত্রী। এই সম্পর্কটার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন পিউরিটান জন মিল্টন, যিনি বিবাহে বিশ্বাস করেন এবং স্বামী-স্ত্রীর সুসম্পর্কের ওপর ব্যক্তির সুখ-শাস্তির নির্ভরতা দেখতে পান। প্যারাডাইজ লস্ট’-এ বারম্বার তিনি বলেন অ্যাডাম ও ঈভের যে গভীর প্রেম ও ঘনিষ্ঠতা-তার কথা। প্রেমের নামে প্রচুর বেলেল্লাপনা দেখেছেন মিল্টন তাঁর সময়ে, রাস্তাঘাটে। অ্যাডাম-ঈভের সম্পর্কটা সে রকমের নয়। এঁরা শান্ত, এঁরা গৃহী, এঁদের বন্ধনটা নিবিড় এবং বিধিসম্মত।
এ দু’জনের দাম্পত্য সম্পর্কটা ছিল চিরকালের জন্য আদর্শস্বরূপ। মিল্টন তাই মনে করতেন। এঁরা সকালে ওঠেন সূর্য ওঠার আগে, তারপরে বের হয়ে যান কাজে। তাঁদের কাজ শ্রমজীবীর, কিন্তু বেতনভূক শ্রমিকের নয়। এ হচ্ছে স্বেচ্ছাশ্রম, এ হচ্ছে আনন্দের, এতে রয়েছে সৃষ্টির সুখ। নন্দনকাননে শ্রমের কী প্রয়োজন? ঈশ্বর তো সবকিছুই সরবরাহ করেছেন ওই দম্পত্তির জন্য। চাওয়া মাত্রই পাওয়া যায়, গাছে ফল আছে, ঝর্ণায় পানি, অভাব কিসের? কিন্তু জন মিল্টন আলস্যে নয়, বিশ্বাস করেন পরিশ্রমে। পিউরিটানরা তা-ই করতো, এ জন্য পুঁজিবাদের নিবির্মাণে তাদের একটা উল্লেখ্যযোগ্য ভূমিকা ছিল। পিউরিটানরা বিলাস করেনি, গা ঢেলে দেয়নি আলস্যে, শ্রম করেছে এবং সঞ্চয় করেছে, উদ্বৃত্ত। অ্যাডাম এবং ঈভ পুঁজিবাদী নন, কিন্তু অবশ্যই পরিশ্রমী। সকালে উঠে কাজে চলে যান হাত ধরাধরি করে। গাছগুলোর যত্ন নেন, ফুলগুলোকে মুক্ত করেন লতাপাতা থেকে। তাঁদের হাঁটার পথটা পরিষ্কার করা দরকার, সেটা করেন।
সুখে ছিলেন, অনাবিল শান্তিতে ছিলেন এই দম্পতি। একদিন হলো কি, ঈভের মনে হলো তাঁর কিছুটা স্বাধীনতা চাই। নিত্যদিন এবং সর্বক্ষণ স্বামীর সঙ্গে সঙ্গে থাকা, পিছু পিছু চলা, একত্র ওঠাবসা, এই ব্যাপারটা একঘেঁয়ে মনে হয়ে থাকবে ওই স্ত্রীর। বললেন, ‘চলো আমরা আলাদা আলাদা কাজ করি।’ যুক্তি ছিল। যুক্তি দিলেন। এক ঘেঁয়েমি লাগে এটা বললেন না, দিলেন তেমন যুক্তি যা পিউরিটান স্বামীর পছন্দ হবে। বললেন, ‘এই যে আমরা একসঙ্গে কাজ করি এতে কাজের ভারি ক্ষতি হচ্ছে। মনোযোগ যায় নষ্ট হয়ে। অকারণে কথাবার্তা বলি, কাজ ভুলে একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে তাকি, মুচকি মুচকি হাসি। তার চেয়ে বরঞ্চ আলাদা হয়ে দু’জন দু’জায়গায় কাজ করবো। তুমি যত্ন নেমে গাছের, আমি ফলের। সারা সকাল কাজ করবো, দুপুরে দেখা হবে, খাওয়ার সময়ে। মিলন আরো মধুর হবে ক্ষণবিরহের দরুন।’
অ্যাডাম তো কেবল প্রেমিক নন, ঈভের তিনি অভিভাবকও। কথাটা শুনে তিনি চমকে ওঠেন, প্রমাদ গোণেন। তাঁদের এক শত্রু আছে, মহাশত্রু। সেই শত্রু এই বাগানের চারপাশে ঘুরঘুর করছে। অ্যাডাম ও ঈভকে সে বিপদে ফেলবে। এ-বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে গিয়েছেন এক দেবদূত। সেই শত্রু সুযোগ খুঁজছে, ঈভকে একা পেলে না-জানি কোন শয়তানি করে।
কিন্তু ঈভের মাথায় রোখ চেপেছে। তিনি স্বাধীনতা চান। আদি মাতাই হচ্ছেন স্ত্রী-স্বাধীনতার প্রথম দাবীদার। মুখ ফুটে বলেননি যে, স্বাধীনতা চান, সেই বোধটি তখনো তৈরি হয়নি। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে যে, তিনি স্বতন্ত্র একটু জায়গা চান, যেখানে তিনি কিছুক্ষণের জন্য হলেও নিজেকে পাবেন, আলাদা করে। অ্যাডাম ঈভকে ভালোবাসেন, নিজেরই অংশ হিসেবে। দুষ্ট মেয়েটিকে যে ধমকে দেবেন সে-উপায় নেই; তাকে তিনি বোঝাতে চান, কিন্তু ঈভ বুঝ মানেন না। অ্যাডাম বলেন, কাজটা ঠিক হবে না। তোমার বিপদ হতে পারে। বলেন, ‘আর ওই যাকে অপচয় বলছো, সেটি মোটেই অপচয় নয়। আলাপ-সালাপ, স্মিত হাসি, এসব খুবই দরকার সুস্থ জীবনের জন্য; ইতর প্রাণী এসব রতে পারে না, মানুষই শুধু পারে।’
ঈভ তর্ক করেন। বলেন, ‘বুজেছি আমার ওপর তোমার আস্থা নেই। আমাকে তুমি তোমার সার্বক্ষণিক ছায়া করে রাখতে চাও। স্বাতন্ত্র্য দেবে না। আমরা তো এখানে স্বাধীন, কিন্তু সে তেমন স্বাধীনতা যেখানে গণ্ডির বাইরে পা-দেওয়ার উপায় নেই? বিশ্বাস, প্রেম, সদগুণ-এরা এমন কোন গুণ হলো যদি সর্বদা পর নির্ভরশীল থাকে? না-দাঁড়ায় নিজের পায়ে? আমাদের সুখ খুবই ভঙ্গুর যদি তাকে এমন ভয়ঙ্কর মনে করি, যদি কাঁপি আমরা সর্বক্ষণ শত্রুর ভয়ে। আমরা তো স্বামী-স্ত্রী। আমাদের প্রেম বিবাহিত প্রেম, সেখানে বিচ্যুতি আসবে কেন?’ ঈভ এমনিতেই পরমানুসন্দরী, তিনি আরো সুন্দর হয়ে ওঠেন যখন তর্ক করেন। এতোকাল স্বামীকে বলে এসেছেন তিনি, ‘ঈশ্বর হচ্ছেন তোমার আইন, তুমি আমার।এর চেয়ে অধিক জানার নেই, অধিক না-জানাই হচ্ছে নারীর জন্য সর্বাধিক সুখকর জ্ঞান।’ সেই ঈভের একী ভিন্ন কথা। পা রাখতে চাইছেন বৃত্তের বাইরে। স্বামী ভয় পান, তাঁর বুক কাঁপে, কিন্তু তিনি বাধ্য হন স্ত্রীকে সকালবেলার জন্য স্বাধীনতা দিতে।
ওটাই প্রথম বিচ্যুতি। স্বামীর দিক থেকে খানিকটা, স্ত্রীর দিক থেকে ততোধিক। ওই বিচ্যুতির পথ ধরেই বিপদ এসেছে। এগিয়ে এসেছে মহাশত্রু স্যাটান, তার প্রতিহিংসাপরায়ন দুষ্টবুদ্ধি নিয়ে। নন্দনকাননে স্যাটান ঢুকেছে কুয়াশা হয়ে, ভিতরে ঢুকে রূপ নিয়েছে সর্পের। তাতে আত্মগোপনের পক্ষে বিশেষ সুবিধা। এর আগে স্যাটান ওই কানন প্রদক্ষিণ করে দেখেছে, বাইরে থেকে। দেখেছে অ্যাডাম ও ঈভকে হাত ধরাধরি করে চলতে। তার ভারি ঈর্ষা হয়েছে, এদের সুখ দেখে। ঠিক করেছে এদেরকে প্ররোচিত করবে নিষিদ্ধ ফল-ভক্ষণে। তাতে প্রতিশোধ নেয়া হবে ঈশ্বরের ওপর, যিনি তাকে বিতাড়িত করেছেন স্বর্গ থেকে এবং প্রিয়পাত্র হিসেবে বিশেষ আগ্রহে যিনি সৃষ্টি করেছেন এই নতুন প্রাণী দু’টিকে -অ্যাডাম ও ঈভকে। সিদ্ধান্তটা আগেরই ছিল, এখন আরো দৃঢ় হলো।
স্যাটান যেটা আশা করতে সাহস করেনি, দেখলো সেটাই ঘটে গেছে। ঈভ আলাদা হয়ে গেছে অ্যাডাম থেকে। অ্যাডামকে দেখে চতুর স্যাটান বুঝেছে যে, ওখানে সুবিধা হবে না। অ্যাডামের রয়েছে উচ্চতর বুদ্ধি ও সাহস, তাকে নয়, দলে ভিড়াতে হবে ঈভকে। একাকিনী কর্মরতা ঈভের কাছে গেছে স্যাটান। সাপের বেশে গিয়ে মেয়েটির কৌতূহল জাগিয়েছে, তার রূপের গুণগান গেয়েছে, এবং প্ররোচিত করেছে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খেতে।
তিন. ঈভই খেলেন প্রথমে। তারপরে স্ত্রীর অনুরোধে খেলেন অ্যাডাম। খাবার প্রথম প্রতিক্রিয়া হচ্ছে লালসা। লালসায় উন্মত্ত হয়ে ঈভ জড়িয়ে ধরেন অ্যাডামকে। অ্যাডাম সাড়া দেন সানন্দে। এতকাল অ্যাডামই ছিলেন প্রথম এবার তিনি দ্বিতীয় হয়ে গেলেন। আরেক প্রতিক্রিয়া কলহ। অবিশ্বাস, সন্দেহ, কলহ এসব কি বস্তু তারা জানতেন না; এখন জানলেন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কলহের সূত্রপাত আদিপিতা ও আদিমাতাই ঘটান, পতনের পরে। ক্রোধে অন্ধ হয়ে স্ত্রীকে বলেছেন অ্যাডাম, ‘আমার সামনে থেকে দূর হ তুই, মিথ্যাবাদী।’ জন মিল্টন জানাচ্ছেন আমাদেরকে যে, স্বরটা যেমনই হোক না কেন, অভিযোগটা মিথ্যা নয়। নন্দনকাননে প্রথম মিথ্যাটা স্যাটানই বলে, ঈভকে, যখন সে জানায় যে জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেয়েই সে মানুষের মতো কথা বলবার ক্ষমতা পেয়েছে। দ্বিতীয় মিথ্যার বক্তা হচ্ছেন ঈভ। স্বামীকে তিনি বলেছেন, ‘এই ফল খেলে কোনো বিপদ হবে এমন যদি মনে করতাম, তাহলে বিশ্বাস করো, কিছুতেই তোমাকে খেতে বলতাম না।’ সত্য হলো উল্টোটা। খাবার পরে ঈভ খুবই ভয় পেয়েছেন, মৃত্যুকে। তাঁর মন বলেছে, হায় হায়, এই ফল তো খেলাম, এতে যদি আমার মৃত্যু হয়, তাহলে অ্যাডাম তো অন্য কোনো ঈভকে খুঁজে নেবে এবং তাকে বিয়ে করবে। স্ত্রীর ভয়, স্বামীকে নিয়ে। স্বামী আবার বিয়ে করবেন এবং আশঙ্কায় জড়িত হয়েই ছুটে এসেছেন তিনি অ্যাডামের কাছে। সাধাসাধি করেছেন তাকে ফল খেতে।
কিন্তু অ্যাডাম কেন সম্মত হলেন ওই পাপ কর্মে? তিনি কি ভুলে গিয়েছিলেন যে, এর শাস্তি হবে অমরত্ব হারিয়ে মরণশীল হওয়া? না, ভোলেননি। তিনি জানতেন। বিলক্ষণ জানতেন। কিন্তু তবু ওই বিপজ্জনক পাপাচার না করে তাঁর উপায় ছিল না। কারণ হচ্ছে ভেতরের তাগিদ। তিনি অনুভব করেছেন স্ত্রীকে ছেড়ে তিনি বাঁচবেন না। তাঁর জন্য সে-জীবন হবে মৃত্যুতুল্য। স্ত্রীকে হারানো মানে নিজেকেই হারানো। তাই জেনেশুনেই তিনি ফল খেলেন। তাঁর পতন স্বামী হিসাবে। জগতের প্রথম স্ত্রৈণ স্বামী অন্য কেউ নন, আদি পিতা স্বয়ং। মিল্টন সেভাবেই দেখিয়েছেন ব্যাপারটাকে।
চার. এ কাহিনী থেকে কয়েকটি সিদ্ধান্তে পৌঁছা খুবই সহজ। এক. স্ত্রী-বুদ্ধি প্রলয়স্করী। দুই. স্ত্রী-স্বাধীনতা বিপজ্জনক। তিন. স্ত্রৈণ স্বামীদের বিপদ অনিবার্য। চার. মেয়েদের কৌতূহল জাগানো সহজ, এবং তাদেরকে কাবু করবার নির্ভরযোগ্য পথ হচ্ছে চাটুকারিতা। ‘প্যারাডাউজ লষ্ট’ এসব সিদ্ধান্তকে কেবল যে উৎসাহিত কে তা নয়, এসবের দিকেই পাঠককে ধাবিত করতে চায়।
কিন্তু আপাততের গভীরে আরো একটি সত্য রয়ে যায়। ওই সত্যটি মিল্টন তাঁর মহাকাব্য থেকে অবলুপ্ত করে দিতে পারেননি। না পারার কারণ শিল্পী হিসাবে তাঁর এই অনুভব যে, দুর্ভোগ ঈভকেই পোহাতে হয়েছে, অধিক পরিমাণে। ঈভকে পেয়েছে অনুশোচনায়। আমরা দেখি অ্যাডামের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ছেন তাঁর অনুতপ্তা স্ত্রী। বলছেন, ‘আমি পাপীয়সী। তুমি পাপ করেছো কেবল ঈশ্বরের বিরুদ্ধে, আর আমি করেছি তোমার এবং ঈশ্বর উভয়ের বিরুদ্ধে।’ বলছেন, তিনি সন্তানহীনা থাকবেন, নশ্বর মানুষদের জন্ম না দিয়ে। বলছেন, তিনি আত্মঘাতী হবেন। স্বামীকেই তখন এগিয়ে আসতে হয়। বলতে হয়, হতাশ হলে চলবে না, চলো, আমরা প্রার্থনা করি ঈশ্বরের কাছে, ভিক্ষা করি তাঁর ক্ষমা। অ্যাডামের তুলনায় ঈভের শাস্তিটাও বড়। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্য অবধারিত হচ্ছে মৃত্যু। কিন্তু ঈভের জন্য আরো একটি যন্ত্রনা নির্দিষ্ট হয়ে রইলো। সেটি সন্তান-ধারণের কষ্ট।
আর স্বাধীনতা? ওই যে সামান্য স্বাধীনতাটুকু চেয়েছিলেন, ‘অল্পক্ষণের জন্য হলেও দাঁড়াতে চেয়েছিলেন নিজের পায়ে, সেটি কি বিচ্যুতি ছিল, ছিল কি অপরাধ? হ্যাঁ, কাজটা মিল্টন সমর্থন করেননি। অবশ্যই নয়। তাঁর মনের ভেতর নারী-বিদ্বেষের আস্তানাটা যে বেশ শক্তিশালী ছিল সেটাও মানতেই হবে। কিন্তু তবু তাঁর পক্ষে স্বাধীনতার স্পৃহাকে ধিক্কার জানানো সহজ ছিল না। নিজের সারা জীবন ছিলেন রাজনৈতিক স্বাধীনতার পক্ষে। মতামত প্রকাশের অধিকার দিতে চেয়েছেন, নাগরিকদেরকে। বিরুদ্ধে ছিলেন স্বৈরাচারের, যে জন্য যোগ দিয়েছিলেন বিদ্রোহীদের দলে। ‘প্যারাডাইজ লস্ট’-এর পাঠমাত্রই লক্ষ্য করছেন যে, মিল্টনের দিক থেকে যথেষ্ট সহানুভূতি ছিল স্যাটানের প্রতি; কেউ কেউ তো এমনও মনে করেন যে, মিল্টন আসলে ছিলেন স্যাটানের পক্ষেই, যদিও তিনি তা জানতেন না। তাই আদিমাতার ওই প্রথম বিচ্যুতি, ওই যে তাঁর স্বাধীনতা চাওয়া সেটা একটা সরল বিষয় ছিল না এই মহাকবির কাছে। জটিলতা ছিল। অবশ্যই বিরূপতা ছিল, কিন্তু গোপন পক্ষপাত যে ছিল না তাও নয়। পলাতক ও গৃহপালিত সত্যকে প্রশংসা করেননি তিনি, তাঁর ‘অ্যারিওপেজিটিকা’ নামের বইতে। অনুগত ঐকমত্যকে বরঞ্চ ঘৃণাই করেছেন, সারা জীবন।