17-Mon-Dec-2018 07:38am

Position  1
notNot Done

নিজের কাপড় ছিঁড়ে বেঁচেছিল মেয়েটি

Zakir Hossain

2018-05-22 14:56:32

জাকির হোসেন: ১৯৭২ সালে ক্রন্দরত এক ভিয়েতনামী কিশোরীর ছবি সারা বিশ্বে তোলপাড় তুলেছিল৷ ভিয়েতনামে যুক্তরাষ্ট্রের ছোঁড়া নাপাম বোমার নির্মম শিকার হয়ে ছিল ৯ বছর বয়সী এই মেয়েটি। যুদ্ধের সময় প্রাণ বাঁচাতে তার পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল একটি প্যাগোডায় ৷ সেই প্যাগোডায়ও আঘাত হানে নাপাম বোমা৷ হঠাৎ মেয়েটি দেখতে পায় তার কাঁধে আগুন৷ সব মানুষ আতঙ্কে ছুটছে৷ মেয়েটিও কাঁদতে কাঁদতে ছুটতে শুরু করে৷ গায়ের আগুন নেভানোর চেষ্টা করে কাজ হয় না, বুদ্ধি করে নিজের কাপড় ছিড়ে ফেলে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়াতে থাকে৷ এ ছবির জন্য ১৯৭৩ সালে পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছিলেন ফটোগ্রাফার নিক উট৷৷ কিম ফুক নামটি তখন থেকেই পরিচিত৷ সেদিনের ছোট্ট মেয়েটি পোড়া শরীরের যন্ত্রণা এবং ঘৃণা ভুলে ধরেছে সেবার পথ৷ এখন যুদ্ধাহত সেনাদের সেবা করেই দিন কাটে কিম ফুক-এর৷
নয় বছরের সেই মেয়েটির ২০১৫ সালে তোলা ছবি
কোথায় আছেন, কী করছেন এখন কিম ফুক? এই কৌতূহলই মিটিয়েছে রয়টার্স ফাউন্ডেশনের একটি সাক্ষাৎকার, যেখানে ফুক নিজেই জানিয়েছেন তাঁর বর্তমান জীবনের খুঁটিনাটি সব কথা৷ সেখানেই বেরিয়ে এসেছে এমন একটি তথ্য যা শুনে অনেকেই হয়তো অবাক হবেন – নাপাম বোমায় শরীরের ৬৫ ভাগ পুড়ে গিয়েছিল যাঁর, সেই কিম ফুক এখন যুদ্ধাহত সৈন্যদেরই সেবা করেন৷
১৯৭২ সালে নাপাম বোমায় গা ঝলসে যাবার পর ভিয়েতনাম থেকে কিউবায় চলে গিয়েছিলেন কিম ফুক৷ কিউবা থেকে পাড়ি জমান ক্যানাডায়৷ ক্যানাডার টরন্টোতেই ‘রেস্টোর হিরোজ' নামের একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের হয়ে যুদ্ধাহত সেনাদের সেবা করছেন ৫২ বছর বয়সি কিম ফুক৷ সমাজকর্মী স্বামী আর দুই সন্তান নিয়ে সুখেই আছেন কিম ফুক৷ স্বামী-সন্তানই অবশ্য সুখের একমাত্র উৎস নয়৷ বরং মূল উৎস ক্ষমা এবং সেবা৷ ফুক জানিয়েছেন, নাপাম বোমায় শরীর ঝলসে যাওয়ার পর দীর্ঘদিন এক ধরণের ক্ষোভ আর হতাশাকেই আঁকড়ে ধরে ছিলেন৷ প্রায়ই ভাবতেন, ‘‘আমার সঙ্গেই কেন এমন হলো? আমাকেই কেন এমন কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে? আমি তো সোজা-সরল বাচ্চা একটি মেয়ে, জীবনে এমন কোনো ভুল তো করিনি যার জন্য এমন শাস্তি পেতে হবে!''
এমন ভাবনা কষ্টই শুধু বাড়াতো৷ এক সময় খ্রিস্টান ধর্ম করে নাকি সেই কষ্ট থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছেন কিম ফুক৷ তাঁর ভাষায়, ‘‘ঘৃণা আর তীব্র কষ্টানুভূতি নিয়ে বেঁচে থাকার ওই সময়টায় বেশ কয়েকবার আমি মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছেছিলাম৷ যখন আমার দুর্ভোগের জন্য দায়ীদের ক্ষমতা করতে শিখলাম তখন থেকে যেন আমার পৃথিবীতে স্বর্গ নেমে এসেছে৷ ''
এখন ‘রেস্টোর হিরোজ'-এর হয়ে যুদ্ধাহতদের সেবা করেন কিম ফুক৷ এক সময় ইউনেস্কোর শুভেচ্ছা দূত হিসেবে কাজ করা ফুক যুদ্ধের নির্মমতার শিকারদের সহায়তা করার জন্য একটা ফাউন্ডেশনও খুলেছেন৷ ফাউন্ডেশনটি মূলত যুদ্ধাহত বা যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের নিয়ে কাজ করে৷

প্রসঙ্গ ভিয়েতনাম যুদ্ধ: ভিয়েতনামের যুদ্ধ ছিল বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে বেশ জটিল এক যুদ্ধ।  ১৯৫৫ সালের  ১ মে শুরু হয় ভিয়েতনাম যুদ্ধ, যা আঞ্চলিক একটি সংঘাত থেকে রূপ নেয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর পেশীশক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র হিসেবে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পটভূমি গড়ে উঠে সেই ১৯৫০ এর দশকের গোড়ার দিকে। ১৯৪৬ সাল  থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত ভিয়েতনামের জনগণ ফরাসি উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিল। এই যুদ্ধকে বলা হয় প্রথম ইন্দোচীন যুদ্ধ। এই যুদ্ধের শেষে ভিয়েতনাম ফরাসি শাসন থেকে মুক্ত হয়। কিন্তু ভিয়েতনামকে তখন উত্তর ও দক্ষিণ নামে দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়। এই বিভাজনে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় পুষ্ট দল উত্তর ভিয়েতনামের নিয়ন্ত্রণ পায়। অন্যদিকে দক্ষিণ ভিয়েতনাম পায় সমাজতন্ত্র-বিরোধী দল। উত্তর ভিয়েতনামের শাসকরা উভয় ভিয়েতনাম একত্রিত করে একটি অখণ্ড ভিয়েতনাম গঠনের জন্য চেষ্টা শুরু করে। এই সময় উত্তর ভিয়েতনামের এই উদ্যোগকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রাণপণে বাধা দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে যে, যদি উভয় ভিয়েতনাম মিলিত হয়ে একটি শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠিত হয়, তা হলে সমাজতন্ত্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়বে। এবং এই সূত্রে ওই অঞ্চলে তাদের আধিপত্য ক্ষুণ্ণ হবে এবং একই সাথে সোভিয়েত রাশিয়া বা চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাবে। এই ভাবনা থেকে  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ভিয়েতনাম সরকারকে সহায়তা দেওয়া শুরু করে।  যদিও দক্ষিণ ভিয়েতনামের সাধারণ মানুষদের একটি বিশাল অংশ সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার প্রতি অনুরক্ত ছিল। দক্ষিণের সরকার সমাজতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন মানুষের উপর নিপীড়নমূলক আচরণ শুরু করে। এরই প্রতিবাদে দক্ষিণ ভিয়েতনামে শুরু হয় আন্দোলন ।
১৯৬০ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনামের সরকারকে উৎখাতের লক্ষ্যে ‘ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট’  গঠিত হয়। ধীরে ধীরে এই বিরোধিতা যুদ্ধে পরিণত হয়। প্রায় পাঁচ বছরের এই অভ্যন্তরীণ এই সংঘাতে দক্ষিণ ভিয়েতনামের পরাজয় স্পষ্ট হয়ে উঠে। ১৯৬৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ভিয়েতনামি সরকারের পতন ঠেকাতে সেখানে সৈন্য পাঠায়। এর ফলে এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নেয়। প্রথম দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ভিয়েতনামের উল্লেখযোগ্য অঞ্চল নিজেদের অধিকারে আনতে পারলেও বামপন্থীদের গেরিলা আক্রমণের মুখে পড়ে। মার্কিন সৈন্যরা ব্যাপকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হতে থাকে।
১৯৬৮ সালে নিক্সন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ভিয়েতনামে যুক্তরাষ্ট্রের নৃশংসতা বেড়ে যায়। এই সময় মার্কিন সৈন্যরা গণহত্যা শুরু করে।  এই যুদ্ধে মার্কিন বিমানবাহিনী নাপাম বোমা নিক্ষেপ করে, চরম নৃশংসতার পরিচয় দেয়। এই বৎসরের ১৬ মার্চ দক্ষিণ ভিয়েতনামের মাই লাই গ্রামে মার্কিন সেনাবাহিনী গণহত্যা চালায়। ধারণা করা হয়, এই সময় প্রায় পাঁচশ লোক এতে নিহত হয়।
মার্কিন সৈন্যরা নির্মমভাবে গেরিলা এবং সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার করেও এই যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়। এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি সম্মানজনক উপায় বের করার চেষ্টা করে। এই লক্ষ্যে তারা সমাজতান্ত্রিক যোদ্ধাদের সাথে ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে প্রকাশ্যে এবং গোপনে বেশ কিছু বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে আলোচনার মাধ্যমে একটি সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করা হয়। এই সময়ে ভিয়েতনামের পক্ষ থেকে জুয়ান থুই, লি ডাক থো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার আলোচনা করেন।
এসব বৈঠকের ফলে ১৯৭৩ সালের ২৩ জানুয়ারি প্যারিসে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তিতে ৮০দিনের মধ্যে মার্কিন যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দেয়া, যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং দক্ষিণ ভিয়েতনামে সাধারণ নির্বাচন দেওয়ার বিষয়ে দুই পক্ষ ঐক্যমত্যে পৌঁছায়। ২৩ জানুয়ারি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর হলেও, কিছু অঞ্চলে তখনও যুদ্ধ অব্যাহত ছিল। ইতিমধ্যে ২৯ মার্চের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সেনা প্রত্যাহার করে। কিন্তু উত্তর ভিয়েতনামে বোমাবর্ষণ অব্যাহত ছিল। এরই সূত্রে উভয় পক্ষই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে। ১৯৭৩ সালের মে ও জুন মাস পর্যন্ত কিসিঞ্জার এবং থো শান্তি চুক্তির উত্তরণে প্রচেষ্টা চালান। ১৯৭৩ সালের ১৩ই জুন,  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর ভিয়েতনাম যৌথভাবে প্যারিস চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্বাক্ষর করে। ১৯৭৫ সালে সাম্যবাদী শাসনের অধীনে দুই ভিয়েতনাম একত্রিত হয়। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে এটি সরকারীভাবে ভিয়েতনাম সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র নাম ধারণ করে।
এই যুদ্ধে ভিয়েতনামের প্রায় ৩২ লাখ মানুষ মারা যায়। সেই সঙ্গে আরও প্রায় ১০ থেকে ১৫ লক্ষ লাওস  ও ক্যাম্বোডীয় জাতির লোকও শিকার হন এই যুদ্ধের। আর মার্কিনীদের পক্ষে প্রায় ৫৮ হাজার সেনা নিহত হন।
ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিনিরা  সপ্তম নৌবহর ব্যবহার করে। এই নৌবহর থেকে পরিচালিত হয় ভিয়েতনামের অভ্যন্তরে বিমান আক্রমণ। ভিয়েতনামের পাহাড়ি জঙ্গলময় অঞ্চলে সৈন্য সরবরাহ, সৈন্যদের রসদ যোগানো, সুনির্দিষ্টভাবে কোনো জায়গায় আঘাত হানার জন্য ব্যবহার করা হয় নানা ধরনের প্রায় ১২,০০০ হেলিকপ্টার। প্রায় ৫,০০০ হেলিকপ্টার ভিয়েতনামী গেরিলারা ধ্বংস করে দেয়।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার  চার দশক পরেও ভিয়েতনামিরা ভুলতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্রের বর্বরতাকে। মার্কিন প্রশাসনের মুখটি ভিয়েতনামিদের স্মৃতিতে ঘৃণা হয়ে রয়েছে আজও। আধুনিকতার নামে, গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে হত্যাকাণ্ড চালায় ভিয়েতনামে, হয়তো ভিয়েতনামিরা কোনো দিন ভুলেও যেতে পারে তা, কিন্তু ইতিহাস কখনো ভুলবে না।