19-Wed-Dec-2018 02:30pm

Position  1
notNot Done

নির্বাচনী ইশতেহার বিএনপি-২০০১

Zakir Hossain

2018-02-9 15:59:00

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি 


পরিচ্ছেদ-১

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা- উত্তর বাংলাদেশ

১.১ স্বধীনতার প্রেক্ষাপট, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জিয়াউর রহমান:

১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসনের অবসান হলেও এদেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। পাকিস্তানী আমলে শুরু হয় নিপীড়ন, নির্যাতন ও শোষনের এক নতুন অধ্যায়। প্রতিবাদে দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিরোধের আণ্দোলন।১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের নির্বাচন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর এলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতার সংগ্রাম।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী যখন এদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর বর্বরের মতো ঘৃণ্য হামলা চালায় তখন এর আকস্মিকতায় দিশেহারা হয়ে পড়ে সবোর্স্তরের জনগণ। সেই সমস্যা একটি নেতৃত্ব, একটি আহ্বানের বড়ই প্রয়োজন ছিল। সেই ঐতিহাসিক মুহুর্তে ভেষে এল একটি কন্ঠ:‍” আমি মেজর জিয়া বলছি” এবং সেই সঙ্গে ঘোষণা এল বাংলাদেশের স্বাধীনতার, আহ্বান এল সর্বশক্তি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার। এই আহ্বানে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ-কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, যুবক, বুদ্ধিজীবি, সৈনিকসহ আপামর জনসাধারন– ঝাঁপিয়ে পড়ল মুক্তিযুদ্ধে। বৃহত্তর চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা জেলার কিয়দংশে মেজর জিয়া সংগঠিত করেন সংগঠিত করেন মুক্তিপাগল সকল শ্রেণীর মানুষকে এবং পরবর্তীতে বিখ্যাত ‘জেড ফোর্সের’ অধিনায়ক হিসেবে সিক্রয়ভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নেতৃত্ব দেনসেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে। দীর্ঘ নয় মাস মরণপণ লড়াই করে অজির্ত হল সবুজ জমিনে ওপর রক্তলাল সূর্যখচিত পতাকাসমৃদ্ধ স্বাধীন বাংলাদেশ– আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। লাখো শহীদের পবিত্র রক্ত আর হাজার হাজার মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অজির্ত হল এদেশের স্বাধীনতা। গণতন্ত্র এখানে সুপ্রতিষ্ঠিত হবে, শোষন বঞ্চনার অবসান ঘটবে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জিত হবে এবং আত্মনির্ভরশীল ও মর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াব– এই ছিল সেদিনের স্বপ্ন, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

লাখো শহীদের পবিত্র রক্ত আর হাজার হাজার মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অজির্ত হল এদেশের স্বাধীনতা। গণতন্ত্র এখানে সুপ্রতিষ্ঠিত হবে, শোষন বঞ্চনার অবসান ঘটবে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জিত হবে এবং আত্মনির্ভরশীল ও মর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াব–

১.২ স্বাধীনতা পরবর্তী দুঃশাসন:

ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে মুক্তিযুদ্ধের এই চেতনা, দেশবাসীর সেদিনের স্বপ্ন কিছু দিনের মধ্যেই ধুলিসাৎ হয়ে গেল। সীমাহীন দুর্নীতি, অনাচার, স্বজনপ্রীতি, অযোগ্যতা আর অপশাসনের ফলে আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে দেশের ভাগ্যে জোটে ‘তলাহীন ঝুড়ির’ মতো লজ্জাজনক খেতাব। হত্যা, অপহরণ, ছিনতাই নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হল। ক্ষুব্ধ জনগণকে দমন করার জন্য রক্ষীবাহিনী, সেচ্ছাসেবক বাহিনী, লালবাহিনীসহ নানা দলীয় বাহিনী গঠন করা হল। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের রক্ষক দেশপ্রেমিক স্বতস্ত্র বাহিনীকে উপেক্ষা ও অবজেলা করা হল, প্রতিষ্ঠা করা হল সমান্তরাল নতুন বাহিনী। এই সব দলীয় বাহিনীর হাতে সিরাজ শিকদারসহ প্রায় ৩০ হাজার রাজনৈতিক নেতা- কর্মী ও মুক্তিযোদ্ধা প্রাণ হারাল। অবাধ চোরাচালানী, মজুদদারি, দূর্নীতি ও অযোগ্য শাসনের ফলে দেশে সৃষ্টি হল শতাব্দীর ভয়াবহতম মানবসৃষ্ট দুভিক্ষ। রাজধানী ঢাকার রাস্তাঘাটে তখন অভুক্ত অবস্থায় পড়ে থাকত হাজার হাজার বিবস্ত্র নরকঙ্কাল।

এই অসহনীয় পরিস্থিতিতে দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠী যখন প্রতিবাদে মুখর, ঠিক সেই সময় ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে সংবিধান পরিবর্তন করে মহান স্বাধীনতার ফসল গণতন্ত্রকে হত্যা রকরা হল, প্রতিষ্ঠা করা হল‌’বাকশাল’ অর্থাৎ এক ব্যাক্তির শাসন। মাত্র ৪টি সংবাদপত্র সরকারের নিয়ন্ত্রণে রেখে বাকি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হল। সরকারি কর্মচারি, পুলিশ, বিডিঅআর এবং স্বতস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বাধ্যতামূলকভাবে বাকশালের সদস্য করে নিয়ে আসা হল দলীয় রাজনীতিতে। বিচারপতিদের নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সবোর্চ্চ আদালতের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে সরকারের নির্বাহী প্রধান রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ন্যম্ত করার মাধ্যমে হরণ করা হল বিচার বিভাগের স্বাধীনতা।

১.৩ আওয়ামী লীগের একাংশ কর্তৃক জারিকৃত সামরিক আইন ও সিপাহী-জনতার বিপ্লব:

আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে ক্ষমতার লড়াই যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছে তখন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর ও তার মন্ত্রিসভায় জোষ্ঠ মন্ত্রী খোন্দকার মোশতাক আহমেদ ঐ মন্ত্রীসভার অধিকাংশ সদস্যসহ সরকার গঠন করেন। আওয়ামী লীগের এই বিদ্রোহী অংশই দেশে প্রথমবারের মত সামরিক আইন জারি করে। অল্পদিন পরে ৩রা নভেম্বর ১৯৭৫ তারিখে আওয়ামী লীগ সমর্থক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে খোন্দকার মোশতাক আহমেদের সরকারকে উৎখাত করেন। সেই সঙ্গে স্বগ্রহে অন্তরীন করেন স্বাধীনতার ঘোষক বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান, বীর উত্তম-কে। এই পরিস্থিতিতে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ার আশংকা দেখা দিলে ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর দেশপ্রেমিক সিপাহী-জনতার এক অভুতপূর্ব বিপ্লব সংগঠিত হয়। সিপাহী-জনতা বন্দীদশা থেকে মুক্ত করে বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানকে যার ওপরে পরবর্তিতে অর্পিত হয় রাষ্ট্র পরিচালনার গুরু দায়িত্ব।

এই ছিল সেদিনের স্বপ্ন, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। কিন্তু আওয়ামী লীগের রক্ষক্ষয়ী ক্ষমতার লড়াইয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব যখন বিপন্ন তখন ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর সংগঠিত হয় দেশপ্রেমিক সিপাহী জনতার এক অভূতপূর্ব বিপ্লব। সিপাহী-জনতা বন্দীদশা থেকে মুক্ত করে বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানকে যার ওপরে পরবর্তিতে অর্পিত হয় রাষ্ট্র পরিচালনার গুরু দায়িত্ব। একদলীয় বাকশাল প্রথার স্থলে বহুদলীয় বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল।

১.৪ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের অভ্যুদয়, আদর্শ ও উদ্দেশ্য:

স্বাধীনতার পরবর্তি সময়ে যখন একনায়কতনত্র দেশে স্বাধীনতা- সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মপরায়ণতার সমাধি রচনা করতে উদ্যত হয়েছিল তখন জিয়াউর রহমানের সামনে প্রধান দায়িত্ব হিসেবে দেখা দেয় ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সুসংহত করা এবং একদলীয় ও একনায়কীয় বাকশাল প্রথার স্থলে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐতিহ্যের ধারক এই দলের মূল চালিকা শক্তি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।সকল ধর্ম, বর্ণ ও গোষ্ঠির মানুষকে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের পতাকাতলে সমবেত করে দেশ গড়ার সংগ্রামে পরিচালিত করাই হচ্ছে বিএনপির লক্ষ্য। সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের উদ্দেশ্যে অর্থনৈতিক প্রচেষ্টায় সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, সকল মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকার সমুন্নত রাখা এবং বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে একটি ‘তলাহীর ঝুড়ি’ থেকে আত্মমর্যাদাশীল উন্নত দেশে পরিণত করার আদশের্ উদ্বুদ্ধ হয়ে বিএনপি তার সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। সস্তা, চটুল, ভাওতাবাজি ও ধ্বংসের রাজনীতির স্থলে এদেশে উৎপাদন ও উন্নয়নের রাজনীতির প্রবর্তন করে বিএনপি।

১.৫ শহীদ জিয়ার আমলেদেশের স্বর্ণযুগ (নভেম্বর ১৯৭৫-মে ১৯৮১):

জিয়াউর রহমান দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করার কিছু দিনের মধ্যেই দেশে আইনের শাসন পুন:প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশ গড়ার এবং জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ছুটে বেড়িয়েছেন। নিজ চোখে তিনি মানুষের সমস্যা দেখেছেন, দেশের সমস্যা অনুধাবন করেছেন। দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা নিয়েছেন। জনগণকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। দেশবাসী তার ডাকে সাড়া দিয়েছিল। রাষ্ট্রপতি জিয়া গড়ে তুলেছিলেন সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য। উন্নয়ন কার্যক্রমে সঞ্চারিত হয়েছিল দূর্বার গতি। সন্ত্রাসের করাল ছায়া থেকে মুক্ত স্বদেশে প্রথমবারের মত বইল শান্তির সুবাতাস, অস্থিতিশীলতা থেকে উত্তোরণ হলো স্থিতিশীলতায়। অবসান হল রাজনৈতিক শূণ্যতার। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণ করার পর প্রায় ১০ হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

জিয়া প্রবর্তিত উন্নয়নের রাজনীতির কতিপয় সাফল্য:

সকল দলের অঃশগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান; জাতীয় সংসদের ক্ষমতা বৃদ্ধি; বিচার বিভাগ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়া; দেশে কৃষি বিপ্লব, গণশিক্ষা বিপ্লব ও শিল্প উৎপাদনে বিপ্লব; সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের লেক্ষ্য স্বেচ্ছাশ্রম ও সরকারী সহায়তায়র সমন্বয় ঘটিয়ে ১৪০০ খাল খনন ও পুনর্খনন; গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রবর্তন করে অতি অল্প সময়ে ৪০ লক্ষ মানুষকে অক্ষরজ্ঞান দান; গ্রামাঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা প্রদান ও গ্রামোন্নয়ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী (ভিডিপি) গঠন; গ্রামাঞ্চলে চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি বন্ধ করা; হাজার হাজার মাইল রাস্তা-ঘাট নির্মাণ; ২৭৫০০ পল্লী চিকিৎসক নিয়োগ কের গ্রামীণ জনগণের চিকিৎসার সুযোগ বৃদ্ধিকরণ; নতুন নতুন শিল্প কলকারখানা স্থাপনের ভেতর দিয়ে অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত দূরীকরণ; কলকারখানায় তিন শিফট চালু করে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি; কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও দেশকে খাদ্য রপ্তআনীর পর্যায়ে উন্নীতকরণ; যুব উন্নয়ন মন্ত্রাণালয় ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুব ও নারী সমাজকে সম্পৃক্তকরণ; ধর্ম মন্ত্রণালয় প্রতিষ্টা করে সকল মানুষের স্ব স্ব ধর্ম পালনের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধিকরণ; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সৃইষ্ট করে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধন; তৃণমূল পর্যায়ে গ্রামের জনগণকে স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করণ এবং সর্বনিম্ন পর্যায় থেকে দেশ গড়ার কাজে নেতৃত্ব সৃষ্টি করার লেক্ষ্য গ্রাম সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন; জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের আসনলাভ; তিন সদস্যবিশিষ্ট আল-কুদস কমিটিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি; দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে ‘সার্ক’ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ গ্রহণ; বেসরকারিখাত ও উদ্যোগকে উৎসাহিতকরণ; জনশক্তি রপ্তানি, তৈরী পোশাক, হিমায়িত খাদ্য, হস্তশিল্পসহ সকল অপ্রচলিত পণ্যোর রপ্তানীর দ্বার উন্মোচন; শিল্পখাতে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রের সম্প্রসারণ।

১৯৮০-এর দশকের গণআন্দোলনের আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে সাধারণ নির্বাচনের পর যখন সরকার গঠন করেন তখন রাজনৈতিক বিরোধিতার নামে আওয়ামী লীগ ১৭৩ দিন হরতাল পালনসহ নানাভাবে দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করেছে। নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের নামে তারা ক্রমাগত অন্যদের গণতান্ত্রিক অধিকার অগ্রাহ্য ও ক্ষুন্ন করেছে।

১.৬ সরকার পরিচালনায় বি এন পির পাঁচ বছর (১৯৯১-১৯৯৬):

রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানের সাফল্য, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের দ্রুত উন্নতি এবং দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দেশী-বিদেশী একদল চক্রান্তকারী বরদাশত করতে পারে নি। সেই সব চক্রান্তকারীর হাতে ১৯৮১ সালে ৩০ মে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শাহাদাত বরণ করেন। অতঃপর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মনোনীত প্রার্থী বিচারপতি আব্দুস সাত্তার বিপুল ভোটে জয়লাভ করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু মাত্র পাঁচ মাস পর এই নির্বাচিত সরকারকে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাত করে লেঃ জেঃ এইচ, এম, এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ ক্ষমতা দখল করেন। গণতন্ত্রের এই সংকটকালে বাঙলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃবৃন্দ সর্বসম্মতিক্রমে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সুযোগ্য উত্তরসূরী বেগম খালেদা জিয়াকে দলীয় প্রধান হিসেবে নির্বাচিত করেন। এরপর দীর্ঘ প্রায় পৌনে নয় বছর হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতাসীন থাকাকালে গণতন্ত্র পুণরুদ্ধারের লক্ষ্যে বেগম খালেদা জিয়া তার বিরুদ্ধে দেশব্যাপি বিরামহীন গণআণ্দোলন চালিয়ে যান। তিনি ছিলেন এই গণআন্দোলনের অবিসংবাদিত আপোষহীন নেত্রী। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য অনেক রাজনৈতিক দল বিভিন্ন সময়ে এরশাদের সাথে গোপন আঁতাত করে তার অবৈধ সরকারকে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য নীল নকশার সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও আপোষহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই নয় বছর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ান নি। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে অবশেষে ১৯৯০ মালের ডিসেম্বর মাসে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তীতে ২৭ শে ফেব্রুয়ারী ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিপুলভাবে জয়লাভ করে এবং বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রীরূপে সরকার গঠন করেন। উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালের নির্বাচন একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে দেশে-বিদেশে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা লাভ করে।

বেগম খালেদা জিয়া যখন সরকার গঠন করে বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত গণতন্ত্র সুসংহত করার দায়িত্ব লাভ করেন, রাস্ট্রীয় তহবিল তখন ছিল প্রায় শূন্য। জাতীয় উন্নয়ন বাজেট ছিল শতকরা প্রায় ১০০ ভাগ বিদেশী ঋণ ও সাহায্যের উপর নির্ভরশীল। অথর্নৈতিক ক্ষেত্রে বিরাজ করছিল চরম বিশৃঙ্খলা। প্রশাসনের সর্বস্তরে ছিল সীমাহীন দূনীতি ও অব্যবস্থা।

১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপি সরকারকে বিরাজমান এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শৃংঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে চাঙ্গা করার কঠিন দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে। জনস্বার্থে এসব দায়িত্ব পালনে দেশের প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের নিকট থেকে যেরূপ সহযোগীতা পাওয়া স্বাভাবিক ছিল, দুর্ভাগ্যক্রমে কোন ক্ষেত্রেই তা পাওয়া যায় নি। বরঞ্চ রাজনৈতিক বিরোধীতার নামে আওয়ামী লীগ ১৭৩ দিন হরতাল পালনসহ নানাভাবে দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করেছে। নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের নামে তারা ক্রমাগত অন্যদের গণতান্ত্রিক অধিকার অগ্রাহ্য ও ক্ষুন্ন করেছে।

১৯৯১ সালে রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্ব বিএনপি’র ওপর অর্পিত হবার পর বৈদেশিক সাহায্য ও নির্ভরশীলতা হ্রাস করে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীতে অভ্যন্তরীণ সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি করার নীতি গ্রহণ করা হয়। সে নীতি সফল হয়েছে। ১৯৯০-৯১ সালে অভ্যন্তরীণ সম্পদ প্রাপ্তির প্রাক্কলিত পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৮শ ২২ কোটি টাকা। ১৯৯৫-৯৬ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৪শ ৫০ কোটি টাকায়। বার্ষিক উন্নয়ন। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীতে ১৯৯০-৯১ সালে অভ্যন্তরীণ সম্পদের পরিমাণ ছিল মাত্র ৭শ ৯১ কোটি টাকা। ১৯৯৫-৯৬ সালে তা ৪ হাজার ৮শ ৭৭ কোটি টাকায় বৃদ্ধি পায়। “কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচী”, ভিজিপি, জিআর, টিআর, কর্মসূচীর মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের জন্য ১৯৯৫-৯৬ সালে ১ হাজার ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। ঐ সময় নগর ও গ্রামাঞ্চলে সড়ক ও সেতু নির্মাণে বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল। এইসব উন্নয়নমূলক কাজে প্রতি বছর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১০ লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

চতুর্থ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় প্রথম বছরে অর্থাৎ ১৯৯০-১৯৯১ সালে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীতে বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার ১শ ২৬ কোটা টাকা।১৯৯৪-৯৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ হাজার ১শ ৫০ কোটি টাকা অর্থাৎ এ বরাদ্দ ৮২ শতাঙশ বৃদ্ধি পায়। ১৯৯০-৯১ সালে দেশের রপ্তানী আয়ের পরিমাণ ছিল মাত্র ৬,০২৭ কোটি টাকা। ১৯৯৫-৯৬ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১৪,৪৫২ কোটি টাকায়। নানা বাধা-বিপত্তি এবং পুনঃ পুনঃ বন্যা, খরা, সাইক্লোন, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে উন্নয়ন প্রয়াস বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। প্রাকৃতিক দূর্যোগ ও অপ্রত্যাশিত বাধা-বিপত্তি এবং পরিকল্পিত নাশকতামূলক রাজনৈতিক কার্যকলাপ সত্ত্বেও বিএনপি আমলের ৫ বছরে অর্জিত সাফল্য দেশে বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে।

সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা চালু করা এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান বিএনপি সরকারের আমলের দু’টি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক আইনশৃং্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রেখে উন্নতি সাধন করা হয় বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও টেলিফোন ব্যবস্থার। দেশে প্রথমবারের মত বিদ্যুৎ, গ্যাস, শিল্প, পরিবহন ও কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ফলপ্রসূ উদ্যোগ নেয়া হয়।

এই সাফল্যগুলির মধ্যো উল্লেখযোগ্য হল:

আইন-শৃঙ্খলা:

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি সাধন করে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা অর্জন করা হয়। দেশে সন্ত্রাস, খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ ইত্যাদি মারাত্মক অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায় এবং জনজীবনে স্বস্তি ফিরে আসে।

সাঃবিধানিক ও রাজনৈতিক:

সংসদীয় পদ্ধতি:

জাতীয় সংসদে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী পাশের মাধ্যমে দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়। দেশ পরিচালনায় বিরোধী দলের অঙশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সমূহ গঠন করা হয়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা:

সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পাশের মাধ্যমে সকল সাধারণ নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়।

মেয়র নির্বাচন:

সকল পৌর কর্পোরেশনে প্রত্যক্ষ ভোটে মেয়র নির্বাচনের ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয় এবং দেশে প্রথমবারের মত প্রত্যক্ষ ভোটে মেয়র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

ভোটার পরিচয়পত্র:

নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য প্রত্যেক ভোটারকে পরিচয়পত্র প্রদানের জন্য সংসদে বিল পাশ এবং এজন্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও অবাধ তথ্য প্রবাহ:

সংবাদপত্র ও সংবাদ প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। এই সময়ে দেশে প্রথমবারের মত অনেকগুলি জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়। বিবিসি, সিএনএন ও স্যাটেলাইট টিভি অনুষ্ঠান প্রচারের অনুমতি দেয়ার মাধ্যমে অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করা হয়। চট্টগ্রামে পূর্ণাঙ্গ টিভি স্টেশন এবং ঝিনাইদহে টিভি রীলে স্টেশন স্থাপন করা হয়। রাঙ্গামাটি ও কক্সবাজারে রেডিও স্টেশন প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়।

অর্থনৈতিক, সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক:

উন্নয়ন বাজেট:

১৯৮৯-৯০ সালের শতকরা প্রায় ১০০ ভাগ বিদেশী ঋণ নির্ভর ৫ হাজার ১ শ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট প্রণয়ন করা হয়, যার ৪৩ ভাগ অর্থ নিজস্ব সম্পদ থেক যোগান দেয়া হয়। উল্লেখ্য, বিএনপি ক্ষমতা লাভের পূর্বে উন্নয়ন বাজেটগুলিতে নিজস্ব সম্পদের যোগান ছিল শতকরা মাত্র ২ থেক ৩ ভাগ।

মুদ্রাস্ফীতি:

মুদ্রাস্ফীতির গড় ৩% এর নীচে রাখা হয়।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও টাকার মান:

৩০.০৬.৯৫ তারিখে বিএনপি সরকারের আমলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩,০৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা একটি সর্বকালীন রেকর্ড। ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপি সরকারের ক্ষমতা ত্যাগের পূর্বে বিরোধীদল কর্তৃক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে একটানা নানাবিধ বাধা সৃষ্টি করা সত্ত্বেও এই মজুতের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ হাজার ৩ শ মিলিয়ন ডলারের মত। ১৯৯৫-৯৬ সালে টাকার গড় বিনিময় হার ছিল ১ মার্কিন ডলার= ৪০.২০ টাকা।

শিল্প-বাণিজ্যে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ:

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রেখে ও বিদ্যুৎ, টেলিফোন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি মাধন করে কৃষি, শিল্প, পরিবহন, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। এভাবে দেশে প্রথমবারের মত ব্যাপক বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ফলপ্রসূ উদ্যোগ নেয়া হয়।

দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত এবং নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে সকল নতুন শিল্পকে প্রথম পাঁচ বছরের জন্য ‘ট্যাক্স হলিডে’ মঞ্জুর করা হয়।

কৃষি, সমবায়, কৃষক ও তাঁতী:

কৃষকদের জন্য পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়। এ বাবদ মোট কৃষিঋণ মওকুফের পরিমাণ ছিল প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা।

তাঁতী ও সমবায়ীদের ঋণের সুদ ও দণ্ডসুদ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় কিন্তু পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার আমলে তা বাস্তবায়িত হয়নি। কৃষকদের ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করা হয়। কৃষকদের মাঝে সহজ শর্তে কৃষিঋণ বিতরণ পদ্ধতি চালু করা হয়। কৃষি ও সেচকাজের সুবিধার্থে সার, বীজ, কীটনাশক, ডিজেল, সেচপাম্পসহ যাবতীয় কৃষি উপকরণের মূল্য হ্রাস করে কৃষকদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখা হয়। নদী ভাঙ্গনের পর ৩০ বছরের মধ্যে লুপ্ত জমি জেগে উঠলে তা জমির মালিককে ফেরত দেয়ার আইন প্রণয়ন করা হয়।

৩৩০টি থানায় পল্লী বিদ্যুতায়ন কার্যক্রম শুরু ও ১৫ হাজার গ্রাম বিদ্যূতায়িত, যমুনা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু এবং প্রায় ৭০% কাজ সম্পন্ন, তিন লক্ষ নতুন টেলিফোন সংযোগ প্রদান, দেশে সর্বপ্রথম কার্ড ফোন, সেলুলার ফোন, গ্রামীণ আইএসডি ফোন চালু, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, উপবৃত্তি কর্মসূচী, ‘শিক্ষার জন্য খাদ্য’ কর্মসূচী, প্রতিবছর শিক্ষাখাতে সবোর্চ্চ বাজেট

বিদ্যুৎ:

বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করে লোডশেডিং পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখা হয়।

শিল্প-কলকারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়। ৩৩০টি থানায় পল্লী বিদ্যুতায়ন কার্যক্রম শুরু করে ১৫ হাজার গ্রাম বিদ্যুতায়িত করা হয়। ৫৮১ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন মোট ৪টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র যথা: বাঘাবাড়ি (৭১ মে.ও.), চট্টগ্রাম রাউজান-১ (২১০ মে.ও.), ঘোড়াশাল (২১০ মে.ও.) এবং সিলেট কম্বাইণ্ড সাইকেল (৯০ মে.ও.) চালু করা হয়। এছাড়া ৭৯৯ মে. ও. বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ৫টি নতুন কেন্দ্রের কাজ শুরু করা হয় এবং আরো ১০২০ মে. ও. উৎপাদনের জন্য ৪টি কেন্দ্রের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।

হাঁস-মুরগী, গবাদিপশু ও মৎস্যচাষ:

সহজ শর্তে ঋণ ও ব্যাপক প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে দেশে হাঁস মুরগী, মৎস্য ও গবাদি পশুর খামার প্রতিষ্ঠার বিপুল সুযোগ সুষ্টি করে দিয়ে লক্ষ লক্ষ বেকার নারী পুরুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। দেশে সরকারি সহায়তায় গবাদিপশু পালন উৎসাহিত হওয়ায় বিদেশ থেকে গুঁড়া দুধ আমদানির পরিমাণ টাকার অংকে ছয়শত কোটি থেকে প্রায় একশত কোটিতে নেমে আসে। উন্মুক্ত জলমহাল ইজারা প্রথা বাতিল করে প্রকৃত জেলে ও দরিদ্র গ্রামবাসীদের মৎস আহরণের অবাধ সুবিধা প্রদান করা হয়। ‘জাল যার জলা তার’ নীতি অনুসরণ করে প্রকৃত মৎসজীবিদেরকে জলমহাল ইজারা দেয়া হয়।

যোগাযোগ ব্যবস্থা:

প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ যমুনা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু এবং প্রায় ৭০% কাজ সম্পন্ন করা হয়। মেঘনা, গোমতী, মহানন্দা, আত্রাই, শেওলা, ধলেশ্বরী-১ এবং ধলেশ্বরী-২ প্রভৃতি সেতুসহ সারা দেশে তিন শতাধিক ছোট-বড় সেতু ও হাজার হাজার কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। কয়েক হাজার কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ ও পাকাকরণ হয়, যার মধ্যে ছিল জেলা সদরের সঙ্গে আর্ন্তজাতিক মানের কয়েক হাজার মাইল জনপথ এবং প্রত্যেকটি উপজেলা সদরের সঙ্গে সংযোগসাধনকারী রাস্তা। ২য় বুড়িগঙ্গা সেতু নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়। রূপসা সেতু, শীতলক্ষা সেতু ও ভৈরব বাজারে মেঘনা সেতু নিমার্ণের যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ ও অর্থ বরাদ্দ করা হয়। আধুনিক ইঞ্জিন ও বগি আমদানি এবং রেল লাইনসমূহের সংস্কার করে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন করা হয়। চট্টগ্রামে দেশের আধুনিকতম ও বৃহদায়তনের রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ করা হয়।

টেলিযোগাযোগ:

পাঁচ বছরে সারা দেশে তিন লক্ষ নতুন টেলিফোন সংযোগ প্রদান করা হয়। সেই সঙ্গে দু’হাজার সালের মধ্যে ৮ লক্ষ নতুন টেলিফোন সংযোগ স্থাপনের ব্যবস্থা নেয়া হয়।

দেশে সর্বপ্রথম কার্ড ফোন, সেলুলার ফোন, গ্রামীণ আই এস ডি ফোন চালু করা হয়।

শিক্ষা:

আইন প্রণয়ন করে সারাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণী পর্যন্ত বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। মেয়েদের লেখাপড়ায় উৎসাহিত করার লক্ষ্যে দেশে সর্বপ্রথম উপবৃত্তি কর্মসূচী চালু করা হয়। দরিদ্র শিশুদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে ‘শিক্ষার জন্য খাদ্য’ কর্মসূচীর প্রচলন করা হয়। হাজার হাজার স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা নির্মাণ ও পুননির্মাণ করা হয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় চালু করা হয়। দেশে সর্বপ্রথম বেসরকারি পর্যায়ে বেশ কিছু সঙখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আরু কিছু সঙখ্যক প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেয়া হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে কম্পিউটার শিক্ষা কোর্স চালু করা হয়। স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মত বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে সম্বর্তন উৎসব চালু করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে সেশনজট দূর করা হয়। গণশিক্ষা কার্যক্রম ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করা হয়। বেসরকারি স্কুল শিক্ষকদের বেতনের অনুদান ৮০ ভাগে বৃদ্ধি ও তাদেরকে টাইমস্কেল দেয়া হয়। প্রতিবছর শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়।

‘দুঃস্থ মহিলাদের ঋণদান’ কর্মসূচী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের জন্য পে-কমিশন গঠন ও তার সুপারিশ বাস্তবায়ন করে প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা একসঙ্গে প্রদান, অবসর গ্রহনের সঙ্গে সঙ্গে পেনশন পাওয়া এবং প্রথমবারের মত অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারিদের মৃত্যুর পর তাদের স্ত্রী এবং প্রতিবন্ধি সন্তানদেরও আজীবন পেনশন পাওয়ার ব্যবস্থা, সরকারি চাকুরিতে প্রবেশের বয়স সীমা ২৭ থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছরে উন্নীতকরণ

স্বাস্থ্য:

বৃহত্তর জেলা সদরে ১০০ শয্যার হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় এবং ৫০ শয্যার হাসপাতালকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলির শয্যা সংখ্যা ৩১ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়। বহু সংখ্যক হাসপাতাল ও থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এম্বুলেন্স প্রদান করা হয়। এক বছরের কম বয়সী শতকরা ৮৫ ভাগ শিশুকে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচীর আওতায় আনা হয়। শতকরা ৯০ ভাগ জনগণের জন্য ইবশুদ্ধ খাবার পানি প্রাপ্তির সুযোগ সৃষ্টি করা হয়।

দুঃস্থ মহিলা:

দু:স্থ মহিলাদের স্বাবলম্বী করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে ‘দুস্থ মহিলাদের ঋণদান’ কর্মসূচী চালু করা হয়।

খনিজ সম্পদ:

বড়পুকুরিয়ার কয়লা এবং মধ্যপাড়ার কঠিন শিলা উত্তোলন প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়। ভোলা ও বঙ্গোগোপসাগরে নতুন গ্যাস ক্ষেত্র ও দিনাজপুরে কয়লা ক্ষেত্র আবিস্কৃত হয়। তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে প্রতি বছর দু’টি করে অনুসন্ধান কুপ খননের উদ্যেগ নেয়া হয়।

পরিবেশ সংরক্ষণ ও বনায়ন:

পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে এ সংক্রান্ত আইনসমূহ দৃঢ়ভাবে বাস্তবায়ন করা হয়। দেশব্যাপি বৃক্ষরোপন ও বনায়ন কর্মসূচী বাস্তবায়নে সামাজিক আন্দোলন শুরু করা হয়। সমুদ্র– উপকূল অঞ্চলে বনায়ন কর্মসূচীর মাধ্যমে উপকূলীয় বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়। সহজ শতের্ ঋণ প্রদান করে বেকার নারী ও পুরুষদের জন্য বৃক্ষরোপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়।

প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলা:

১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্নিঝড় এবং পরবর্তীতে বন্যা ও খরা সফলভাবে মোকাবেলা করে মুলত বিদেশ থেকে সাহায্য না নিয়ে সঠিক পূনর্বাসন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়। উপকুলীয় এলঅকা এক হাজারের বেশী ‘বহুমুখী সাইক্লোন সেন্টার’ নির্মাণ করা হয়।

ব্যাংক ও বীমা:

বেসরকারী খাতে বেশ কিছু সংখ্যক ব্যাঙ্ক ও বীমা কোম্পানি প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ জোরদার করা হয়। ব্যাঙ্কিং খাতের উন্নয়নের জন্য সংস্কার কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়, যার ফলে বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা বহুলাংশে দূর হয়। আনসার-ভিডিপি ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করে আনসার-ভিডিপি সদস্যদের জন্য এ ব্যাঙ্ক থেকে আত্মকর্মসংস্থান প্রকল্পে ঋণের ব্যবস্থা করা হয়। দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করে মুক্তবাজার অর্থনীতি বিকাশের সহায়ক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।

প্রশাসন:

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পে-কমিশন গঠন ও তার সুপারিশ বাস্তবায়ন করে প্রাপ্য আথির্ক সুবিধা এক সঙ্গে দেয়া হয়। তদুপরি অতিরিক্ত ১০% বেতনবৃদ্ধি মঞ্জুর করা হয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের পেনশন জটিলতা নিরসন ও সহজীকরণ করে অবসর গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে পেনশন পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি এবং প্রথমবারের মত অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারিদের মৃত্যুর পর তাদের স্ত্রী এবং প্রতিবন্ধী সন্তানদেরো আজীবন পেনশন পাওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সরকারি কর্মচারিদের জন্য ৩ হাজার বাসগৃহ নির্মাণ করা হয়। সরকারি চাকুরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছরে উন্নীত করা হয়। ফলে বিলম্বে শিক্ষাজীবন সমাপ্তির কারণে লক্ষ লক্ষ হতাশাক্রান্ত য