17-Mon-Dec-2018 07:45am

Position  1
notNot Done

অ্যারিস্টটলের পলিটিকস

zakir

2018-01-10 13:34:29

মসিউল আলম:  অ্যারিস্টটলের পলিটিকস লেখা হয়েছে আজ থেকে দুই হাজার ৩০০ বছর (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩৫-৩২২) আগে, কিন্তু এই গ্রন্থ নিয়ে আলোচনা আজও শেষ হয়নি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র-শিক্ষক, স্বৈরতন্ত্র-গণতন্ত্র ইত্যাদি বাস্তবিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মগ্ন পণ্ডিতবর্গ এবং রাজনৈতিক দর্শনের আলোচকেরা এই একুশ শতকে এসেও অ্যারিস্টটলের পলিটিকস বাদ দিয়ে অগ্রসর হতে পারেন না।অ্যারিস্টটল প্লেটোর নিজ হাতে গড়া শিষ্য; প্লেটোর বিদ্যালয় ‘একাডেমি’তে কেটেছে তাঁর জীবনের কুড়িটি বছর। কিন্তু তিনি গুরুর মতো আধ্যাত্মিক ভবিষ্যদ্বক্তা বা প্রফেট নন। পৃথিবীর আদি বিজ্ঞানীদের তিনি অন্যতম, তাঁর জ্ঞানকাণ্ড অভিজ্ঞতাবাদী। পলিটিকস তাঁর পরিণত জীবনের রচনা, যখন তাঁর গুরু প্লেটো প্রয়াত। ৫০ বছর বয়সে লাইসিয়াম নামের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর অ্যারিস্টটল রচনা করেছেন পলিটিকস। সমাজ, রাষ্ট্র, শাসনব্যবস্থা ও নৈতিকতা বিষয়ে এটি পৃথিবীর প্রথম একাডেমিক সন্দর্ভ। আজকের দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষকেরা যে পদ্ধতিতে লেকচার ও গবেষণা সন্দর্ভ রচনা করেন, তার আবিষ্কারক লাইসিয়ামের অ্যারিস্টটল। এমপেরিক্যাল স্টাডি/রিসার্চ বা অভিজ্ঞতাভিত্তিক গবেষণা পদ্ধতির তিনি আদি গুরু।পলিটিকস লাইসিয়ামের শিক্ষার্থীদের জন্য অ্যারিস্টটলের তৈরি করা লেকচার নোটের গ্রন্থিত রূপ। এই গ্রন্থের শুরুতে অ্যারিস্টটল বলছেন রাষ্ট্র কী, কী তার লক্ষ্য: রাষ্ট্র হলো মানুষের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সমাজ (কমিউনিটি), তার লক্ষ্য সর্বোচ্চ মঙ্গলসাধন, কেননা মানবজাতি সর্বদা কাজ করে মঙ্গল সাধনের উদ্দেশ্যে। অ্যারিস্টটল যখন পলিটিকস-এর জন্য লেকচার নোটগুলো তৈরি করেন, সে সময় গ্রিস ছিল বিভিন্ন নগররাষ্ট্রে বিভক্ত একটি অঞ্চল। রাষ্ট্র বলতে তিনি বুঝিয়েছেন একেকটি পলিস বা নগর। গ্রিক ভাষায় তাঁর গ্রন্থটির নাম পলিতিকা, মানে পলিস বা নগরের মানুষের জীবনের সমস্ত বিষয়ের আলোচনা। অ্যারিস্টটলের বিচারে প্রতিটি নগররাষ্ট্র মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনযাপনের স্বাভাবিক সভ্য রূপ এবং সর্বোত্তম ব্যবস্থা, যার মধ্য দিয়ে মানুষের মানবিক সামর্থ্যের বাস্তবায়ন ঘটবে। মানুষ সম্পর্কে অ্যারিস্টটলের এটি বিখ্যাত উক্তি ‘ম্যান ইজ অ্যা পলিটিক্যাল অ্যানিমেল’-এর তাৎপর্য হলো, ব্যক্তিমানুষ স্বভাবতই একটি পলিটিক্যাল কমিউনিটির অংশ হতে চায়, যে কমিউনিটির লক্ষ্য সব মানুষের সর্বোচ্চ মঙ্গলসাধন। অ্যারিস্টটলের বিচারে মানুষের এই বৈশিষ্ট্য স্বভাবজাত বা ন্যাচারাল। তবে সেই পলিটিক্যাল কমিউনিটি বা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে, মানুষ যেন তার স্বাভাবিক সামর্থ্য কাজে লাগিয়ে গোটা জনগোষ্ঠীর মঙ্গলসাধনে অংশ নিতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র সেটা নিশ্চিত করবে কীভাবে? অ্যারিস্টটলের মত: আইন ও ন্যায়বিচারের দ্বারা। এ বিষয়ে অ্যারিস্টটল বলছেন, ‘মানুষ, যদি সে খাঁটি হয়, প্রাণীকুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু আইন ও ন্যায়বিচার থেকে বিচ্ছিন্ন হলে সে হয় প্রাণীকুলের মধ্যে নিকৃষ্টতম, কারণ সশস্ত্র অন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক।’ অ্যারিস্টটল এখানে বলছেন, মানুষ জন্ম থেকে কয়েকটি অস্ত্র প্রাকৃতিকভাবে পেয়ে যায়: কথা বলা ও ন্যায়-অন্যায় বিচার করার ক্ষমতা। এই দুটি অস্ত্রে সজ্জিত কোনো মানুষ আইন ও বিচারের অধীন না হলে সে হয় পলিটিক্যাল কমিউনিটির জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রাণী। পলিটিকস গ্রন্থে অ্যারিস্টটল লিখেছেন: সরকার তখনই ভালো সরকার, যখন তার লক্ষ্য হয় সমগ্র জনগোষ্ঠীর মঙ্গলসাধন। আর খারাপ সরকার হলো সেই সরকার, যে শুধু নিজের স্বার্থের কথা ভাবে। আইনের শাসনভিত্তিক সরকারের ধারণা প্রথম গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন অ্যারিস্টটল। তিনি গোষ্ঠীতন্ত্র ও গণতন্ত্রের পার্থক্য নির্দেশ করতে গিয়ে শাসকদের অর্থনৈতিক অবস্থানের ওপর জোর দিয়েছেন। বলেছেন, গোষ্ঠীতন্ত্রে ধনিক গোষ্ঠী গরিবদের স্বার্থ বিবেচনায় না নিয়ে শাসন করে। আর গণতন্ত্রে ক্ষমতা থাকে অভাবী লোকদের হাতে, তারা ধনীদের স্বার্থ অগ্রাহ্য করে। রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র, গোষ্ঠীতন্ত্র, গণতন্ত্র ইত্যাদি শাসনব্যবস্থার তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণ করে অ্যারিস্টটল সাব্যস্ত করেছেন, অধিকাংশ বাস্তবিক শাসনব্যবস্থাই খারাপ, গণতন্ত্র খারাপের তালিকায় সবচেয়ে কম খারাপ, অথবা বাস্তবিক শাসনব্যবস্থাগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম। এইভাবে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের পক্ষের প্রথম প্রবক্তা হিসেবে আমরা অ্যারিস্টটলকেই পাই; যাঁর অনেক কথা আজকের বাংলাদেশসহ অনেক গণতন্ত্রকামী দেশে ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর পলিটিকস গ্রন্থের সুদূরপ্রসারী প্রভাবের কথা বলে শেষ করা যাবে না। গ্রন্থটি সম্পর্কে মোদ্দা কথা হচ্ছে, প্লেটোর রিপাবলিক-এর পর এটিই প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ, যা রাজনৈতিক দর্শন বা রাষ্ট্রচিন্তাকে দর্শন হিসেবে মানবসভ্যতার মননে একটি প্রণালিবদ্ধ জ্ঞানক্ষেত্র বা সিস্টেম্যাটিক ডিসিপ্লিন হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। পৃথিবীর সব সভ্য জাতির ভাষা অনূদিত হয়েছে এই গ্রন্থে। বেনজামিন জোয়েটের ইংরেজি ভাষ্য থেকে বাংলায় এটি অনুবাদ করেছেন স্বনামধন্য অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম।